১. কান, চোখ ও নাকের চিকিৎসা
কানে ড্রপ, তেল বা ওষুধ (Ear Drop) : আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান অনুযায়ী, কানের সঙ্গে গলার সরাসরি সংযোগ নেই।
১. কান, চোখ ও নাকের চিকিৎসা
কানে ড্রপ, তেল বা ওষুধ (Ear Drop) : আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান অনুযায়ী, কানের সঙ্গে গলার সরাসরি সংযোগ নেই।
চোখে ড্রপ বা সুরমা (Eye Drop) : চোখে ড্রপ বা সুরমা ব্যবহারে রোজা ভাঙবে না। এমনকি ওষুধের স্বাদ গলায় অনুভূত হলেও রোজা নষ্ট হবে না। কারণ চোখ রোজা ভঙ্গের গ্রহণযোগ্য প্রবেশদ্বার নয়।
নাকে ড্রপ বা স্প্রে (Nasal Drop/Spray) : নাক দিয়ে সরাসরি পাকস্থলীতে যাওয়ার পথ আছে। তাই নাকে ড্রপ বা ওষুধ ব্যবহার করলে যদি তা গলায় বা পাকস্থলীতে পৌঁছে যায়, তবে রোজা ভেঙে যাবে। এটি পরিহার করা উচিত। (জাদিদ ফিকহি মাসায়েল ১/১২৭)
২. রক্ত পরীক্ষা ও রক্ত আদান-প্রদান
রক্ত দেওয়া বা পরীক্ষা করা (Blood Test/Donation) : শরীর থেকে রক্ত বের করলে বা পরীক্ষার জন্য রক্ত দিলে রোজা ভাঙবে না।
শরীরে রক্ত গ্রহণ করা (Blood Transfusion) : অসুস্থতার কারণে শিরায় রক্ত গ্রহণ করলে রোজা ভাঙবে না। কারণ এটি স্বাভাবিক প্রবেশপথ (মুখ বা নাক) দিয়ে প্রবেশ করছে না। (বাদায়েউস সানায়ে ২/৯৩; ফিকহুন নাওয়াজিল ২/৩০০)
৩. ইনজেকশন, টিকা ও স্যালাইন
ইনজেকশন, টিকা ও ইনসুলিন : মাংসপেশিতে বা শিরায় ইনজেকশন, টিকা বা ইনসুলিন নিলে রোজা ভাঙবে না।
স্যালাইন (Saline) : স্যালাইন নিলেও রোজা ভাঙবে না। তবে শুধু দুর্বলতা কাটানোর জন্য গ্লুকোজ স্যালাইন নেওয়া মাকরুহ। অসুস্থতার কারণে নিলে কোনো অসুবিধা নেই। (ইমদাদুল ফাতাওয়া ২/১৪৪; রদ্দুল মুহতার ২/৩৯৫)
৪. শ্বাসকষ্ট ও হার্টের চিকিৎসা
অক্সিজেন (Oxygen) : সাধারণ অক্সিজেন নিলে রোজা ভাঙবে না। তবে অক্সিজেনের সঙ্গে যদি কোনো ওষুধ মিশ্রিত থাকে, তবে রোজা ভেঙে যাবে। (ফাতাওয়া উসমানি ২/১৭৯)
নাইট্রোগ্লিসারিন (Nitroglycerine) : হার্টের রোগীরা জিহ্বার নিচে এই ড্রপ বা স্প্রে ব্যবহার করলে রোজা ভাঙবে না, যদি না ওষুধের কোনো অংশ গলায় প্রবেশ করে।
(ফিকহুন নাওয়াযিল ২/২৯৯)
এনজিওগ্রাম (Angiogram) : হার্টের এই পরীক্ষায় শিরার মাধ্যমে ক্যাথেটার ও রঞ্জক পদার্থ প্রবেশ করানো হয়, এতে রোজা ভাঙবে না।
