ব্যাংকাস্যুরেন্সের সম্ভাবনা কেমন দেখছেন? আপনার কম্পানি কোন ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে?
ব্যাংকাস্যুরেন্সের বিষয়টি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, তবে গ্রাহক প্রতিক্রিয়া ইতিবাচক এবং বাজার সম্ভাবনা অনেক বেশি। এরই মধ্যে দেশ জেনারেল ইনস্যুরেন্স কম্পানি লিমিটেড তিনটি ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়ার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে মিডল্যান্ড ব্যাংকের সঙ্গে ব্যবসা করার অনুমোদন আমরা আইডিআরএ থেকে পেয়ে গেছি।
বীমা খাতের সম্ভাবনা তৈরিতে ব্যাংকাস্যুরেন্স কতটা ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন?
ব্যাংকিং খাতের বিশাল গ্রাহক ভিত্তি ব্যবহার করে বীমা খাত দ্রুত সম্প্রসারিত হতে পারে।ডিজিটাল ব্যাংকিং ও মোবাইল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিস যুক্ত হলে ব্যাংকাস্যুরেন্সের প্রসার আরো বাড়বে। আইডিআরএ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সমন্বিত তদারকিতে এটি বীমা খাতে একটি নতুন যুগের সূচনা করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।উন্নত বিশ্বের দেশেগুলোতে ব্যাংকাস্যুরেন্সের আওতায় নানা রকম বীমা পণ্য চালু রয়েছে, যা গ্রাহকদের ভিন্নধর্মী আর্থিক সেবা প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আমাদের দেশে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) এরই মধ্যে লাইফ ইনস্যুরেন্সের জন্য বেশ কয়েকটি ব্যাংকাসুরেন্স প্রোডাক্ট অনুমোদন দিয়েছে।এর ফলে লাইফ ইনস্যুরেন্স কম্পানিগুলেতে তুলনামূলকভাবে বেশি স্বচ্ছতা আসবে। অন্যদিকে নন-লাইফ ইনস্যুরেন্সের ক্ষেত্রে বর্তমানে শুধু পাঁচটি প্রোডাক্টের মাধ্যমে ব্যাংকাস্যুরেন্স বাস্তবায়নযোগ্য হওয়ায় এই খাতে প্রবৃদ্ধি ও বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ তুলনামূলকভাবে সীমিত। অদূর ভবিষ্যতে যদি আইডিআরএ আমাদের আরো সুযোগ বৃদ্ধি করে দেয়, তাহলে অবশ্যই ব্যাংকাস্যুরেন্সের মাধ্যমে ব্যাপক সম্ভাবনা আছে।
বার্ষিক প্রবৃদ্ধি মার্কেট শেয়ার হিসেবে ব্যাংকাস্যুরেন্স খাতের প্রবণতা কী মনে হচ্ছে?
ব্যাংকাস্যুরেন্সে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ও মার্কেট শেয়ার অনেকটাই নির্ভর করে ব্যাংকের নেটওয়ার্ক, পণ্যের ধরন (লাইফ বা নন-লাইফ), গ্রাহকগোষ্ঠী ও নীতিগত পরিবেশের ওপর।বাংলাদেশে ব্যাংকাস্যুরেন্স এখনো বিকাশমান পর্যায়ে, তবে প্রবৃদ্ধি দ্রুত হচ্ছে। বেশির ভাগ ব্যাংকই একটি বা দুটি বীমা কম্পানির সঙ্গে চুক্তি করে এর অভিজ্ঞতা নিচ্ছে।বর্তমান প্রবণতা অনুযায়ী (২০২২-২৫) লাইফ ইনস্যুরেন্সে প্রবৃদ্ধি প্রতিবছর প্রায় ১৫ শতাংশ থেকে ২০ শতাংশ, নন-লাইফ ইনস্যুরেন্সে প্রবৃদ্ধি প্রতিবছর প্রায় ৮ শতাংশ থেকে ১২ শতাংশ।
যদি ব্যাংকগুলোর শাখা ও ডিজিটাল চ্যানেলগুলো পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়, তবে আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরে প্রবৃদ্ধি ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।
ব্যাংকাস্যুরেন্স এখনো ছোট অংশ দখল করে আছে, তবে দ্রুত বাড়ছে।২০২৫ সালের আনুমানিক মার্কেট শেয়ার অনুযায়ী লাইফ ইনস্যুরেন্সে প্রায় ৭ থেকে ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি আসছে। ব্যাংকভিত্তিক প্রিমিয়াম কালেকশন দ্রুত বাড়ছে। নন-লাইফ ইনস্যুরেন্স প্রায় ৩ থেকে ৫ শতাংশ আসছে। মোটর, হেলথ ও ট্রাভেল পলিসিতে সম্ভাবনা বেশি। মোট ইনস্যুরেন্স ইন্ডাস্ট্রিতে গড়ে ৬ থেকে ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি আসছে। তবে আগামী পাঁচ বছরে দ্বিগুণ হওয়ার সম্ভাবনা আছে।
ব্যাংকাস্যুরেন্সের ফলে প্রচলিত বীমা ব্যবসা, অর্থাৎ এজেন্টভিত্তিক যে সেবা, সেটা কি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে?
