মজনু জেল খেটেও আপস করেন : ২০২০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর গেণ্ডারিয়া এলাকার মজনু সাড়ে চার লাখ টাকা দিয়ে সৌদি আরবে যান। সেখানে যাওয়ার পর তাঁকে কাজ না দিয়ে একটি কক্ষে আটকে রেখে শুরু হয় শারীরিক নির্যাতন। মজনু নিরুপায় হয়ে দেশে ফেরার আকুতি জানালে টিকিট বাবদ ৩০ হাজার টাকা দাবি করা হয়। পরে টাকা দিলেও আসামিরা তাঁকে দেশে ফেরত পাঠায়নি। এক পর্যায়ে ওই বছরের ২ আগস্ট তিনি গ্রেপ্তার হন। জেল খেটে একই বছরের ৬ অক্টোবর কারামুক্ত হন। পরদিন ৭ অক্টোবর তিনি দেশে ফিরে আসেন। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী মজনু বাদী হয়ে ঢাকার মানবপাচার অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন। তদন্ত শেষে অভিযোগের সত্যতা পেয়ে আদালতে প্রতিবেদন জমা দেয় পুলিশ। অভিযুক্ত চার আসামির বিরুদ্ধে শুরু হয় বিচার। পরে পাঁচজন সাক্ষীর মধ্যে একমাত্র ভুক্তভোগী মজনু নিজে সাক্ষ্য দেন। জবানবন্দিতে শুরুতে তিনি আসামিদের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিলেও ফের জবানবন্দিতে তিনি উল্লেখ করেন, আসামিদের সঙ্গে তাঁর আপস হয়েছে। তাঁকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে। তিনি আর মামলা চালাবেন না। শেষে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় ২০২৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর বিচারক রায়ে চার আসামিকে খালাস দেন।
ক্ষতিপূরণ পেয়ে আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ নেই মুন্নার
রাজধানীর ফকিরাপুলে প্রেসে চাকরি করতেন মো. মুন্না। তিনি ২০১৭ সালের ৪ মার্চ লিবিয়ায় যান। সেখানে তাঁকে আটকে রেখে মারধর করা হতো। চার লাখ টাকা না দিলে তাঁকে মেরে ফেলার হুমকি দেয় আসামিরা। এ ঘটনায় ওই বছরের ২৮ মার্চ ভিকটিমের ভাই মো. জিন্নাহ শেখ বাদী হয়ে মতিঝিল থানায় মামলা করেন। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পেয়ে একই বছরের ২ নভেম্বর আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয় পুলিশ। পরে অভিযুক্ত তিন আসামির বিচার শুরু হয়। বিচার চলাকালে সাক্ষী জিন্নাহ প্রথমে তাঁর জবানবন্দিতে এজাহার ও অভিযোগপত্র সমর্থনে বক্তব্য দেন। কিন্তু পুনরায় জবানবন্দিতে তিনি বলেন, মামলা চলাকালে আসামিদের সঙ্গে তাঁদের আপস হয়েছে। তাঁদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে। আসামিদের বিরুদ্ধে এখন আর তাঁদের অভিযোগ নেই। এতে রাষ্ট্রপক্ষ অভিযোগ প্রমাণ করতে না পারায় ২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর তিন আসামিকে খালাস দেন ট্রাইব্যুনাল।
১১ লাখ টাকা পেয়ে আপস করেন রিপন
