বিদ্যালয়ের বার্ষিক পরীক্ষাকে দাবি পূরণের ট্রাম্পকার্ড (কার্যকরী কৌশল) হিসেবে ব্যবহার করায় আন্দোলনরত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষকদের ওপর চটেছেন শিক্ষার্থী-অভিভাবক। তারা ক্ষুব্ধ ও বিরক্ত। রাজবাড়ী, টাঙ্গাইলের সখীপুর ও পাবনার চাটমোহরে বিক্ষুব্ধ অভিভাবক নিজেরাই পরীক্ষা নিয়েছেন।
শিক্ষকদের কর্মবিরতি ও পরীক্ষা বর্জনের কারণে দেশজুড়ে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। থেমে গেছে চলমান বার্ষিক পরীক্ষাও। অভিভাবকদের ক্ষোভ– ছেলেমেয়েদের শিক্ষাজীবন অনিশ্চয়তায় পড়েছে। সরকারের একাধিক সতর্কতা জারি সত্ত্বেও দুই স্তরের সরকারি শিক্ষকরা দাবি আদায়ে আন্দোলন থেকে সরে আসেননি। ফলে সারাদেশে পরীক্ষার সময়সূচি ভেঙে পড়েছে।
রাজবাড়ীতে অভিভাবকদের তীব্র উত্তেজনা ও চাপের মুখে নির্ধারিত সময়ের দেড় ঘণ্টা পর বার্ষিক পরীক্ষা নিতে বাধ্য হন প্রাথমিক শিক্ষকরা। জেলা প্রশাসকের মধ্যস্থতায় টাউন মক্তব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দুই শাখায় পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। টাঙ্গাইলের সখীপুরে প্রধান শিক্ষকদের আহ্বানে অভিভাবকরা কক্ষ পরিদর্শকের দায়িত্ব পালন করেছেন। পাবনা পৌর এলাকার পৈলানপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হাফিজুল ইসলাম জানান, সাধারণ শিক্ষকরা ধর্মঘটে থাকায় বিদ্যালয়ের কর্মচারীদের নিয়ে আমরা পরীক্ষা গ্রহণ করি। একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রাম, যশোরসহ কয়েকটি জেলায়। কোথাও অভিভাবক, কোথাও বিদ্যালয়ের কর্মচারীদের সহযোগিতায় বার্ষিক পরীক্ষা নিয়েছেন প্রাথমিকের প্রধান শিক্ষকরা। তবে সব সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পরীক্ষাই স্থগিত হয়েছে।
সন্তানদের নিয়ে উদ্বিগ্ন অভিভাবকদের বক্তব্য হলো, শিক্ষকদের দাবি থাকতেই পারে। কিন্তু সন্তানতুল্য শিক্ষার্থীদের পরীক্ষাকে জিম্মি করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
মাধ্যমিক শিক্ষকদের কর্মবিরতি
চার দফা দাবিতে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা গত বৃহস্পতিবার ও রোববার মাউশি চত্বরে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। দাবি পূরণে আশ্বাস না পেয়ে গতকাল সোমবার থেকে তারা পূর্ণদিবস কর্মবিরতি শুরু করেন। যার ফলে সারাদেশের ৭২১টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বার্ষিক পরীক্ষা স্থগিত হয়ে গেছে।
রাজধানীর ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল, সরকারি ল্যাবরেটরি হাই স্কুল, শেরেবাংলা নগর সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়, ঢাকার বাইরে কুষ্টিয়া জিলা স্কুল, বিদ্যাময়ী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়সহ অনেক প্রতিষ্ঠানে বার্ষিক পরীক্ষা হয়নি। পরীক্ষা দিতে বিদ্যালয়ে এসেও ফিরে গেছে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা।
মাধ্যমিক শিক্ষকদের চার দাবি– এক. সহকারী শিক্ষক পদকে ৯ম গ্রেডে নিয়ে বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারভুক্ত করা ও মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের গেজেট প্রকাশ; দুই. বিদ্যালয় ও পরিদর্শন শাখায় নিয়োগ-পদোন্নতি দ্রুত বাস্তবায়ন; তিন. সুপ্রিম কোর্টের রায়ের আলোকে বকেয়া টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড প্রদান এবং চার. ২০১৫ সালের আগের ইনক্রিমেন্টসহ অগ্রিম বেতন সুবিধা পুনর্বহাল। এই শিক্ষকরা বার্ষিক পরীক্ষাসহ খাতা মূল্যায়নও বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন।
বাংলাদেশ সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির কেন্দ্রীয় সমন্বয় কমিটির সমন্বয়ক মোহাম্মদ ওমর ফারুক সমকালকে জানান, শিক্ষা মন্ত্রণালয় তাদের দাবি পূরণ বিষয়ে রূপরেখাসহ সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দিলে তারা শিক্ষার্থীদের স্বার্থে কর্মবিরতি স্থগিত করে পরীক্ষার কাজে অংশ নেবেন।
প্রাথমিকে বার্ষিক পরীক্ষা ব্যাহত
