বীরাঙ্গনাদের সম্পর্কে আমার আগ্রহ জন্মে। এই ক্ষুদ্র গ্রন্থে সে আগ্রহের খণ্ডাংশ মাত্র। তাঁর এই ভূমিকা থেকেই পাঠক বুঝতে সক্ষম পাকিস্তানিরা আমাদের মা-বোনের ইজ্জতের ওপর কি বীভৎস হামলা চালিয়েছিল। বইটি একটি প্রামাণ্য দলিল। তাই বইটি সর্বত্র পঠিত হওয়া প্রয়োজন। আমাদের কষ্টার্জিত স্বাধীনতার কথা ভুলতে পারি কি?
বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে ১৯৭৪ সালে নীলিমা ইব্রাহিম বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্ব নেন। বাংলা একাডেমিতে চলছিল অনিয়ম–বিশৃঙ্খলা। দৃঢ় হাতে এসব অনিয়ম দূর করেছিলেন। মকবুল নামে এক ভণ্ড খাদেম বাংলা একাডেমির চত্বর দখল করেছিল। প্রথমে ছিল একটি কবর এবং তার পাশে মাত্র ৪ শতক জায়গা। মকবুলের হাতের কারসাজিতে তা বেড়ে হয়ে গেল এক শ চুয়াল্লিশ শতক। আর একটু চাপ দিলেই আরও জায়গা বেড়ে বাংলা একাডেমিকে গ্রাস করে। প্রশাসনের সহায়তা নিয়ে দৃঢ় হাতে মকবুলকে উচ্ছেদ করতে পেরেছিলেন সেদিন। মকবুলের কাছে পাওয়া গিয়েছিল ১৪২টি চাঁদা আদায়ের বাক্স। শহরের বিভিন্ন স্থানে এবং শহরের বাইরেও এই বাক্সগুলো রক্ষিত ছিল। এর তত্ত্বাবধান করত এক সুসংগঠিত দল। তারা চাঁদার ভাগ নিত এবং বাক্স পাহারা দিত। কিন্তু মকবুলের অবৈধ ব্যবসা ভেঙে দেওয়ার পর এই বাক্সের তালা আর সে খুলতে পারেনি। পাহারাদাররাই সেই বাক্স দখল করে নিয়েছে। পক্ষান্তরে বাংলা একাডেমি রাহুমুক্ত হয়েছে। প্রয়োজনে কি কঠিনই না হতে পারতেন তিনি।
১৯৭২ সালে থেকে বাংলাদেশ মহিলা সমিতির সভাপতি ছিলেন ড. নীলিমা ইব্রাহিম। এ সময় থেকে এই প্রতিষ্ঠানের কর্মজীবী মহিলা হোস্টেল চালিয়েছেন। গড়ে তুলেছেন মহিলা সমিতি মিলনায়তন। সত্যি কথা বলতে কি, তাঁর উৎসাহে এই মিলনায়তন মঞ্চে নিয়মিত নাটক উপস্থাপনের সুযোগ সৃষ্টি করে তিনি এ দেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ক্ষেত্রেও বিরাট অবদান রেখেছিলেন। পরে মহিলা সমিতি ভবনের ওপর তলায় একটি সেমিনার কক্ষ চালু করেছেন। যেখানে সৃজনশীল বিষয়ের চর্চার জন্য সেমিনার কক্ষ উন্মুক্ত করে দেন।
নীলিমা ইব্রাহিমকে একবার কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছিল। খালেদা জিয়ার প্রধানমন্ত্রীর শেষ দিকে ১৯৯৫ সালে। ‘মাগো আমি কোয্যাবো’ লেখার জন্য সরকার রাষ্ট্রবিরোধী মামলা ঠুকে দিল। নীলিমা ইব্রাহিমের বাসায় পুলিশ খঁজতে গিয়েছিল, পায়নি। তিনি অসুস্থ ছিলেন, তাই আগাম জামিনের জন্য হাইকোর্টে গেলে সেখান থেকে নানা টালবাহনায় প্রত্যাখ্যাত হন। নিম্ন আদালত থেকে জামিন আনয়নের কথা বলা হয়। সেই করুণ ও হৃদয়বিদারক কাহিনি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। স্বাধীন দেশে একজন নারী আন্দোলনের পথিকৃৎ ও কলম-সৈনিকের এ অবস্থা। সাংবাদিক কাজী শাহেদ আহমেদও (আজকের কাগজ) আসামি ছিলেন। তিনি বলেন, নীলিমা ইব্রাহিম মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত আজকের কাগজে লিখে গেছেন। লেখার ক্ষেত্রে তাঁর জুড়ি ছিল না। এ দেশে সৎ থাকলে নানা সমস্যায় পড়তে হয়। তিনিও পড়েছিলেন।