৫. বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা (Test) এন্ডোসকপি (Endoscopy) : পাইপের মাথায় যদি কোনো ওষুধ বা পানি লাগানো না থাকে, তবে রোজা ভাঙবে না। কিন্তু সাধারণত লুব্রিকেন্ট বা পানি ব্যবহার করা হয়, তাই এটি রাতে করাই শ্রেয়। ওষুধ বা পানি থাকলে রোজা ভেঙে যাবে। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২০৪; জাদীদ ফিকহি মাসায়েল ১/১২৬)
ল্যাপারোস্কপিক সার্জারি : পেটে ছিদ্র করে ক্যামেরা বা যন্ত্র প্রবেশ করালে রোজা ভাঙবে না, যদি না ভেতরে কোনো ওষুধ ব্যবহার করা হয়। (ফিকহুন নাওয়াযিল ২/২৯৮)
সিস্টোসকপি (Cystoscopy) : মূত্রনালিতে ক্যাথেটার প্রবেশ করিয়ে এই পরীক্ষা করলে রোজা ভাঙবে না। (ফিকহুন নাওয়াযিল ২/২৯৯)
প্রক্টোসকপি (Proctoscopy) : মলদ্বার দিয়ে এই পরীক্ষায় গ্লিসারিন বা পিচ্ছিল বস্তু ব্যবহার করা হয়, যা ভেতরে রয়ে যেতে পারে। তাই এতে রোজা ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। (আদ্দুররুল মুখতার ২/৩৯৭)
৬. বিশেষ অঙ্গের চিকিৎসা
মূত্রনালিতে ওষুধ ব্যবহার : পুরুষের মূত্রনালিতে ওষুধ ব্যবহার করলে রোজা ভাঙবে না।
যোনিদ্বারে ওষুধ ব্যবহার (Vagina) : মহিলাদের যোনিপথে ওষুধ বা পরীক্ষার যন্ত্র প্রবেশ করালে রোজা ভাঙবে না। কারণ এর সঙ্গে পাকস্থলীর সরাসরি সংযোগ নেই। তবে সতর্কতার জন্য রাতে ব্যবহার করা উত্তম। (রদ্দুল মুহতার ২/৩৯৯)
৭. দাঁতের চিকিৎসা
দাঁত তোলা বা ওষুধ লাগানো : রোজা অবস্থায় দাঁত তোলা বা ওষুধ লাগানো জায়েজ, তবে ওষুধ বা রক্ত যদি থুথুর সঙ্গে গলার ভেতরে চলে যায়, তবে রোজা ভেঙে যাবে।
দাঁত ফিলিং ও রুট ক্যানেল (Root Canal/Filling) : এই চিকিৎসার সময় পানি বা ওষুধ গলায় যাওয়ার প্রবল আশঙ্কা থাকে। যদি কিছু গলায় না যায়, তবে রোজা হবে, অন্যথায় রোজা ভেঙে যাবে। তাই এসব চিকিৎসা ইফতারের পর করা নিরাপদ। (আহসানুল ফাতাওয়া ১/১৯৯; রদ্দুল মুহতার ২/৩৯৬)
৮. শ্বাস-প্রশ্বাস ও ঠাণ্ডাজনিত চিকিৎসা
গরম পানির ভাপ (Steam) নেওয়া : গরম পানির বাষ্প বা ভাপ নিলে রোজা ভেঙে যাবে। কারণ বাষ্প একটি দেহবিশিষ্ট পদার্থ, যা নাক বা মুখ দিয়ে সরাসরি পাকস্থলীতে পৌঁছায়। এটি ইফতারের পর করা উচিত। (মারাকিল ফালাহ পৃ. ৩৬১; আদ্দুররুল মুখতার ২/৩৯৫)
