সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১১:৩৮ পূর্বাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

বাংলাদেশের জলজ জীববৈচিত্র্য বিলুপ্তির পথে

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: মঙ্গলবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ২৪ বার পড়া হয়েছে
ড. মো. ফখরুল ইসলাম

বাংলাদেশ নদী, হাওর, বিল ও জলাশয়ের দেশ। কিন্তু আজকের বাংলাদেশে জলজ সম্পদ নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে। এর বড় কারণগুলোর একটি হলো চায়না দুয়ারি জাল, যা অনেকের কাছে ড্রাগনেট বা নিষিদ্ধ উপায়ে মাছ ধরার কৌশল হিসেবে পরিচিত। এই জালের ফাঁদে শুধু বড় মাছই নয়, বরং ছোট মাছ, ডিম, পোনা, ব্যাঙ, কাঁকড়া থেকে শুরু করে বহু ক্ষুদ্র জলজ প্রাণী নির্বিচারে ধরা পড়ে।

চায়না দুয়ারি জাল ম্যাজিক জাল, রিং জাল, ঢুলকি জাল, জাদু জাল ইত্যাদি নামে পরিচিত। এর প্রতিটি গিঁটের ভেতর থেকে পরবর্তীটির দূরত্ব প্রায় এক মিলিমিটার বা তার থেকেও কম। এই জাল সাধারণ জালের মতো নয়, বরং এর গঠন দেখতে একটি চৌকোনা বা গোলাকার রিঙের মতো, যেখানে একবার মাছ বা পোনা প্রবেশ করলে আর বের হতে পারে না, কারণ এটি কপাটের মতো কাজ করে। এর বুনন মিহি ও সূক্ষ্ম হওয়ায় এতে মাছের ডিম ও ক্ষুদ্র পোনা ছাড়াও শামুক, ঝিনুক, সাপ, ব্যাঙসহ প্রাকৃতিক জলজ প্রাণীও ধরা পড়ে।
জাল একবার পানিতে ফেলা হলে পানির ভেতরের সব প্রাণী একসঙ্গে ধরা পড়ে।বাংলাদেশের মৎস্য সুরক্ষা আইন অনুযায়ী জালের গিঁটকার ফাঁস বা ম্যাস সাইজ কমপক্ষে ৪.৫ সেন্টিমিটার হওয়া উচিত। কিন্তু চায়না দুয়ারির ফাঁস প্রায় এক সেন্টিমিটার বা তারও কম। এ কারণে এটি স্পষ্টতই নিষিদ্ধ। তবে আইনে চায়না দুয়ারির নাম উল্লেখ না থাকার সুবাদে বাস্তবে এটি সহজেই আইনকে পাশ কাটিয়ে যায়।
অনেকে এই জালকে আইনত বৈধ বলে ভাবে। কিছু জেলে গোপনে এই জালের উৎপাদন, বাজারজাত ও বিক্রি করছেন।বিভিন্ন এলাকায় কারখানায়, গুদামে, হাটে ও তৃণমূল পর্যায়ে প্রশাসন অভিযান চালালেও এর নিয়ন্ত্রণ কার্যকর হওয়া বেশ কঠিন। জেলেরা রাতের আঁধারে এই জাল ব্যবহার করে মাছ ধরে বিক্রি করে জীবন বাঁচাতে চান। তাঁদের বিকল্প জীবিকা না থাকায় নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়েছে।একসময় জেলেরা মৌসুমভিত্তিক মাছ ধরতেন। কিন্তু চায়না দুয়ারি জালের আবির্ভাব সেই প্রথা ভেঙে দিয়েছে। এখন শুধু পূর্ণবয়স্ক মাছই নয়, বরং মাছের পোনা, ডিম, ছোট চিংড়ি—সবকিছু নির্বিচারে ধরা পড়ছে। বাংলাদেশে প্রায় ২৬০ প্রজাতির স্বাদু পানির মাছ পাওয়া যেত। কিন্তু সরকারি গবেষণা বলছে, এরই মধ্যে প্রায় ৩০টিরও বেশি মাছের প্রজাতি বিলুপ্তির মুখে। এর পেছনে প্রধান কারণ অতিরিক্ত মাছ ধরা ও নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার।

চায়না দুয়ারি জালের কারণে সব ধরনের পোনা মাছ ধ্বংস হচ্ছে। এর সঙ্গে পানিতে থাকা শামুক, কাঁকড়া, ব্যাঙ, ট্যাডপোল, এমনকি জলজ কীটপতঙ্গ পর্যন্ত এই জালে ধরা পড়ে মারা যায়। এতে প্রাকৃতিক খাদ্যশৃঙ্খল ভেঙে পড়ছে। ছোট প্রাণী না থাকলে বড় প্রাণীর খাদ্য সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে পুরো ইকোসিস্টেম বিপর্যস্ত হয়।

