জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাশিত সময়ের মধ্যে না পেয়ে গতকাল শুক্রবার রাতে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন প্রার্থী ও শিক্ষার্থীরা। এক পর্যায়ে প্রার্থীদের একটি অংশ রাতের মধ্যে ফল প্রকাশের জোরালো দাবি জানায়। নির্বাচন কমিশন থেকে রাতেই ফল প্রকাশের বিষয়ে আশ্বাস দেওয়া হয়।
তফসিল অনুযায়ী বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টায় ফল ঘোষণা করার কথা ছিল।রাতে জানানো হয়, শুক্রবার সকালে জানা যাবে ভোটের ফল। পরে জানানো হয়, দুপুরে ফল প্রকাশ করা হবে। নির্বাচন কমিশন সর্বশেষ জানিয়েছে, ফল জানাতে অনেক রাত হতে পারে।এদিকে রাত ২টায় এ প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত জাকসু নির্বাচনের ভোট গণনা চলছিল।এর আগে রাত ৮টায় হল সংসদ নির্বাচনে ২১টি হলের মধ্যে ২০টির ভোট গণনা শেষ হয়।জাকসু নির্বাচনে অনিয়ম ও ত্রুটির অভিযোগ এনেছেন নির্বাচন কমিশনের সদস্য ও জীববিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক মাফরুহী সাত্তার। এসব অভিযোগে নির্বাচন কমিশন থেকে তিনি পদত্যাগ করেছেন।
জানা যায়, প্রথমে ওএমআর মেশিনে ভোট গণনা করা হবে বলে জানানো হলেও পরে মেশিন সরবরাহকারী কম্পানি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ছাত্রদল দাবি করে, এই কম্পানি জামায়াতে ইসলামীর কোনো প্রতিষ্ঠানের। এ বিষয়ে ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেলসহ কয়েকটি প্যানেল ও প্রার্থী নির্বাচন কমিশনকে জানালে পরবর্তী সময়ে হাতে ব্যালট গোনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টায় ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেও ফল না পেয়ে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও প্রার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে। এ বিষয়ে শিক্ষার্থী ঐক্য ফোরামের কার্যনির্বাহী সদস্য পদপ্রার্থী মোহাম্মদ আলী চিশতি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ৪০ হাজার ভোটার ছিল, সেখানে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ফল প্রকাশ করা হয়।
এর আগে বিকেল ৫টার পর হঠাৎ করে ভোটগণনা বন্ধ করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের মধ্যে একটি জরুরি বৈঠক হয়। পরিস্থিতি পর্যালোচনা ও প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের লক্ষ্যে এই বৈঠক হয়। কেন এই ধীরগতি : নির্বাচনের ফল পেতে কেন এত দেরি হচ্ছে, এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোক্টর ও নির্বাচন কমিশনের সদস্যসচিব অধ্যাপক রাশিদুল আলম জানান, শুরুতে ওএমআর মেশিনের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভোটগণনার প্রস্তুতি থাকলেও প্রার্থীদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে ম্যানুয়াল (হাতে) পদ্ধতিতে ভোট গণনা করা হয়। এ ধরনের গণনায় স্বাভাবিকভাবেই সময় বেশি লাগে। নির্ধারিত সময় সকাল ৯টার কিছু পর কয়েকটি হলে ভোটগ্রহণ শুরু হয় এবং দু-একটি হলে ভোটগ্রহণ কিছু সময়ের জন্য স্থগিতও ছিল। বিশেষ করে দুটি বড় হলে দুপুর পর্যন্ত ভোটার উপস্থিতি কম থাকলেও বিকেলে হঠাৎ ভিড় বেড়ে যায়। নিয়ম অনুযায়ী, লাইনে আসা সব ভোটারকে ভোট দেওয়ার সুযোগ দিতে গিয়ে ভোটগ্রহণ শেষ হতে রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত সময় লেগে যায়। হঠাৎ করে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে ভোটগণনার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় শুরুতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও অভিজ্ঞতা না থাকায় গণনার গতি ছিল ধীর। পরবর্তী সময়ে সেই গতি কিছুটা বাড়ে। শুরুতে সিনেট ভবনে পাঁচটি টেবিলে ভোটগণনা শুরু হয়, যেগুলো সিসিটিভির আওতায় ছিল। পরদিন সকালে টেবিলের সংখ্যা বাড়িয়ে ১০ করা হয় এবং সেগুলোকেও সিসিটিভির আওতায় আনা হয়, যাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যায়। রাতে বেশির ভাগ হলে পোলিং অফিসাররা উপস্থিত থাকলেও অনেকে অনুপস্থিত ছিলেন। নিয়ম অনুযায়ী, তাঁদের উপস্থিতিতেই ব্যালট বক্স খোলা ও ভোটগণনার কাজ সম্পন্ন হওয়া উচিত। কিছু ক্ষেত্রে রিটার্নিং অফিসারের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে সময় লেগে যায়, যা দেরির আরেকটি কারণ।
