সর্ষের মধ্যেই থাকে ভূত’ বাংলায় এমন একটি প্রবাদ শোনা যায়। প্রবাদটির প্রায়োগিক শতভাগ সত্য বলা যায় নির্বাচন আয়োজন করা কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে, যাদের রাষ্ট্রীয়ভাবে ও সাংবিধানিকভাবে দেশে সুন্দর ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের দায়িত্ব ও ক্ষমতা দেয়া থাকলেও তারা নিজেরাই কলুষিত হয়ে বিতর্কিত নির্বাচনের আয়োজন করে। ফলে তাদের এই কর্মকান্ডের জন্য দেশের রাজনৈতিক দলসমূহ ও প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষদেরও ভোগ করতে হয়েছে ফ্যাসিবাদের দেড়যুগের নির্যাতন। ২০১৪ সালের কারচুপির একদলীয় ভোটের নির্বাচন, ২০১৮ সালের সরাসরি রাতের ভোটের নির্বাচন, ২০২৪ সালের ডামি প্রার্থীতা দিয়ে নির্বাচন ছিল দেশের মানুষের কাছে ‘ওপেন সিক্রেট’ যেখানে গণতন্ত্রকে নামে মাত্র ব্যবহারের মাধ্যমে ভোটের অধিকার হরণ করে দুর্নীতির আখড়া তৈরী করা হয়েছিল। বিগত তিনটি নির্বাচনে কমিশনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকেও যারা জুলাই-গণঅভ্যুত্থানের রাজনৈতিক শক্তিদের সহায়তা করেছিলেন তাদের বিষয়ে সামান্য ছাড় রয়েছে এমন খবরও রয়েছে ইসিতে। জনসমর্থন রয়েছে এমন রাজনৈতিক দলের আস্থাভাজন কর্মকর্তাদের প্রতি বিশেষ নজর রাখছে কমিশন। অতি-উৎসাহী কর্মকর্তার কারণে পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়া বিতর্কিত যেন না হয়, কিংবা রাজনৈতিক তকমা কমিশনারদের শরীরে লাগতে না পারে সেটিও সতর্কতার সঙ্গে দেখছে নীতি-নির্ধারকরা।
গত ৮ সেপ্টেম্বর ইসির সহকারী সচিব মোহাম্মদ শহীদুর রহমানের স্বাক্ষরিত তিনটি অফিস আদেশ থেকে জানা যায়, ইসি সচিবালয়ে ও মাঠ পর্যায়ের ৬১ জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে বদলি করেছে কমিশন। আদেশে বলা হয়েছে, ইসি সচিবালয়ে ও মাঠ পর্যায়ের ৪৯ জন কর্মকর্তাকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বদলি/পদায়ন করা হলো। এদিকে ভিন্ন আরো দুটি আদেশে আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা ও উপসচিব পদে ১২ জনকে বদলি করা হয়েছে। সেখানে পাঁচ কর্মকর্তা উপসচিব জি. এম. সাহাতাব উদ্দিনকে সাধারণ সেবা-১ অধিশাখা থেকে মানবসম্পদ উন্নয়ন কল্যাণ অধিশাখায়, উপসচিব মো. রফিকুল ইসলামকে সাধারণ সেবা-১ অধিশাখায়, উপসচিব মো. হুমায়ুন কবিরকে বাজেট অধিশাখা থেকে নির্বাচনী সহায়তা ও সরবরাহ, উপসচিব এম. মাজহারুল ইসলামকে মানব সম্পদ উন্নয়ন কল্যাণ অধিশাখা থেকে বাজেট অধিশাখায় এবং উপসচিব মোহাম্মদ এনামুল হককে সাধারণ সেবা-২ অধিশাখায় বদলি করা হয়েছে। এতে মোট ৬১ জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে বদলি করা হল। বদলিকৃত কর্মকর্তারা আগামী ১৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যে বর্তমান কর্মস্থল হতে অবমুক্ত হবেন, অন্যথায় আগামী ১৮ সেপ্টেম্বর তাৎক্ষণিক অবমুক্ত হবে বলে ধরা হবে।