সত্যিকার অর্থে নন-লাইফে ফিজিক্যালি কোনো এজেন্ট নেই। তাই আমরা বহুদিন ধরে চাই এজেন্ট কমিশন উঠিয়ে নিতে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ইনস্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের বর্তমান সভাপতি সাঈদ আহমেদ একটি বড় উদ্যোগ নেবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। এ ব্যাপারে তিনি আইডিআরএর সঙ্গে মিটিং করে এবং জিরো কমিশনে সব নন-লাইফ বীমা ব্যবসা চালু করার জন্য চেষ্টা করছেন।
বীমা খাতের স্বচ্ছতা বাড়াতে ব্যাংকাস্যুরেন্স কতটা ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন?
ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর নিয়ম ও নজরদারির অধীনে কাজ করে। ব্যাংকাস্যুরেন্সের ক্ষেত্রেও এই নিয়ম প্রযোজ্য হবে, যা বীমা খাতের স্বচ্ছতা বৃদ্ধি করবে। ব্যাংকের শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ এবং নজরদারির কারণে গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণা করার সুযোগ কমে যাবে। ব্যাংক চ্যানেলের মাধ্যমে বীমা বিক্রির ফলে গ্রাহকদের মধ্যে বীমা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়বে। ব্যাংকগুলো তাদের গ্রাহকদের বীমা পণ্যের ঝুঁকি এবং সুবিধা সম্পর্কে আরো ভালোভাবে জানাতে সক্ষম হবে।
বীমা খাতে গ্রাহক সচেতনতা বাড়ানোর জন্য আপনার কম্পানি কী ধরনের উদ্যোগ নিচ্ছে?
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে গ্রাহকরা সহজেই কম্পানির সঙ্গে যুক্ত হতে পারছেন এবং তাদের প্রয়োজনীয় তথ্য ও সেবা পাচ্ছেন। বিভিন্ন বীমা পলিসিকে এক ছাতার নিচে এনে গ্রাহকদের একটি সমন্বিত সমাধান দেওয়া হচ্ছে, যা তাঁদের জীবনযাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। স্বচ্ছতা এবং উন্নত গ্রাহকসেবার মাধ্যমে একটি শক্তিশালী ও বিশ্বাসযোগ্য ব্র্যান্ড ইমেজ তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। এটি নতুন গ্রাহক আকর্ষণ এবং বিদ্যমান গ্রাহকদের ধরে রাখতে সাহায্য করছে। এই উদ্যোগগুলো বীমা খাতের প্রতি গ্রাহকদের মধ্যে ইতিবাচক ধারণা তৈরি করতে সাহায্য করছে এবং তাদের দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের ভিত্তি স্থাপন করছে।
আপনার কম্পানি ডিজিটাইজেশন এবং প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনকে কিভাবে কাজে লাগাচ্ছে?
আমাদের কম্পানি ডিজিটাল রূপান্তরের মাধ্যমে গ্রাহক পরিষেবা উন্নত করতে, ডেটাভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে এবং নতুন বাজার খুঁজে বের করতে প্রযুক্তি ব্যবহার করছে।
বীমা খাতে নীতিমালা ও নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জগুলো কী এবং সেগুলো মোকাবেলা করতে আপনার কম্পানির পরিকল্পনা কী?
বাংলাদেশে বীমা খাতে নীতিমালা ও নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে দুর্বল তত্ত্বাবধান, প্রশিক্ষিত জনবলের অভাব এবং প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আমাদের কম্পানি নীতিমালা উন্নত করার জন্য নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে কাজ করছে, প্রশিক্ষিত জনবল তৈরি করছে এবং উদ্ভাবনী প্রযুক্তির মাধ্যমে গ্রাহকদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে।
আপনার কম্পানি গ্রাহকের অভিযোগ কিভাবে দ্রুত সমাধান করছে এবং গ্রাহকসেবা উন্নত করার জন্য কোন পদক্ষেপ নিচ্ছে?
গ্রাহকের অভিযোগ ও অনুরোধ দ্রুত সমাধানে এবং গ্রাহকসেবা উন্নত করতে আমরা বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করি। এর মধ্যে রয়েছে গ্রাহকদের কথা শোনা, তাঁদের প্রয়োজন বোঝা, উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং গ্রাহকের প্রতিক্রিয়া অনুযায়ী দ্রুত ও কার্যকরভাবে সমাধান প্রদান করা।
গ্রাহকসেবার মান উন্নত করতে কম্পানিগুলো গ্রাহকের ফিডব্যাককে গুরুত্ব দেয় এবং সে অনুযায়ী তাঁদের পণ্য ও সেবার মান উন্নয়নে কাজ করে।