২০১৯ সালের ১০ মে ভুক্তভোগী রিপনকে অস্ট্রেলিয়া পাঠাতে জেএইচ চৌধুরী ওভারসিসের আসামি রবিউল ইসলাম সুমন ১২ লাখ টাকায় চুক্তি করেন। আট লাখ টাকা নিয়ে তাঁকে ইন্দোনেশিয়ায় পাঠানো হয়। সেখানে তিনি গ্রেপ্তার হয়ে জেলে যান। পরে তাঁকে ছাড়ানোর জন্য আরো চার লাখ টাকা দিতে হয়। এ ঘটনায় ২০২২ সালের ১৮ মে ভুক্তভোগীর পরিবার মামলা করে। তদন্ত শেষে ওই বছরের ১০ আগস্ট অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। তবে এ মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে ভুক্তভোগী রিপন তাঁর জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন, তিনি ১১ লাখ টাকা বুঝে পেয়েছেন। এখন আর তাঁর কোনো অভিযোগ নেই। আসামি জামিন পেলে তাঁর আপত্তি নেই।
ঢাকার ট্রাইব্যুনালে মাত্র ৪ শতাংশ মামলায় আসামির সাজা
ঢাকার মানবপাচার ট্রাইব্যুনাল গঠনের পর থেকে বর্তমান পর্যন্ত এক হাজার ৫৯৪টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। এর মধ্যে খালাস পেয়েছেন এক হাজার ২৯০টি মামলার আসামি। অব্যাহতি পেয়েছেন ২৩৯ মামলার আসামি। সাজা হয়েছে ৬৫টি মামলার আসামির। সেই হিসাবে মাত্র ৪ শতাংশ মামলায় আসামির সাজা হয়েছে। অন্যদিকে ৯৬ শতাংশ মামলায় আসামি খালাস বা অব্যাহতি পেয়েছেন।
চলতি বছর মোট ১৪৪টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ১১টি মামলায় আসামির সাজা হয়েছে। ১০৭টি মামলায় খালাস এবং ২৬টি মামলায় অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
এর আগে এই ট্রাইব্যুনালে ২০২৪ সালের ২ ডিসেম্বর পর্যন্ত ২০৭টি মামলা নিষ্পত্তি হয়। এর মধ্যে ১৩০টি মামলায় খালাস ও ৬৬টি মামলায় অব্যাহতি দেন ট্রাইব্যুনাল। আর মাত্র ১১টি মামলায় আসামির সাজা দেওয়া হয়।
২০২৩ সালে ট্রাইব্যুনালে ২১৮টি মামলা নিষ্পত্তি করেছেন বিচারক। এর মধ্যে খালাস পেয়েছেন ১৪১টি মামলার আসামি। অব্যাহতি দিয়েছেন ৬৪টি মামলার আসামিকে। আর সাজা হয়েছে ১৩টি মামলার আসামির।
বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির উপদেষ্টা সালমা আলী বলেন, মানবপাচার অপরাধে আপস করাও ফৌজদারি অপরাধ। এতে মানবপাচার অপরাধ কমবে না। কারণ তারা ভেবেই নেবে এই মামলায় কিছু হয় না, আপস করলেই সব সমাধান। এতে তারা মানবপাচারে আরো উদ্বুদ্ধ হবে।
ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের প্রধান শরিফুল হাসান বলেন, মানবপাচার মামলায় আসামিরা সব সময় প্রভাবশালী আর ভুক্তভোগীরা দুর্বল থাকে। বছরের পর বছর পার হলেও ভুক্তভোগীরা যখন বিচার পান না, একটা পর্যায়ে তাঁরা হতাশ হয়ে পড়েন। তখন আসামিরা সুযোগ বুঝে ভুক্তভোগীদের টাকার মাধ্যমে আপসের প্রস্তাব দেয়। আদালতে বিচার হয় না বলেই আপসের ঘটনা ঘটে। এই সংকট কাটাতে মানবপাচারের মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে।
ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, আসামিরা মামলার বাদী ও সাক্ষীকে টাকা দিয়ে ম্যানেজ করে ফেলে। সাক্ষ্য গ্রহণে এসে বাদী আসামিদের বিরুদ্ধে মামলার বিষয়বস্তু সম্পর্কে বলতে চান না। তবে রাষ্ট্রপক্ষ জেরা করলে তাঁরা একই কথা বলেন। তবে মানবপাচারকারীদের বিচার হওয়া উচিত। এ ছাড়া মানবপাচার মামলায় আসামিরা কেন খালাস পাচ্ছে, তা পর্যবেক্ষণে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে সেল গঠন করা উচিত।