বড়দিন মানেই আনন্দ, সম্প্রীতি ও ভালোবাসার অনন্য মিলনমেলা। আজ থেকে দুই হাজার বছরেরও বেশি সময় আগে ফিলিস্তিনের বেথলেহেম নগরীর এক সাধারণ গোয়ালঘরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন মহামানব যিশু খ্রিষ্ট। মানবজাতির ইতিহাসে তাঁর আগমন ছিল যুগান্তকারী ঘটনা। অন্ধকারে নিমজ্জিত পৃথিবীতে সত্য, সুন্দর ও ন্যায়ের আলো ছড়িয়ে দিতেই তাঁর এই অবতরণ, যা আজও মানব সভ্যতাকে পথ দেখিয়ে চলেছে।
যিশু খ্রিষ্টের জন্মকথা আমাদের যে মৌলিক শিক্ষা দেয়, তা হলো বিনয় ও সরলতা। তিনি ছিলেন জগতের ত্রাণকর্তা, অথচ জন্ম নেননি কোনো রাজপ্রাসাদে; জন্মেছিলেন এক অতি সাধারণ আস্তাবলে। এর মধ্য দিয়ে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন– সৃষ্টিকর্তার কাছে বাহ্যিক জাঁকজমক নয়, বরং পবিত্র হৃদয় ও নির্মল আত্মাই সবচেয়ে মূল্যবান।
যিশু খ্রিষ্টের দর্শনের কেন্দ্রে ছিল ভালোবাসা ও ক্ষমা। তাঁর অমর বাণী– ‘শত্রুকেও ভালোবাসো’ মানুষের হৃদয়ে শান্তির বীজ বপন করে। আজকের সংঘাতপূর্ণ ও অস্থির পৃথিবীতে এই শান্তির বার্তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বড়দিন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়– ঘৃণার পরিবর্তে ভালোবাসা আর বিভেদের স্থানে ক্ষমাই হোক আমাদের পথচলার সঙ্গী।
বড়দিন আমাদের শেখায়, মানুষের সেবা করাই প্রকৃত ঈশ্বর উপাসনা। নিজের স্বার্থ ত্যাগ করে অন্যের মুখে হাসি ফোটানোর মধ্যেই জীবনের প্রকৃত সার্থকতা নিহিত। তাই বড়দিনে উপহার বিনিময় যেন কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং আন্তরিকতা ও ত্যাগের প্রতীক হয়ে ওঠে। বড়দিন ঘিরে থাকে রঙিন সাজসজ্জা, ক্রিসমাস ট্রি, সুস্বাদু কেক আর শিশুদের চোখে সান্তা ক্লজের স্বপ্ন।
প্রবাসজীবনে বিশেষ করে আমেরিকায় দেখেছি, বড়দিন সেখানে কেবল একটি ধর্মের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং এটি হয়ে ওঠে এক সর্বজনীন উৎসব। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রত্যেক মানুষ একে অপরকে শুভেচ্ছা জানায়, উপহার বিনিময় করে এবং আনন্দের ভাগীদার হয়। সেই উৎসবমুখর পরিবেশ আমাদের শেখায় কীভাবে বিভেদ ভুলে একটি সুন্দর ও মানবিক সমাজ গড়ে তোলা যায়। বিদেশের সেই সম্প্রীতির চিত্র যদি আমরা আমাদের দেশেও একইভাবে ধারণ করতে পারি, তবেই সমাজ থেকে হানাহানি দূর হবে।
বড়দিন কেবল ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ নয়। এটি একটি চেতনা। অন্ধকার থেকে আলোয় ফেরা, বিদ্বেষ থেকে ভালোবাসায় আসার এই যাত্রা যদি আমাদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে ধারণ করতে পারি, তবেই বড়দিন উদযাপন হবে সত্যিকার অর্থে সার্থক।