ইনহেলার (Inhaler) ব্যবহার : ইনহেলারের ওষুধ শ্বাসতন্ত্রের মাধ্যমে ভেতরে প্রবেশ করে, যা দেহবিশিষ্ট। তাই ইনহেলার ব্যবহার করলে রোজা ভেঙে যাবে। নিয়মিত প্রয়োজন হলে পরে কাজা করতে হবে, আর সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা না থাকলে ফিদিয়া দিতে হবে। (ফিকহুন নাওয়াযিল ২/৩০১; রদ্দুল মুহতার ২/৩৯৫; রমজান আওর জাদিদ মাসায়েল পৃ. ১৬৬)
তবে এই মাসআলার ক্ষেত্রে আরববিশ্বের আলেমদের ভিন্নমত রয়েছে।
নেবুলাইজার (Nebulizer) : নেবুলাইজারের মাধ্যমে তরল ওষুধ বাষ্প আকারে ফুসফুসে প্রবেশ করানো হয়, যা রোজা ভঙ্গের কারণ।
নাক দিয়ে ওষুধ শোঁকা (Vicks/Smelling) : যদি ওষুধের তীব্র ঘ্রাণ বা স্বাদ অনুভূত হয়, তবে রোজা ভাঙবে না। তবে ওষুধের কোনো সূক্ষ্ম কণা বা উপাদান যদি নাক দিয়ে গলায় চলে যায়, তবে রোজা ভেঙে যাবে।
৯. অ্যানেসথেসিয়া বা অজ্ঞান করা
লোকাল ও স্পাইনাল অ্যানেসথেসিয়া : শরীরের নির্দিষ্ট অংশ বা নিম্নাংশ অবশ করার জন্য যে ইনজেকশন দেওয়া হয়, তাতে রোজা ভাঙবে না। (ফিকহুন নাওয়াজিল ২/৩০০; রোজাকে মেডিক্যাল মাসায়েল পৃ. ৬৫)
জেনারেল অ্যানেসথেসিয়া : পুরো শরীর অজ্ঞান করার ক্ষেত্রে যদি মুখ দিয়ে নল ঢুকিয়ে ওষুধ দেওয়া হয়, তবে রোজা ভেঙে যাবে।
১০. পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ডায়াগনস্টিক টেস্ট
ইমেজিং টেস্ট (X-ray, MRI, CT Scan, ECG, ECO) : এসব পরীক্ষায় কোনো ওষুধ শরীরের ভেতরে (পাকস্থলীতে) প্রবেশ করানো হয় না। তাই এতে রোজা ভাঙবে না।
(ফিকহুন নাওয়াজিল ২/২৯৮)
আলট্রাসনোগ্রাম : এটি শরীরের উপরিভাগে করা হয়, তাই এতে রোজা ভাঙবে না।
ইটিটি (ETT) : হাঁটার পরীক্ষার সময় যদি নল দিয়ে কোনো ওষুধ বা পানি দেওয়া হয়, তবে রোজা ভেঙে যাবে। তবে শুধু অক্সিজেন দিলে রোজা ভাঙবে না।
মলদ্বারে যন্ত্র প্রবেশ করানো : পরীক্ষার জন্য শুকনা যন্ত্র প্রবেশ করালে রোজা ভাঙবে না, কিন্তু যন্ত্রের সঙ্গে ওষুধ বা পানি থাকলে রোজা ভেঙে যাবে। (আদ্দুররুল মুখতার ২/৩৯৭; ফাতাওয়া দারুল উলুম দেওবন্দ ৬/৪১১)
১১. নারী রোগ ও প্রজননসংক্রান্ত চিকিৎসা
গর্ভপাত (M.R. / D&C) : গর্ভপাত করানোর পর যে রক্তক্ষরণ হয় তা হায়েজ বা নেফাস হিসেবে গণ্য। তাই এমআর বা ডিঅ্যান্ডসি করলে রোজা ভেঙে যাবে। (আলমুহিতুল বুরহানি ১/৪৭০; ফাতহুল কাদির ১/১৬৫)
