সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০১:২০ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

তিমি হাঙরের অজানা কথা

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: বৃহস্পতিবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৩৪ বার পড়া হয়েছে
  • ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ

প্রায় ২০০ বছর আগের কথা। ১৮২৮ খ্রিস্টাব্দ। তখন দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনে অবস্থিত ব্রিটিশ সেনাঘাঁটিতে মেডিক্যাল কোরের সার্জন হিসেবে কর্মরত ছিলেন স্যার আন্দ্রে স্মিথ। প্রাণিবিজ্ঞানী হিসেবেও তখন তাঁর যথেষ্ট খ্যাতি।

শুরু হলো গবেষণা। গবেষণায় আবিষ্কার হলো, এটি হাঙরের একটি নতুন প্রজাতি। এর বৈজ্ঞানিক নাম দেওয়া হলো Rhincodon typus এবং তিমির মতো আকারের বড় বিধায় এর ইংরেজি নামকরণ করা হলো Whale shark| Orectolobiformes বর্গ ও Rhincodontidae পরিবারের অন্তর্ভুক্ত এ মাছকে বাংলাদেশে ‘তিমি হাঙর’ নামে ডাকা হয়। বিশ্বে মৎস্য প্রাণিকুলের মাঝে হাঙর সবচেয়ে বড় প্রাণী।
এ মাছ নাতিশীতোষ্ণ এবং গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে বসবাস করে। সাধারণত ৬৮ থেকে ৭৭ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রায় এরা থাকতে পছন্দ করে। তবে ৭০ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রার নিচে এদের খুব একটা পাওয়া যায় না। তিমি হাঙরের দুটি সাব-পপুলেশন আছে। একটি আটলান্টিক মহাসাগরে, আরেকটি ইন্দো-প্যাসিফিক মহাসাগরে।
তিমি হাঙরের ৭৫ শতাংশই বসবাস করে ইন্দো-প্যাসিফিক মহাসাগরে।

বিশ্বে সাগর-মহাসাগরে মাছের ৩৫ হাজার প্রজাতি রয়েছে। এর মধ্যে হাঙর প্রজাতির সংখ্যা ৪০০টি। বাংলাদেশে হাঙর ও হাঙরজাতীয় মাছের (Elasmobranch Fishery) প্রাপ্যতা ও বিচিত্রতা নিরূপণের জন্য বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই) ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ২০১৬ সালে এক যৌথ গবেষণা পরিচালনা করে। গবেষণায় বঙ্গোপসাগরে আটটি পরিবারের অন্তর্ভুক্ত ৩০ প্রজাতির হাঙরের সন্ধান পাওয়া যায়। এর মধ্যে তিমি হাঙর একটি প্রজাতি। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলসহ গভীর সমুদ্রে তিমি হাঙর পাওয়া যায়। দেশে তিমি হাঙর বাণিজ্যিকভাবে আহরণ করা হয় না। গিল নেট এবং ট্রল নেটে অন্যান্য বাণিজ্যিক গুরুত্বসম্পন্ন মাছের সঙ্গে বাই-ক্যাচ হিসেবে তিমি হাঙর ধরা পড়ে এবং উপকূলীয় জেলার বিভিন্ন মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে কেনাবেচা হয়। এসব তিমি হাঙর সাধারণত লম্বায় ছয় থেকে ৯ ফুট, সর্বোচ্চ ১২ ফুট এবং ওজনে সর্বোচ্চ দুই টন পর্যন্ত হয়ে থাকে। যদিও বিশ্বে এ যাবৎ তিমি হাঙর লম্বায় সর্বোচ্চ ৬৬ ফুট এবং ওজনে ৪০ টন পর্যন্ত পাওয়া গেছে। তবে ৩৯-৪০ ফুটের বেশি লম্বা তিমি হাঙর সচরাচর দেখা যায় না। অনেকেই মনে করেন, তিমি হাঙর মাছ নয়, এরা তিমির মতো স্তন্যপায়ী প্রাণী। আসলে তা নয়, এদের নামের আগে তিমি থাকলেও এরা মাছ এবং মাছের মতো ফুলকা দিয়ে শ্বাস-প্রশ্বাস নেয়। অন্যদিকে তিমি অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর মতো শ্বাস নেয় ফুসফুস দিয়ে।

