সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০২:২০ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে রাসুল (সা.) এর শিক্ষা

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: বুধবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ১১ বার পড়া হয়েছে

উপনিবেশবাদ, আধিপত্যবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের সংঘাতমূলক অধ্যায়গুলো নিঃসন্দেহে এক অভূতপূর্ব বিরাট সংকট ও সংকটকালকে নির্দেশ করে। যেখানে শক্তিশালী রাষ্ট্র ও গোষ্ঠীগুলো নিজেদের ক্ষমতা, সম্পদ ও সাংস্কৃতিক প্রভাব বিস্তারের নামে অন্য জাতি ও সভ্যতাকে শোষণ, নিপীড়ন করে এবং বিসংস্কৃতির জালে আটকে ফেলে। এই নিপীড়নের ধারা শুধু রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোকে ধ্বংস করেনি, বরং স্থানীয় সংস্কৃতি, ধর্ম, ভাষা ও জাতীয় আত্মপরিচয়ে ভাঙন ঘটিয়েছে। মুসলিম বিশ্ব এই অভিজ্ঞতার কেন্দ্রে থেকেছে, যেখানে উপনিবেশবাদ ও আধিপত্যবাদ একদিকে রাজনৈতিক পরাজয় ও আত্মগত সংকট চাপিয়ে দিয়েছে, অন্যদিকে শোষণ ও বিভ্রান্তির মোড়কে আধুনিকতার মিথ্যা আবরণ প্রতিষ্ঠা করেছে।

এই সংকটের মধ্যে নবীজির (সা.) শিক্ষার বহুমাত্রিক দর্শন এক অনন্য মুক্তির বাতিঘর হিসেবে আবির্ভূত। তাঁর শিক্ষা শুধু একটি ধর্মীয় বিশ্বাস নয়। এ শিক্ষা এক শাশ্বত নৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক আদর্শ, যা সাম্রাজ্যবাদী ক্ষমতার কেন্দ্রিকতা ও শোষণমূলক মানসিকতাকে প্রত্যাখ্যান করে। নবীজির শেখানো তাওহীদ, মানব মর্যাদা, ন্যায় ও সাম্য প্রতিষ্ঠার নীতি এবং আখিরাতের বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে গঠিত মুক্তিকামী আদর্শ আজও শক্তি ও অনুপ্রেরণার উৎস।

উপনিবেশবাদের ঐতিহাসিক বাস্তবতা থেকে আধুনিক সাম্রাজ্যবাদের সূক্ষ্ম সংস্করণ এবং মুসলিম বিশ্বের সংকট থেকে নবীজির আদর্শিক মুক্তি-দর্শন পর্যন্ত আমরা একটি পর্যালোচনা হাজির করবো।উপনিবেশবাদের ধারণা:

উপনিবেশবাদ অর্থ এমন এক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, যেখানে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র অন্য একটি অঞ্চলের উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে, তাকে শাসন ও শোষণ করে। পঞ্চদশ শতক থেকে স্পেন, পর্তুগাল, ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং নেদারল্যান্ডসের মতো ইউরোপীয় শক্তিগুলো নতুন ভূখ- আবিষ্কার ও দখলের মাধ্যমে উপনিবেশবাদী শক্তিতে পরিণত হয়। এই প্রক্রিয়া মূলত সামুদ্রিক অভিযান, সামরিক দখল, বাণিজ্যিক আধিপত্য ও ধর্মপ্রচারের নামে পরিচালিত হয়।

ইতিহাসে উপনিবেশবাদের তিনটি প্রধান ধারা পরিলক্ষিত হয়। প্রথমত, ১৫শ ও ১৬শ শতকে লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকার উপকূলীয় অঞ্চল দখল করে ইউরোপীয়রা। সেখানে তারা বসতি স্থাপন করে, স্থানীয় জনপদের ধ্বংস ঘটায়। দ্বিতীয়ত, ১৮শ ও ১৯শ শতকে ঘটে ‘ঔপনিবেশিক বিস্তৃতির দ্বিতীয় ঢেউ’। তখন ভারত, চীন, আফ্রিকা ও আরব অঞ্চলে ইউরোপীয় শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। তৃতীয়ত, ২০শ শতকে উপনিবেশবিরোধী আন্দোলনের জোয়ার আসে। যার ফলে অনেক দেশ স্বাধীনতা লাভ করে, তবে উপনিবেশবাদ রূপ বদলে আবার ফিরে আসে ‘নব্য উপনিবেশবাদ’ হিসেবে।

আধিপত্যবাদ:

