দেবীর আরাধনা ভারতবর্ষে প্রাচীন কাল থেকে প্রচলিত হয়ে আসছে। তবে বঙ্গদেশে এর প্রসার ও প্রচার সর্বাধিকভাবে পরিলক্ষিত হয়। গবেষকদের মতে, সম্রাট আকবরের সময়ে ষোড়শ শতকের শেষের দিকে বর্তমান রূপের শারদীয় দুর্গাপূজা প্রচলিত হয়। বাংলায় দুর্গাপূজা সূচিত হয় উত্তরবঙ্গের রাজশাহী অঞ্চলের রাজা কংসনারায়ণের সময়ে। এ পূজা প্রসঙ্গে বিশিষ্ট ব্রাহ্মণ পণ্ডিত রমেশ শান্ত্রী রাজাকে বলেছেন, ‘কলির যুগে মহাযজ্ঞ হচ্ছে দুর্গোৎসব। এ অনুষ্ঠানে সকল যজ্ঞের ফল লাভ হয়। তাই আপনি দুর্গাপূজা করুন।’ সর্ব প্রাচীন গ্রন্থ ‘বেদ’ থেকে শুরু করে বিখ্যাত গ্রন্থে দেবী দুর্গার উল্লেখ আছে। রামায়ণে রামচন্দ্র ১০৮টি নীলপদ্ম দিয়ে দুর্গা দেবীর পূজার আয়োজন করেছিলেন এবং মহাভারতের ভীষ্ম পর্বে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে যুদ্ধারম্ভের পূর্বে জয়ের জন্য দুর্গাপূজার উপদেশ দিয়েছিলেন। সর্ব প্রথমে বসন্তকালে বাসন্তী দুর্গাপূজা হতো। রাজা সুরথ ও সমাধি বৈশ্য বসন্তকালে দুর্গাপূজা করেছিলেন। তাঁদের পূজা করার পেছনের কাহিনি হলো, রাজা সুরথ রাজ্য হারিয়ে বনে বনে ঘুরছিলেন। ঘুরতে ঘুরতে তিনি এলেন মেধা নামে এক মহর্ষির আশ্রমে। অন্যদিকে সমাধি নামে এক বৈশ্য স্ত্রী ও সন্তানদের আচরণে অসন্তুষ্ট হয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন। তিনিও ঘুরতে ঘুরতে আসেন মেধা মুনির আশ্রমে। আশ্রমে এসেও হারানো রাজ্যের জন্য রাজা সুরথের মনে মায়া কাজ করেছিল। আবার সমাধি বৈশ্যও তার স্ত্রী-পুত্রদের ভুলতে পারছিলেন না। কেন এই অন্তরের আকর্ষণ! রাজা সুরথ ও সমাধি বৈশ্যের দেখা হলো। দুজন দুজনের কাছে মনের কথা ব্যক্ত করলেন। তারপর গেলেন মহর্ষি মেধার কাছে। গিয়ে জানালেন নিজেদের অন্তরের কথা। মহর্ষি মেধা বললেন যে এর নাম মায়া। আর এ মায়া হচ্ছে মহামায়ার প্রভাব। তবে মহামায়া সন্তুষ্ট হলে তিনি কৃপা করেন এবং মুক্তি দান করেন। মহর্ষি মেধা মহামায়ার মাহাত্ম্য রাজা সুরথ ও সমাধি বৈশ্যের কাছে বর্ণনা করলে দেবীর কৃপায় তাদের জাগতিক ও মানসিক অশান্তি দূরীভূত হয়।
মহামায়া দুর্গারূপে দুর্ধর্ষ অসুররাজ মহিষাসুরকে বধ করেছিলেন। অসুরদের অত্যাচার হতে দেবগণ মুক্ত হলেন, ফিরে পেলেন তাঁদের প্রিয় স্বর্গরাজ্য। অপরদিকে দেবী দুর্গার আবাহনের মধ্য দিয়ে ধরামাঝে নারীর শক্তি প্রকাশ পায়। বিভিন্ন মনীষী দুর্গারূপেই নারীকে কল্পনার কথা বলেছেন। তাঁর পূজার মাধ্যমে নারীর ভূমিকাকে আরো বড় করে দেখানো হয়েছে। দেবী দুর্গাকে জগজ্জননীরূপে বন্দনা করার মাধ্যমে নারীকেও মাতৃরূপে রূপায়িত করা হয়েছে। দুর্গা মহিষাসুর বধকারী হিসেবে মহাশক্তি দিয়ে অপশক্তি অপসারিত করেছেন। এমনিভাবে দেবী দুর্গা সৃষ্টির প্রতীক, সমৃদ্ধির প্রতীক, সুরক্ষার প্রতীক। নারীও মাতৃরূপে সৃষ্টির প্রতীক, সন্তান জন্ম দিয়ে সন্তানের মুখে আহার তুলে দিয়ে, সন্তানকে বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করেন। মহামহিমাময় নারী জগৎ সংসারে ভালোবাসা দিয়ে, প্রেরণা দিয়ে, শক্তি দিয়ে বিজয়ী করার জন্য দশ হাত দিয়ে কাজ করছেন এবং পরিত্রাণ করছেন। এই মাতৃসম নারী যেন বঞ্চনার শিকার না হন। সেই সঙ্গে খারাপ প্রবৃত্তির আক্রোশে শিকার হয়ে নারীরা যেন কলঙ্কিত না হন। সবাই মিলে মহত্তম গুণ দিয়ে ধরাকে আনন্দ ধাম করতে হবে।
দেবী দুর্গার আবাহন হোক অশুভ শুক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির প্রকাশ। বৈশ্বিক দুর্যোগ থেকে পরিত্রাণের পন্থাধারী। শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিপালনের মমতারূপী। অসত্যের বিরুদ্ধে সত্যের প্রকাশ। সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে অসাম্প্রদায়িকতার মেলবন্ধন। অসুরশক্তির বিরুদ্ধে সুরশক্তির জয়গান। দুঃখ-কষ্ট থেকে আনন্দের প্রকাশ। যুদ্ধবিগ্রহ থেকে শান্তির বার্তা সূচিত হোক। সব শেষে মায়ের কাছে ভক্তকান্ত গীতিকবির প্রার্থনায় বলতে হয়— এসো গো জননী মঙ্গল বারতা নিয়ে, সকল অন্ধকার নাশি আলোকের ঝরনাধারা দিতে!
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, সংস্কৃত বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়