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতেও গতকাল বার্ষিক পরীক্ষা ব্যাহত হবার খবর পাওয়া গেছে। শিক্ষকদের এক পক্ষ পরীক্ষা বর্জন করলেও অপর পক্ষ পরীক্ষা আয়োজনের পক্ষে ছিলেন। প্রাথমিক স্তরের শিক্ষকদের তিন দফা দাবি– ১১তম গ্রেডে বেতন, উচ্চতর গ্রেড সমস্যার সমাধান এবং শতভাগ বিভাগীয় পদোন্নতি। এই দাবিতে সারাদেশের আন্দোলনরতদের বড় একটি অংশই বার্ষিক পরীক্ষা বর্জন করেছে। গতকাল বাগেরহাট, মেহেরপুর, গোপালগঞ্জ, নোয়াখালী, ময়মনসিংহ, সুনামগঞ্জ, বরগুনা, পটুয়াখালী, ঝালকাঠিসহ অনেক জেলায় পরীক্ষায় অংশ নেননি শিক্ষকরা।
প্রাথমিক শিক্ষক দাবি বাস্তবায়ন পরিষদের আহ্বায়ক মোহাম্মদ শামছুদ্দীন মাসুদ সমকালকে বলেন, অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আপাতত ১১তম গ্রেডসহ তিন দফা বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত পূর্ণদিবস কর্মবিরতি চলবে।
তবে প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক সংগঠন ঐক্য পরিষদের শিক্ষকরা কর্মবিরতি প্রত্যাহার করে পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন। ঢাকার কেরানীগঞ্জ, রাজবাড়ীসহ বিভিন্ন স্থানে অনেক স্কুলে পরীক্ষা চলমান। ঐক্য পরিষদ নেতা ও প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক সমাজের সভাপতি শাহীনুর আল আমিন বলেন, বাচ্চাদের জিম্মি করে কর্মসূচি নেব না। বার্ষিক পরীক্ষা শেষে কর্মসূচি শুরু করব।
কঠোর অবস্থানে সরকার
শিক্ষকদের আন্দোলন নিয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) বার্ষিক, নির্বাচনী ও জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষা নির্ধারিত সময়েই নিতে হবে জানিয়ে গতকাল নির্দেশনা জারি করেছে। শিক্ষকদের অনুপস্থিতি বা শৈথিল্য পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
একই সঙ্গে গতকাল শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে সরকারি সব মাধ্যমিক স্কুলে পরীক্ষাকেন্দ্রের শিক্ষক-কর্মকর্তাদের উপস্থিতির তথ্য দুপুর ১২টার মধ্যে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরও সতর্ক করে বলেছে, বার্ষিক পরীক্ষা গ্রহণে অবহেলায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একসঙ্গে দুই স্তরের কর্মবিরতির কারণে শিক্ষাপঞ্জিতে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে এসেছে। একদিকে তিন লাখের বেশি প্রাথমিক শিক্ষক, অন্যদিকে সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষকরা একই সময়ে আন্দোলনে থাকায় পরিস্থিতি জটিল আকার নিয়েছে। এসএসসির নির্বাচনী পরীক্ষা স্থগিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
শিক্ষার্থী-অভিভাবক গভীর উদ্বেগে
শিক্ষকদের কর্মবিরতি ও পরীক্ষা বর্জনের কারণে শিক্ষার্থী-অভিভাবক গভীর উদ্বেগে রয়েছেন। অভিভাবকরা বলছেন, দাবি থাকতেই পারে। কিন্তু সেটার জন্য বার্ষিক পরীক্ষা বন্ধ করা শিক্ষার্থীদের প্রতি অবিচার। এতে শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা কমবে বলে তাদের মত।
রাজধানীর এক অভিভাবক রুখসানা জামাল বলেন, সরকারের উচিত অবিলম্বে শিক্ষক সংগঠনের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান আনা। তা না হলে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আনোয়ারুল হাবিব কাজল বলেন, শিক্ষকরা তাদের দাবি উপস্থাপন করতে পারেন, কিন্তু শিক্ষার্থীর শিক্ষা যেন পিছিয়ে না পড়ে। সামিন হোসেন বলেন, সন্তানরা পুরো বছর ধরে পরিশ্রম করেছে। শেষ মুহূর্তে পরীক্ষা বর্জনের কারণে তাদের মূল্যায়ন বন্ধ হলে হতাশা তৈরি হবে।
অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি জিয়াউল কবির দুলু সমকালকে বলেন, সরকারি শিক্ষকরা যেভাবে চাকরি বিধিমালা লঙ্ঘন করছেন, তা এর আগে আর দেখিনি। জাতি গড়ার কারিগর শিক্ষকরা দায়িত্বহীনতায় লিপ্ত। সারাবছর প্রস্তুতি নেওয়া শিশুরা শেষ মুহূর্তে মানসিক চাপে ভেঙে পড়ছে। শিক্ষকদের দাবি থাকতেই পারে। কিন্তু পরীক্ষাকে জিম্মি করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
চলমান পরিস্থিতি সম্পর্কে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মাধ্যমিক শাখার পরিচালক অধ্যাপক খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল সমকালকে বলেন, ‘আমরা শিক্ষকদের দাবির গুরুত্ব বুঝতে পারছি। সেই সঙ্গে আমাদের মূল লক্ষ্য শিক্ষার্থীর স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া।’