আধিপত্যবাদ মানে একটি রাষ্ট্র বা গোষ্ঠীর আন্তর্জাতিক বা আঞ্চলিক ক্ষেত্রে প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, যা সরাসরি শাসনের উপর নির্ভর করে না সবসময়। তার চেয়ে বরং কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামরিক প্রভাব বিস্তারের মধ্য দিয়ে আধিপত্যের বিস্তার ঘটে। ঠান্ডা যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাববলয় ছিলো আধিপত্যবাদেরই নজির। সাম্প্রতিক বিশ্বে বিশ্ব অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ বড় বড় বহুজাতিক কোম্পানির হাতে চলে আসছে। তারা নির্দিষ্ট দেশ বা অঞ্চলের সম্পদ ও বাজার দখল করে স্থানীয় অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে।

ফাইন্যান্সিয়াল সফ্টওয়্যার

বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, ডব্লিওটিও প্রভৃতি সংস্থা উন্নয়নশীল দেশের নীতি ও অর্থনীতিতে প্রভাব বিস্তার করে তাদের নিজস্ব স্বার্থ নিশ্চিত করছে। ফলে পশ্চিমা সংস্কৃতি, জীবনধারা, ভাষা ও মানসিকতা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। অন্যান্য জাতি ও সংস্কৃতির ঐতিহ্য ও স্বকীয়তা ক্ষীণ হয়ে পড়েছে। বিশ্বব্যাপী সিনেমা, গান, ফ্যাশন ইত্যাদি মাধ্যমে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। প্রযুক্তিগত আধিপত্য ডিজিটাল ও নেটওয়ার্ক আধিপত্যের নতুন যুগে প্রবেশ করেছে। গুগল, ফেসবুক, অ্যাপল, মাইক্রোসফটের মতো প্রযুক্তি জায়ান্টরা তথ্যপ্রবাহ ও ডিজিটাল বিশ্ব নিয়ন্ত্রণ করছে। তথ্য, ডাটা ও ডিজিটাল নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে আধিপত্য বিস্তার হচ্ছে।
সাম্রাজ্যবাদ: এই পটভূমিতে আধুনিক সাম্রাজ্যবাদ হয়ে উঠেছে মুখ্য। আধুনিক সাম্রাজ্যবাদ মূলত উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে শুরু হয়ে ২০শ শতকে বিকশিত একটি অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক ব্যবস্থা, যেখানে শিল্পোন্নত রাষ্ট্রসমূহ নতুন বাজার, কাঁচামাল ও বিনিয়োগ ক্ষেত্রের সন্ধানে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ বিস্তার করে। এটি সরাসরি উপনিবেশের পরিবর্তে অর্থনৈতিক নির্ভরতা ও রাজনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।

ত্রিধারার যৌথরূপ:

এই যে তিনটি প্রবণতা ও প্রকল্প, উপনিবেশবাদ, আধিপত্যবাদ ও আধুনিক সাম্রাজ্যবাদ, এর যৌথতা কোথায়? তাদের যৌথতা নিহিত আছে:
ক. ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণের অভিলাষে: তিন ক্ষেত্রেই একটি রাষ্ট্র বা গোষ্ঠী অন্যদের উপর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা সাংস্কৃতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে।
খ. শোষণমূলক চরিত্রে: প্রভাবশালী পক্ষ দুর্বল পক্ষের সম্পদ, শ্রম বা বাজারকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে।
গ. অসম আন্তর্জাতিক সম্পর্কে: শক্তিশালী ও দুর্বল রাষ্ট্রের মধ্যে ক্ষমতার বৈষম্য থাকে।
ঘ. বৈধতার যুক্তিতে: সাধারণত সভ্যতা বিতরণ, উন্নয়ন, গণতন্ত্র, মানবাধিকার বা নিরাপত্তার নামে প্রভাব বিস্তারকে ন্যায্যতা দেওয়া হয়।

ঙ. সাংস্কৃতিক প্রভাবে: ভাষা, শিক্ষা, মিডিয়া ও জীবনধারার মাধ্যমে সাংস্কৃতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা হয়।
চ. উত্তরাধুনিক রূপান্তরে: তিনটিই সময়ের সাথে রূপ বদলেছে; সরাসরি সামরিক দখল থেকে পরোক্ষ অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নিয়ন্ত্রণে রূপান্তর ঘটেছে।