আমাদের দেশে জেলেদের জীবন ও অর্থনীতি মাছের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু চায়না দুয়ারি জালের ব্যবহার একদিকে সাময়িকভাবে বেশি মাছ এনে দিলেও দীর্ঘ মেয়াদে তাঁদেরই ক্ষতি করছে। কারণ কয়েক বছরের মধ্যে যখন মাছের প্রজাতি হ্রাস পায়, তখন জেলেরা আর মাছ পান না। ফলে তাঁরা ঋণের ফাঁদে পড়েন, অন্য পেশায় যেতে বাধ্য হন অথবা দারিদ্র্যের চক্রে বন্দি হয়ে যান।

মৎস্য খাত জিডিপিতে ৩-৪ শতাংশ অবদান রাখে। প্রায় এক কোটি ২০ লাখ মানুষের জীবিকা সরাসরি বা পরোক্ষভাবে মাছের ওপর নির্ভরশীল। অদূরভবিষ্যতে এই খাত ধ্বংস হলে অর্থনীতিতেও বিরূপ প্রভাব পড়বে।

অন্যদিকে মাছ না থাকলে শাপলা, পদ্ম, জলজ ঘাস বেড়ে জলাশয় অচল করে তোলে। পাখিদের খাদ্যাভাব দেখা দেয়। বহু অভিবাসী পাখি নদী-হাওরে এসে আর খাবার পায় না। প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে নদীর পানির গুণগত মানও খারাপ হয়। এভাবে একটি জালের কারণে পুরো জলজ পরিবেশ বিপন্ন হয়ে পড়ছে।

মৎস্য অধিদপ্তর অভিযান চালিয়ে জাল জব্দ করে, জরিমানা করে। কিন্তু বাস্তবে প্রভাবশালী মহলের আশ্রয়ে অনেক সময় এই জাল পুনরায় ব্যবহার করা হয়। স্থানীয় প্রশাসনকে ফাঁকি দিয়ে রাতের আঁধারে নদীতে চায়না দুয়ারি জাল বসানো হয়। আইন থাকলেও কার্যকর প্রয়োগ না হওয়া, দরিদ্র জেলেদের বিকল্প জীবিকা না থাকা আর স্বল্প মেয়াদে বেশি মাছ পাওয়ার লোভ—সব মিলিয়ে চায়না দুয়ারি জালের ব্যবহার কমছে না।

সরকারকে মৎস্য বিভাগের মাধ্যমে মাছ ও জলজ প্রাণী রক্ষার জন্য উদ্যোগ নিতে হবে। এই জাল প্রস্তুতকারক থেকে ব্যবহারকারী পর্যন্ত সবাইকে আইনের আওতায় আনতে হবে। তবে এটি বন্ধ করার আগে জেলেদের বিকল্প জীবিকা নিয়ে ভাবা উচিত। অন্যদিকে জেলেদের বোঝাতে হবে, এই জাল তাঁদের বর্তমানে লাভ দিলেও ভবিষ্যৎ ধ্বংস করছে। পাশাপাশি মাছের প্রজননক্ষেত্র রক্ষা করা উচিত। নদী ও হাওরের নির্দিষ্ট অংশে মাছের ডিম ছাড়ার মৌসুমে কড়া নজরদারি চালাতে হবে। কোন এলাকায় কোন প্রজাতির মাছ বিলুপ্তির পথে, তা গবেষণার মাধ্যমে শনাক্ত করে বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা নিতে হবে। এ ছাড়া সামাজিক অংশগ্রহণ ও স্থানীয় কমিউনিটি, সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা একযোগে কাজ করলে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনা যেতে পারে।

চায়না দুয়ারি জাল হলো ধ্বংসের হাতিয়ার। যদি এখনই এর ব্যবহার বন্ধ না হয়, তবে আমাদের নদী-হাওর একদিন নিঃশব্দ শূন্যতায় ভরে যাবে। মাছের বাজারে গিয়ে খালি হাতে ফিরে আসতে হবে। যা কিছু পাওয়া যাবে, তার দাম আকাশছোঁয়া হবে। জেলেরা জীবিকা হারাবে এবং খাবারের পাতে সুস্বাদু নানা প্রজাতির দেশি মাছের কথা শুধু গল্পের বইয়ে পাওয়া যাবে! এই জালের বিরুদ্ধে সরকারি কর্তৃপক্ষ এবং মাছ ধরা ও বিক্রিসহ এর সঙ্গে জীবিকা নির্বাহ করা মানুষ এবং মাছপ্রিয় সব সাধারণ মানুষকে একসঙ্গে দাঁড়াতে হবে।

লেখক : অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com