কপার-টি (Copper-T) স্থাপন : জরায়ুর মুখে কপার-টি স্থাপন করলে রোজা ভাঙবে না। তবে স্থাপনের পর সহবাস করলে কাজা ও কাফফারা উভয়ই ওয়াজিব হবে।
সিরোদকার অপারেশন : অকাল গর্ভপাত রোধে জরায়ুর মুখে সেলাই দিলে রোজা ভাঙবে না।
১২. জটিল অস্ত্রোপচার ও সার্জারি
মস্তিষ্কে অপারেশন : মস্তিষ্কের অপারেশনে ওষুধ ব্যবহার করলেও রোজা ভাঙবে না। কারণ মস্তিষ্ক থেকে গলা পর্যন্ত সরাসরি কোনো পথ নেই। (মাজাল্লাতুল মাজমাইল ফিকহিল ইসলামী ২/৩৬৫)
কিডনি ডায়ালিসিস : ডায়ালিসিসের মাধ্যমে রক্ত শোধন করে পুনরায় শরীরে প্রবেশ করালে রোজা ভাঙবে না। (ফিকহুন নাওয়াযিল ২/২৯৮, ৩০০)
সাধারণ সার্জারি : পাকস্থলী ছাড়া শরীরের অন্য কোথাও অপারেশন করলে এবং সেখানে পাকস্থলী পর্যন্ত কোনো পথ না থাকলে রোজা ভাঙবে না। তবে পাকস্থলীতে অপারেশন বা ভেতরে ওষুধ প্রবেশ করালে রোজা ভেঙে যাবে।
১৩. বিশেষ ওষুধ ও সাপোজিটরি
সাপোজিটরি (Suppository) ও ডুশ : মলদ্বার দিয়ে সাপোজিটরি বা কোনো তরল ওষুধ প্রবেশ করালে রোজা ভেঙে যাবে। কারণ এটি সরাসরি পেটের ভেতরে যায়। (ফিকহুন নাওয়াজিল ২/৩০২)
মূত্রনালিতে ওষুধ : পুরুষ বা মহিলার মূত্রনালি দিয়ে ওষুধ বা যন্ত্র প্রবেশ করালে রোজা ভাঙবে না। (আদ্দুররুল মুখতার ২/৩৯৯; ফিকহুন নাওয়াযিল ২/২৯৭)
১৪. দীর্ঘমেয়াদি রোগ ও রোজা (সতর্কতা)
কিডনি রোগ : কিডনি রোগীদের অবস্থা বুঝে ডাক্তারের পরামর্শে রোজা রাখতে হবে। যাদের অবস্থা গুরুতর তাদের জন্য রোজা না রাখার অবকাশ আছে। পরে তারা কাজা বা ফিদিয়া আদায় করবেন। (ফাতাওয়াল লাজনাহ ১০/১৮৩; ফিকহুল মুসলিম পৃ. ১৯১)
গ্যাস্ট্রিক ও আলসার : সাহরি ও ইফতারে সঠিক খাদ্যাভ্যাস এবং দীর্ঘমেয়াদি কাজ করে এমন ওষুধ খেয়ে গ্যাস্ট্রিকের রোগীরা রোজা রাখতে পারেন। তবে অসহ্য ব্যথা হলে রোজা ভাঙার অবকাশ আছে।
ডায়াবেটিস : ডায়াবেটিস রোগীরা ইনসুলিন নিতে পারেন এবং রক্ত পরীক্ষা করতে পারেন, এতে রোজা ভাঙবে না। তবে সুগার কমে গিয়ে জীবনের ঝুঁকি তৈরি হলে রোজা ভেঙে ফেলা জায়েজ।
সারকথা, শরীরের স্বাভাবিক প্রবেশপথ (যেমন—মুখ, নাক, মলদ্বার) দিয়ে কোনো কিছু ভেতরে গেলে রোজা ভেঙে যায়। কিন্তু শিরা, উপশিরা বা চামড়ার লোমকূপ দিয়ে কিছু প্রবেশ করলে সাধারণত রোজা ভাঙে না।
তথ্যঋণ : রোজেকে মেডিক্যাল মাসায়েল, রমজানের আধুনিক মাসায়েল, রোজেকে মাসায়েল কা এনসাইক্লোপিডিয়া