মুসলিম বিশ্বের প্রেক্ষাপট:
মুসলিম বিশ্বে উপনিবেশবাদের আগমন ছিল ভয়াবহ ও বিপজ্জনক। ভারত উপমহাদেশে ১৭৫৭ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শুরু হয় উপনিবেশিক শাসন। ১৮৫৮ সালে ব্রিটিশ রাজ্যে পরিণত হয় ভারত এবং ১৯৪৭ পর্যন্ত চলতে থাকে। আরব অঞ্চলও উপনিবেশবাদের কবলে পড়ে। ১৮৩০ সালে আলজেরিয়া দখল করে ফরাসিরা, ১৮৮২ সালে মিশর দখল করে ব্রিটিশরা এবং ১৯১৬ সালে সাইক্স-পিকো চুক্তির মাধ্যমে পুরো আরব অঞ্চল ইউরোপীয় শক্তিগুলোর মধ্যে ভাগ হয়ে যায়।
ওসমানী সাম্রাজ্য ছিলো মুসলিম বিশ্বের শেষ ঐক্যবদ্ধ খিলাফতি রাষ্ট্র। ১৯২৪ সালে তা ভেঙে যায়। এর পতন হয় ইউরোপীয় হস্তক্ষেপ, বিশ্বযুদ্ধ এবং পশ্চিমা আধিপত্যবাদী আগ্রাসনে। ফলে মুসলিম বিশ্বে উপনিবেশবাদ একদিকে রাজনৈতিক পরাজয় নিশ্চিত করে, অপরদিকে সাংস্কৃতিক ও আত্মিক পতনের সূচনা করে। উপনিবেশবাদ-সাম্রাজ্যবাদের ফলে মুসলিম সমাজে ইসলামভিত্তিক শাসনব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা ও শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস হয়। ওয়াক্ফ, মাদরাসা, ইসলামি অর্থনীতি ও রাজনৈতিক চিন্তাধারা বিপন্ন হয়। পাশ্চাত্য শিক্ষা, আইন ও ধর্মনিরপেক্ষতা চাপিয়ে দেওয়া হয়। মুসলিমদের আত্মপরিচয় ভেঙে পড়ে। ইসলামের বিপরীতে প্রগতিশীলতাকে হাজির করা হয়। ফলে মুসলিম জাতিগুলো এক আত্মবিস্মৃত, বিভ্রান্ত ও পরাধীন জাতিতে পরিণত হয়, যাদের অনেকে পশ্চিমা চিন্তা ও শাসনের অনুকরণেই নিজেদের মুক্তি খুঁজতে শুরু করে। অনেকে এর বিপরীতে নবীয়ে পাক (সা.) শিক্ষা ও আদর্শকে অবলম্বন করে মুক্তির সন্ধান করতে থাকে।উপনিবেশবাদ-আধিপত্যবাদ-সাম্রাজ্যবাদের বিপরীতে রাসুলে পাকের (সা.) শিক্ষা:

রাসুলুল্লাহ (সা.) এমন এক নৈতিক ও রাজনৈতিক দর্শন উপহার দিয়েছেন, যা এসবের বিরুদ্ধে একটি শাশ্বত মুক্তিকামী আদর্শে পরিণত হয়েছে। তাঁর শিক্ষা ইহকালীন শোষণমুক্তি ও পরকালীন মুক্তির সমন্বিত পথ। উপনিবেশবাদ-সাম্রাজ্যবাদবিরোধী নৈতিক ও আদর্শিক ভিত গঠনে নববী শিক্ষার কতিপয় দিক হাজির করছি।

১. তাওহীদের নীতি:
তাওহীদ কেবল ধর্মীয় বিশ্বাস নয়, বরং সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভুত্ব অস্বীকারের এক মৌলিক ঘোষণা।
লা-ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ অর্থাৎ, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই, এই বাক্য গভীর ও ব্যাপক আজাদির ঘোষণা। যা শাসকগোষ্ঠীর, সামন্তবাদের, সাম্রাজ্যবাদী বা উপনিবেশিক শক্তির প্রভুত্বকেও অস্বীকার করে।
কালিমার ঘোষণা ছিল কুরাইশ অভিজাতদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে সরাসরি চ্যালেঞ্জ।