তিমি হাঙরের দেহ নলাকার, মাথা চ্যাপ্টা এবং মুখ ভোঁতা ও অনেক চওড়া। অন্যান্য প্রজাতির হাঙরের মুখ মাথার নিচে হলেও তিমি হাঙরের মুখ মাথার অগ্রভাগে থাকে। মুখে ৩০০ সারির ক্ষুদ্রাকার দাঁত এবং ২০টি ফিল্টার প্যাড আছে। এদের ফুলকা পাঁচ জোড়া; গায়ের চামড়া অত্যন্ত শক্ত এবং চামড়ার পুরুত্ব প্রায় ছয় ইঞ্চি পর্যন্ত হয়ে থাকে। অসংখ্য দাঁত থাকা সত্ত্বেও তিমি হাঙর খাবারের জন্য দাঁতের ওপর নির্ভর করে না। খাবারের জন্য এরা জলাশয়ের পানি বিশেষ অঙ্গের সাহায্যে ফিল্টার করে। ফিল্টারিংয়ের মাধ্যমে প্ল্যাংকটন, স্কুইড, কাঁকড়া, জেলি ফিশ, সার্ডিন, ক্রিল (চিংড়ির মতো ছোট প্রাণী) এবং ছোট ছোট অন্যান্য মাছ খেয়ে এরা জীবন ধারণ করে। খাবারের সময় একটি তিমি হাঙর লাখ লাখ লিটার পানি ফিল্টার করতে পারে। পুরুষ তিমি হাঙর লম্বায় ২৬ থেকে ৩০ ফুট হলেই প্রজননক্ষম হয়। একটি স্ত্রী তিমি হাঙর একসঙ্গে ৩০০টি বাচ্চা দিতে পারে। প্রথমে স্ত্রী হাঙরের পেটে ডিম নিষিক্ত হয় এবং পরে বাচ্চা দেয়। এদের ডিম লম্বায় আট থেকে ১০ ইঞ্চি, প্রস্থে চার-পাঁচ ইঞ্চি এবং পুরুত্বে সাড়ে তিন ইঞ্চি পর্যন্ত পাওয়া গেছে।

তিমি হাঙর আকারে বড় হলেও এরা অত্যন্ত বিনয়ী ও শান্ত স্বভাবের হয় এবং মানুষকে আক্রমণ করে না। তিমি হাঙর পরিভ্রমণশীল এবং জলাশয়ে এরা ধীরগতিতে চলাফেরা করে। তিমি হাঙর কত বছর বাঁচে এ নিয়ে সঠিক কোনো তথ্য নেই। তবে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা মত দিয়েছেন, এরা সাধারণত ৬০ থেকে ১০০ বছর এবং সর্বোচ্চ ১৩০ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকে। অর্থনৈতিক দিক থেকে তিমি হাঙরের যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। কোনো কোনো দেশে তিমির মাংস মানব খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তিমির পাখনা দিয়ে স্যুপ, লিভার থেকে তেল এবং চামড়া থেকে ব্যাগসহ নানা দামি পণ্য তৈরি করা হয়। তিমি হাঙরের লিভার থেকে উৎপাদিত তেলে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন-এ ও ডি রয়েছে। আইইউসিএনের (IUCN) তথ্য মতে, তিমি হাঙর বর্তমানে বিলুপ্তপ্রায়। বিজ্ঞানীদের ধারণা, বর্তমানে বিশ্বের সাগর-মহাসাগরে এক লাখ ৩০ হাজার থেকে দুই লাখ তিমি হাঙর রয়েছে এবং গত চার দশকে তিমি হাঙর জলাশয়ে ব্যাপক হারে হ্রাস পেয়েছে। এর মূল কারণ হচ্ছে, অতি আহরণ, তিমি হাঙরের বিলম্বে পরিপক্বতা অর্জন ও প্রজনন এবং পানিদূষণ। সাগরের বাস্তুতন্ত্রকে সুস্থ সবল রাখতে হাঙরকে আমাদের সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।

লেখক : কৃষিবিদ ও মৎস্য বিশেষজ্ঞ,

ইমেইল : yahiamahmud@yahoo.com

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com