গত জুন মাসের মাঝামাঝিতে ইসির ৭১ কর্মকর্তাকে বদলি করার একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে কমিশন। একসাথে এত বেশী সংখ্যক কর্মকর্তাকে বদলির নজির কমিশনের এটিই প্রথম এবং গত ১৫ জুলাই ৫১ জন কর্মকর্তাকে বদলি করে কমিশন। বিগত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কে এম হাবিবুল আউয়ালের কমিশনে দায়িত্বপ্রাপ্ত যেসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে এবং অনিয়মের সহযোগী হয়ে কাজ করেছিলেন তাদের মাঠ পর্যায়ের কর্মক্ষেত্র পরিবর্তন করা হচ্ছে। তাদের মধ্যে উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ মিজানুর রহমান তালুকদারকে শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা থেকে কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা নির্বাচন কমিশনে বদলি করা হয় এবং সিলেটের গোলাপগঞ্জের উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আহসান ইকবালকে বিয়ানীবাজার উপজেলায় বদলি করা হয়েছে। কমিশন সূত্রে জানা যায়, তফসিল ঘোষণার পূর্বে কমিশনের আরো কিছু কর্মকর্তাকে বদলি করা হবে। নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তা, প্রিসাইডিং কর্মকর্তাসহ ভোট কর্মকর্তা নিয়োজিত থাকবেন প্রায় নয় লাখ ২৫ হাজারের মতো। প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে একজন প্রিসাইডিং অফিসার, ভোটকক্ষে একজন সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার এবং দুজন পোলিং অফিসার ভোটারদের ভোটদানে সহায়তায় দায়িত্ব পালন করবেন। এদের প্রশিক্ষণ দিতে কমিশনের বাজেট ধরা হয়েছে দেড়শ’ কোটি টাকা।স্বচ্ছ নির্বাচনের জন্য কমিশন থেকেই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নিয়োগের প্রয়োজন উল্লেখ করে নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য আব্দুল আলীম বলেন, এন্ট্রি লেভেল থেকে শুরু করে নির্বাচন কমিশনের সচিব পর্যন্ত তারাই নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বে থাকলে কিন্তু তাদের এক ধরনের জবাবদিহিতা থাকবে। আপনি যদি বিভিন্ন কর্মকর্তাকে, বিশেষ করে সচিব, অতিরিক্ত সচিব এদেরকে এডমিন থেকে নিয়ে আসেন এবং একটা নির্দিষ্ট সময় পরে তারা আবার এডমিনে ফিরে যায়, তখন সে নির্বাচন কমিশনকে ধারণ করবে না। ভাববে না যে, নির্বাচন কমিশন আমার। অনেক ক্ষেত্রে অনেক সচিব হয়ত সরকারের বা ক্ষমতাসীন দলের একটা মিশন নিয়েও আসতে পারে, তা বাস্তবায়নের জন্য। এজন্যেই এই সমস্ত নিয়োগটা এরকম একটা সার্ভিস নিয়ে হওয়া উচিত। যাতে করে সরকারের কোনো ইন্টারভেনশন অর্থাৎ রাজনৈতিক দলের যে সরকারের মধ্যে থাকবে তাদের কোনো ইন্টারভেনশন না থাকে।সম্প্রতি রংপুর ও খুলনা অঞ্চল পরিদর্শনকালে মাঠ পর্যায়ের নির্বাচন কর্মকর্তাদের সাথে মতবিনিময় সভায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেছেন, শতভাগ পেশাদারিত্ব বজায় রেখে সততার সাথে দায়িত্ব পালন করতে হবে। বিগত নির্বাচনের দায়িত্ব পালন করা কর্মকর্তাদের বর্তমান পরিণতি মাথায় রাখতে হবে। তবে তিনি সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনে কর্র্মকর্তাদের দায়িত্বকে আমানতের সাথেও তুলনা করেছেন। ####