২. মানব মর্যাদা প্রতিষ্ঠা:
রাসুল (সা.) ঘোষণা করেছিলেন: ‘একজন আরবের উপর কোনো অনারবের শ্রেষ্ঠতা নেই, শুধুমাত্র তাকওয়ার ভিত্তিতেই শ্রেষ্ঠতা নির্ধারিত হবে।’ (মুসনাদ আহমদ)। এই ঘোষণা আরব সমাজের দীর্ঘদিনের জাতিগত গর্ব ও বংশমর্যাদা-নির্ভর শ্রেষ্ঠতাবোধকে ভেঙে দেয়। জাহিলিয়াত যুগে ক্ষমতা, সম্পদ ও গোত্রীয় পরিচয় ছিল মর্যাদার মূল মাপকাঠি, যা শোষণ ও বঞ্চনার কাঠামো তৈরি করত। নবী (সা.) এর তাকওয়া-ভিত্তিক মর্যাদাবোধ একাধারে মানবসমতার দার্শনিক ঘোষণা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের ভিত্তি।

৩. সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠা:
মক্কা বিজয়ের পর নবী (সা.) এক যুগান্তকারী ঘোষণা দেন: জাহিলিয়াত যুগের সকল সুদ বাতিল করা হলো। (সহীহ মুসলিম)। এই পদক্ষেপ শুধু আর্থিক সংস্কার ছিল না। এর মধ্যে নিহিত ছিলো অর্থনৈতিক শোষণের কেন্দ্রবিন্দুকে ধ্বংস করার এক বিপ্লবী রূপকল্প। সুদ ছিল ধনী শ্রেণির হাতে গরিবদের শোষণের অস্ত্র, গরিবকে ঋণের ফাঁদে ফেলে সম্পদ ও শ্রম কেড়ে নেওয়া হতো সুদের মাধ্যমে। সাম্রাজ্যবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থায়ও আমরা একই প্যাটার্ন দেখি। এখানে উচ্চ সুদ, একচেটিয়া ব্যবসা, শ্রমশোষণ এবং সম্পদের কুক্ষিগতকরণ। নবী (সা.) এই শোষণচক্রের মূলই কেটে দেন। তিনি ব্যবসাকে প্রণোদিত করেন। ফরজ যাকাতের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠা নিশ্চিত করেন। সাদাকা, করজে হাসানা ও তায়াবুন লিল খাইর (উত্তমে সহায়তা) এর নীতিকে নৈতিক ও ধর্মীয় কর্তব্যের জায়গায় শুধু প্রতিষ্ঠিত করা হয়নি, বরং এর সর্বজনীন বিস্তার দেওয়া হয়।

৪. বিদেশি আধিপত্য ও মূর্তিপূজার বিপরীতে আত্মমর্যাদাশীল অবস্থান:
নবীজি (সা.) গোত্রীয় আধিপত্যবাদ, রাজকীয় নিরঙ্কুশতা এবং মূর্তিপূজাভিত্তিক পরজীবী সমাজ কাঠামোকে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি এমন এক সভ্যতার রূপরেখা দেন, যেখানে মানুষের শাসনের পরিবর্তে আল্লাহর বিধানই রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনের মূল নীতি। এটি শুধু ধর্মীয় বিপ্লব নয়, বরং এতে নিহিত ছিলো সাংস্কৃতিক মুক্তির পথরেখা।

৫. দারুল ইসলামের ধারণা:
মদিনা রাষ্ট্র ছিল এমন এক মুক্তভূমি, যেখানে ন্যায়বিচার ছিল শাসনের মূল ভিত্তি, আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ছিল প্রত্যেক নাগরিকের স্বীকৃত অধিকার। মদিনা সনদের মাধ্যমে নবী (সা.) মুসলিম, ইহুদি, খ্রিস্টান ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের একটি যৌথ রাজনৈতিক চুক্তিতে যুক্ত করেছিলেন, যেখানে সবাই রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষায় দায়িত্বশীল ছিল এবং প্রত্যেকের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা অক্ষুণœ রাখা হয়েছিল। এই ব্যবস্থায় কোনো গোষ্ঠী অপর গোষ্ঠীর উপর আধিপত্য বিস্তার করতে পারত না।৬. উম্মাহর ঐক্য: আধিপত্যবাদ টিকে থাকে বিভাজনের ওপর। জাতি, বর্ণ, ভাষা ও ভূখ-ের ভিত্তিতে সে মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে শাসন করে। নবী (সা.) উম্মাহ ধারণার মাধ্যমে এই বিভাজনকে ভেঙে দেন এবং একটি সীমা-অতিক্রমী সম্প্রদায়ের রূপরেখা দেন, যার ভিত্তি ছিল না বর্ণ, ভাষা বা ভূগোল। বরং ঈমান, ন্যায়বিচার ও পারস্পরিক সহযোগিতাকে কেন্দ্র করে তা বিকশিত হয়। এই উম্মাহ শুধু মুসলিমদের জন্য নিরাপত্তাছাতা ছিলো না, বরং সে সেইসব মানুষকেও অন্তর্ভুক্ত করেছিলো, যারা ন্যায় ও নিরাপত্তার চুক্তিতে অংশগ্রহণ করেছিল। এর ফলে সমাজে এমন একটি সম্মিলিত শক্তি গড়ে ওঠে, যা বহিরাগত শোষণ ও ভেতরের অন্যায়ের বিরুদ্ধে সমানভাবে প্রতিরোধ গড়তে সক্ষম হয়।

