রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হলো রোগের বিরুদ্ধে শরীরের সর্বোত্তম প্রতিরক্ষা। কারণ দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা আমাদের শরীরকে খারাপ করে তোলে বিশেষ করে শীতকালে সর্দি, কাশি, ফ্লু, হজমের সমস্যা, ক্লান্তি, ঘনঘন সংক্রমণের ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। এ জন্য রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী করতে সঠিক পুষ্টির প্রয়োজন। যদিও এমন কোনো নির্দিষ্ট খাবার নেই যে শরীরে প্রয়োজনীয় সব পুষ্টি সরবরাহ করবে। তবে সব খাদ্যগোষ্ঠী থেকে বিভিন্ন ধরনের বৈচিত্র্যময় খাবার খাওয়া নিশ্চিন্ত করতে হবে; যা শরীরকে জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াই করবে এবং সুস্থ রাখবে। আসুন জেনে নেওয়া যাক শীতকালে রোগ প্রতিরোধে কী ধরনের খাবার গ্রহণ করতে হবে–
ভিটামিন-সি: ভিটামিন-সি আমাদের শরীরকে সুস্থ রাখতে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। যেহেতু আমাদের শরীর ভিটামিন-সি তৈরি করে না, তাই আমাদের খাদ্যের ওপর নির্ভর করতে হয়। এ জন্য সাইট্রাসযুক্ত বা ভিটামিন-সি যুক্ত খাবার বেশি গ্রহণ করতে হবে। যেমন আমলকী, লেবু, পেয়ারা, জাম্বুরা ইত্যাদি।
ফাইটোকেমিক্যাল: ফাইটোকেমিক্যাল হলো উজ্জ্বল রঙের ফল ও শাকসবজি। যেমন লাল, নীল, কমলা বা হলুদ, সবুজ ইত্যাদি। টমেটো, ক্যাপসিকাম, স্ট্রবেরি ইত্যাদি লাল জাতীয় খাবারগুলোয় শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে, যা শরীরে ক্ষতিকর কোষের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারে। আম, গাজর, মিষ্টিআলুতে প্রচুর পরিমাণে বিটা-ক্যারোটিন রয়েছে; যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। সবুজ শাকসবজিতে ক্লোরোফিল নামক ফাইটোকেমিক্যাল রয়েছে। এ ছাড়া ইনডোলের মতো নির্দিষ্ট ক্যান্সারপ্রতিরোধী বৈশিষ্ট্য রয়েছে; যা রোগ প্রতিরোধে শক্তিশালী ভূমিকা রাখে। সবুজ শাকসবজির উৎস হিসেবে শীতকালে পাওয়া যায় এমন সবজিগুলো হলো পালংশাক, ফুলকপি, বাঁধাকপি, ব্রকলি ইত্যাদি।
প্রোবায়োটিক: শীতকালে নড়াচড়া করা হয় না তেমন। এ কারণে অনেকেরই হজমশক্তি ভালো হয় না। আপনারা জানেন পাকস্থলী আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার একটি বিশাল অংশ। এ সময় প্রোবায়োটিকসমৃদ্ধ খাবার যেমন দই নিয়মিত পরিমিত পরিমাণে খেতে পারলে আমাদের হজম শক্তি বাড়ার পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। এ ছাড়া হজমশক্তি ভালো করতে ফাইবারসমৃদ্ধ শাকসবজি ও ফল গ্রহণ করা উচিত। এটি প্রিবায়োটিক হিসেবে কাজ করবে।
বাদাম: বিভিন্ন ধরনের বাদাম খেতে পারেন। এতে ভিটামিন-ই রয়েছে। এ ছাড়া প্রোটিন, ফাইবার ও স্বাস্থ্যকর চর্বি রয়েছে; যা ঘন ঘন ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করবে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী করবে।
ভিটামিন-ডি: শীতকালে মানুষ বাইরে কম সময় কাটায়। শীতকালে মেঘলা আকাশ–এ সময় সূর্যের আলো পর্যাপ্ত নাও থাকতে পারে। ভিটামিন-ডিসমৃদ্ধ খাবার খুব কমই আছে। সূর্যের আলো থেকে আমরা ভিটামিন-ডি বেশি পাই। তাই যাদের ক্রনিক রোগ আছে তারা চিকিৎসকের পরামর্শে ভিটামিন-ডি পরিপূরক খেতে পারেন। ভিটামিন-ডিসমৃদ্ধ খাবার হলো ডিমের কুসুম, মাশরুম, সামুদ্রিক মাছ, ফর্টিফাইড সিরিয়াল প্রভৃতি। ভিটামিন-ডি শুধু একটি ভিটামিন নয়, এটি শরীরে হরমোন হিসেবে কাজ করে; যা শরীরে রোগ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
জিঙ্ক : শীতে অনেকেই সর্দি, কাশি, ফ্লু, ডায়রিয়ার মতো সমস্যায় ভুগে থাকেন। এ জন্য জিঙ্কসমৃদ্ধ খাবার খাওয়া জরুরি। জিঙ্কের উৎস হিসেবে খেতে পারেন বাদাম, তিসিবীজ, চিয়াবীজ, গোটা শস্য ইত্যাদি।
মসলা: শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ, সর্দি-কাশির প্রকোপ কমাতে তেজপাতা, কালোমরিচ খেতে পারেন। এ ছাড়া খেতে পারেন রসুন। রসুনে অ্যান্টিভাইরাল, অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল রয়েছে। আরও খেতে পারেন হলুদ দুধ কিংবা হলুদপানি। কারণ হলুদে কারকিউমিন নামক উপাদান শরীরে প্রদাহ এবং শীতকালীন সংক্রমণ প্রতিরোধে সাহায্য করে।
পানি বা তরল খাবার: শীতকালে ঋতু পরিবর্তনের ফলে বাতাস শুষ্ক হয়ে যেতে পারে; যা ডিহাইড্রেশন করে তোলে। তাই দিনে কমপক্ষে আট গ্লাস পানি পান করা জরুরি। এ ছাড়া হাইড্রেট থাকতে পানিজাতীয় সবজি ও ফল খেতে পারেন। যেমন শসা, কলা, টমেটো, শরবত ইত্যাদি।
টিপস
১. নিয়মিত ব্যায়াম করুন। কারণ ব্যায়াম করলে ঠান্ডা লাগার আশঙ্কা প্রায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ কমে যাবে।
২. নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন।
৩. পর্যাপ্ত ঘুমাবেন।
৪. মানসিক টেনশন বা স্ট্রেস কম করুন।
৫. গরম কাপড় পরিধান করুন।
৬. যাদের আগে থেকে ফ্লু জাতীয় সমস্যা রয়েছে তারা নিয়মিত গরম পানির ভাপ নিন এবং চিকিৎসকের পরামর্শে ফ্লু ভ্যাকসিন নিতে পারেন।
৭. পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকুন।
লেখক: পুষ্টিবিদ, রাইয়ান হেলথ কেয়ার হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার, দিনাজপুর