দায়িত্ব পালনের সময় অসুস্থ হয়ে জাবি শিক্ষকের মৃত্যু : জাকসু নির্বাচনে ভোটগণনায় অংশ নিতে এসে অসুস্থ হয়ে পড়েন চারুকলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জান্নাতুল ফেরদৌস মৌমিতা। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। সকাল সাড়ে ৮টার দিকে এই ঘটনা ঘটে। তিনি প্রীতিলতা হলে পোলিং অফিসার হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন।
জানা যায়, সন্ধ্যা ৬টার দিকে ভোট শেষ হওয়ার পর জান্নাতুল ফেরদৌস বাড়ি ফিরেছিলেন। গতকাল সকাল প্রায় সাড়ে ৮টার দিকে তিনি ভোটগণনার জন্য সিনেট ভবনে ফেরেন। এরপর হঠাৎ তৃতীয় তলায় ভোটগণনার কক্ষের দরজার সামনে পড়ে যান তিনি। তারপর তাঁকে দ্রুত সাভারের এনাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
অব্যবস্থাপনার কারণেই জাবি শিক্ষক জান্নাতুলের মৃত্যু, দাবি রিটার্নিং অফিসারের : ভোটগণনার সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক জান্নাতুল ফেরদৌসের মৃত্যুর ঘটনায় নির্বাচন কমিশনের ‘অব্যবস্থাপনা’কে দায়ী করেছেন নওবাব ফয়জুন্নেসা হলের রিটার্নিং অফিসার অধ্যাপক সুলতানা আক্তার।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের অব্যবস্থাপনার জন্যই আমার সহকর্মী জান্নাতুল ফেরদৌসের মৃত্যু হয়েছে বলে আমি মনে করি। আমি এই ঘটনার সঠিক বিচার চাই। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে তাঁর ক্ষতিপূরণ দাবি করছি। এই মৃত্যুর দায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে নিতে হবে। নির্বাচন কমিশনের সদস্যসচিবকে আমি প্রশ্ন করেছিলাম ভোট কোথায় গণনা করা হবে, তিনি বলেছিলেন সিনেট ভবনে। আমি বলেছিলাম, তাহলে দেরি হয়ে যাবে। কেন আমরা ২১টি হলে গুনতে পারব না? আমরা মেশিনের মাধ্যমে কাজ করব ম্যাডাম, যেন অতিদ্রুত রেজাল্ট দিতে পারি, যেন আপনাদের কষ্ট লাঘব হয়। আমরা সেটা মেনে নিয়েছি; আমরা সেটাই জানতাম। কিন্তু ১০ তারিখ রাতের পরে আমরা জানতে পারলাম, ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে ভোট গণনা করা হবে। সেটা হলে যদি বিভিন্ন হলে হতো, রাত ১০টার মধ্যেই ভোটগণনা শেষ হয়ে যেত। ১১টার মধ্যেই ফল দিয়ে দেওয়া সম্ভব হতো। তাহলে আমার সহকর্মীর মৃত্যু দেখতে হতো না।’
মেশিনে ভোটগণনা হলে হয়তো ম্যামকেও হারাতে হতো না—আব্দুর রশিদ জিতু : স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী সম্মিলন প্যানেলের ভিপি পদপ্রার্থী আব্দুর রশিদ জিতু বলেন, ‘তথ্য-প্রযুক্তির এই যুগে এসেও যদি আমরা ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে পড়ে থাকি, তাহলে সেটি আমাদের জন্য জটিল হয়ে যায়। আমরা দেখেছি, নির্বাচনে এত বেশিসংখ্যক ভোটারের ভোটগ্রহণের পর ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে ভোটগণনাটা খুবই কষ্টসাধ্য ব্যাপার ছিল।’
তিনি বলেন, ‘যদি মেশিনের মাধ্যমে ভোট গণনা করা হতো, তাহলে নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকত না বলে আমরা মনে করি। মেশিনে ভোটগণনা হলে হয়তো ম্যামকেও হারাতে হতো না।’
শুক্রবারের মধ্যে ফল দাবি শিবিরের : বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) নির্বাচনের ভোটগণনায় দীর্ঘসূত্রতা ও বানচালের ষড়যন্ত্র মেনে নেবে না শিবির। শুক্রবারের মধ্যে ফল প্রকাশ করা না হলে কঠোর অবস্থানে যাবে বলে হুঁশিয়ারি দেয় তারা। গতকাল বিকেল ৫টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে শিবির সমর্থিত প্যানেল সমন্বিত শিক্ষার্থী জোটের জিএস পদপ্রার্থী মাজহারুল ইসলাম এ কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘নির্বাচন বানচালের কোনো প্রকার অপপ্রয়াস সফল হতে দেওয়া হবে না। অযৌক্তিকভাবে ওএমআর বাতিল করে দেওয়া হয়েছে, যেটির গ্লানি আমরা এখনো টানছি। যাঁরা ভোট গণনা করছেন, তাঁদের নাভিশ্বাস উঠে গেছে, অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। মাত্র হল সংসদের ভোটগণনা শেষ হয়েছে। এখনো আরো ভোটগণনা বাকি। আমাদের মনে হয় না যে আজকের (শুক্রবার) মধ্যে ভোটগণনা শেষ হবে।’ এদিকে জাকসু নির্বাচনের ফল প্রকাশ দেরি হওয়ার প্রতিবাদে গত রাতে ঢাকার শাহবাগে বিক্ষোভ করেছে ছাত্রশিবির।
নির্বাচন কমিশনের এক সদস্যের পদত্যাগ : জাকসু নির্বাচনে অনিয়ম ও ত্রুটির অভিযোগ এনে নির্বাচন কমিশনের সদস্য ও জীববিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক মাফরুহী সাত্তার নির্বাচন কমিশন থেকে পদত্যাগ করেছেন। রাত সাড়ে ৮টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন কলা ভবনের সামনে এক সংবাদ সম্মেলনে এই ঘোষণা দেন তিনি।