এখন সহজে মিলছে সব ধরনের মাদক, যা বর্তমান সমাজের উদ্বেগের বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ কারণে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনা থেকে শুরু করে সারা দেশের অলিগলিতে মাদকদ্রব্যের ছড়াছড়ি। বর্তমানে মাদক কারবারি চক্রের সদস্যরা নাকি ব্যবসা নির্বিঘ্নে পরিচালনা করার স্বার্থে শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করছে বলে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন হয়েছে।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মাদক কারবারিরা আমাদের দেশকে রুট হিসেবে ব্যবহার করছে বলেও খবর প্রকাশিত হয়েছে।বিশেষ করে থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় মাদকপাচারের ট্রানজিট হিসেবে আন্তর্জাতিক মাফিয়াচক্র বাংলাদেশকে ব্যবহার করছে। এর মধ্যে রয়েছে হেরোইন, ইয়াবা, ক্রিস্টাল মেথ (আইস), কোকেন, গাঁজা, আফিম, কুশ, বিদেশি মদ ও ফেনসিডিলসহ আরো নানা ধরনের মাদক।বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-এর (বিজিবি) তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন দেশে ৫০ লাখের বেশি ইয়াবা ঢুকছে। মায়ানমার সীমান্ত দিয়ে ৮০ শতাংশ মাদকদ্রব্য সাগরপথ ব্যবহার করে বাংলাদেশে আনা হচ্ছে।
যা পরক্ষণেই সব কিছু ম্যানেজও হয়ে যায়। দীর্ঘদিন কক্সবাজারসহ দেশের উপকূলীয় সীমান্তবর্তী এলাকায় ইয়াবা ব্যবসা পরিচালনার মূল হোতা ছিলেন পতিত আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের কিছু প্রভাবশালী নেতা ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর কতিপয় প্রভাবশালী কর্মকর্তা। এঁরা ছিলেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।জানা যায়, মায়ানমারের সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির সদস্যদের সঙ্গে বাংলাদেশের শুধু কক্সবাজারকেন্দ্রিক শতাধিক পাচারকারী চক্রের যোগসাজশ গড়ে উঠছে। তবে কক্সবাজার ও বান্দরবান ছাড়াও এখন নতুন করে পটুয়াখালীর আশপাশের বিভিন্ন স্থানের লোকজনও এ পাচার কাজে জড়িয়ে পড়ছে।সম্প্রতি রাখাইন রাজ্য জান্তা শাসিত মায়ানমার থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এত রাখাইন রাজ্যের আরাকান আর্মিরা নানা সমস্যায় রয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী মায়ানমার থেকে না পাওয়ার কারণে বাংলাদেশের চোরকারবারিদের সঙ্গে তারা হাত মিলিয়েছে। এর সুবাদে বাংলাদেশি চোরাচালানিরা নিত্যপণ্যের জোগান দিচ্ছে। কোস্ট গার্ডকে ফাঁকি দিয়ে বাংলাদশের মাছ ধরার নৌকায় ছদ্মবেশে পাচারকারীর দল গভীর সাগরপথে দিনরাত পাচার কাজ চালাচ্ছে। কুয়াকাটা থেকে শুরু করে চট্টগ্রামের বাঁশখালী, আনোয়ারা, মহেশখালী, কুতুবদিয়া ও পেকুয়াসহ বিস্তীর্ণ উপকূলীয় এলাকার বহু মানুষ চোরাচালানে জড়িত রয়েছে।
অন্যদিকে পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অসাধু কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী নিজেরাই মাদক সরবরাহের সঙ্গে জড়িত বলে জানা যায়। এমনকি মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অবৈধ সুবিধার বিনিময়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর বিভিন্ন অভিযানের তথ্য কৌশলে জানিয়ে দিচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর অনেক সদস্য বিভিন্ন সময়ে মাদকদ্রব্য নিয়ে ধরা পড়ছে। এ রকম ঘটনার বহু উদাহরণ বিদ্যমান রয়েছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অনেক কর্মকর্তাকেই মাদকসংশ্লিষ্টতার অভিযোগে বিভাগীয় শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে। অধিদপ্তরের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। এ ছাড়া গডফাদারের গ্রেপ্তারে রয়েছে তাদের এক ধরনের অনীহা। তাদের চাকরি টিকিয়ে রাখতে মাঝেমধ্যে গাঁজা ও কিছু ইয়াবা উদ্ধার করে তারা ঢাকঢোল পিটিয়ে নিজেদের অস্তিত্ব জাহির করে।
আমাদের দেশের জন্য মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচার ‘বহুমাত্রিক সমস্যা’ হিসেবে হাজির হয়েছে। এ জন্য আইন প্রয়োগের পাশাপাশি মাদকবিরোধী সামাজিক আন্দোলনে জনসাধারণকে সম্পৃক্ত করতে হবে। মাদকের ভয়াবহ আগ্রাসনের কারণে দেশের উন্নয়ন বাধ্যগ্রস্ত হচ্ছে। এ জন্য মাদকবিরোধী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। মাদক মাফিয়াদের আইনের আওতায় আনা দরকার। আমাদের দেশে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন রয়েছে। কিন্তু এর যথাযথ প্রয়োগ হচ্ছে না। এ জন্য প্রয়োজন হলে আলাদা কমিশনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
লেখক : প্রধান, গ্রন্থাগার বিভাগ
সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, চট্টগ্রাম