৭. আখিরাতের বিশ্বাস:
আখিরাতের বিশ্বাস মানুষকে ভয়ভীতিহীন করে তোলে। যারা জানে, দুনিয়ার জুলুম টিকে থাকবে না, তারা শাসকশ্রেণী ও প্রতিপত্তিশীল শক্তির সামনে সত্য বলতে দ্বিধা করে না। সত্য প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ক্লান্ত হয় না। আখেরাতের বিশ্বাস মানুষকে মনে করিয়ে দেয়, যে অণু পরিমাণ ভালো করবে, তা সে দেখবে; আর যে অণু পরিমাণ মন্দ করবে, তা সে দেখবে। (সূরা যিলযাল ৯৯:৭-৮)।
আখেরাতের বিশ্বাস ক্ষমতাকে শোষণের বদলে কল্যাণের, জুলুমের বদলে ইনসাফের এবং স্বেচ্ছাচারিতার বদলে জবাবদিহিতার পধপ্রদর্শন করে।৮. ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণের অভিলাষ বনাম ন্যায়বিচারের আদেশ:

দার্শনিকভাবে ক্ষমতা একটি দ্বি-মুখী অস্ত্র। ক্ষমতা কেবল শাসন নয়, এটি একটি সম্পর্কের জাল, যা মানুষের স্বাধীনতা বাড়াতে পারে, কমাতেও পারে। নবীজির শিক্ষায় ক্ষমতা একটি আমানত, যা মানুষের উপর শাসন নয়, বরং সেবার দায়িত্ব। কুরআনের ১৬:৯০ আয়াতের ন্যায় ও সুন্দর আচরণ এই ধারণাকে নৈতিক ও আধ্যাত্মিক ভিত্তি দেয়।

৯. শোষণমূলক চরিত্র বনাম শোষণ-প্রতিরোধ:
আল কুরআন সরাসরি মজলুমদের পক্ষে দাঁড়ানোর আদেশ দেয়Ñ এখানে সংগ্রাম কেবল আত্মরক্ষার জন্য নয়, বরং মানবমুক্তির একটি নৈতিক দায়িত্ব হচ্ছে জিহাদ। নবীর (সা.) জীবনে প্রতিরোধ কেবল প্রতিশোধ ছিল না; বরং ন্যায় পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য সেটা ছিলো পরিকল্পিত পদক্ষেপ। শোষণমূলক আধিপত্যবাদ দুর্বল রাষ্ট্রকে অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিকভাবে অধীন করে রাখে। নবীর (সা.) উদাহরণ ছড়িয়ে আছে হুদায়বিয়ার শান্তিচুক্তি থেকে বদরের প্রতিরোধসহ বহু ইতিবৃত্তে। এতে দেখা যায়, প্রতিরোধ কখনও সামরিক, কখনও কূটনৈতিক, কিন্তু সবসময় নৈতিক ভিত্তিসম্পন্ন ছিল।

১০. অসম আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বনাম সমতার নীতি:
সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থায় ক্ষমতার বৈষম্য বিদ্যমান। বিপরীতে নবীজির (সা.) শিক্ষা হলো সমতা, ন্যায়বিচার ও তাকওয়াভিত্তিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা। তিনি জাতিগত ও বর্ণগত ন্যায্যতার ঘোষণা করেন। শাসন বা মর্যাদার ভিত্তি কী? জন্ম, সম্প্রদায় বা রঙ নয়, বরং ভিত্তি হবে জ্ঞান, দক্ষতা, নৈতিকতা ও চরিত্র। তিনি ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের নীতিনির্দেশ করেন। কেননা ইসলামে শাসনক্ষমতা ব্যক্তিগত স্বার্থে নয়, জনগণের সেবা ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠার জন্য।

উপনিবেশবাদ, আধিপত্যবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের নিপীড়ক চক্র কেবল সাময়িক নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদী মানবিক ও নৈতিক সংকট। এই সংকট থেকে মুক্তির পথনির্দেশ করেছে নবীজির শিক্ষা।

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com