সংবিধানের ১৫ নম্বর অনুচ্ছেদে প্রবীণদের অধিকার নিশ্চিত করা হয়। এরই আলোকে প্রবীণদের মর্যাদাপূর্ণ, দারিদ্র্যমুক্ত, কর্মময়, সুস্বাস্থ্য ও নিরাপদ সামাজিক জীবন নিশ্চিত করতে জাতীয় প্রবীণ নীতিমালা ২০১৩ প্রণয়ন করা হয়। প্রবীণ নীতিমালা মতে, ৬০ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সের ব্যক্তিকে প্রবীণ হিসেবে গণ্য করা হয়। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী জন্মের পর বাংলাদেশের গড় আয়ু হচ্ছে ৭০.০৬ বছর। এর মধ্যে পুরুষদের আয়ু ৭০.০৬ বছর, নারীর ৭১.৯৮ বছর। আর ৬০ বছর বয়সের ঊর্ধ্বে প্রায় এক কোটি ৫৩ লাখ মানুষ বসবাস করছেন। তাঁদের কেউ কেউ ১০০ বছরের মতো বয়সের দীর্ঘ জীবন যাপন করছেন। এর মধ্যে নারী প্রবীণরা দীর্ঘজীবী হলেও তাঁদের বেশির ভাগই মানবেতর জীবন যাপন করতে বাধ্য হয়। এই দুঃসহ জীবনযাপন শুধু অসহায়ত্ব ও দুর্ভাগ্যজনক ছাড়া আর কিছু নয়।
প্রবীণ ও অসহায় মানুষের জন্য সরকারের কিছু কার্যক্রম রয়েছে। দরিদ্র, প্রান্তিক ও ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্য ও সামাজিক বৈষম্য কমানো এবং জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন নিশ্চিত করতে চায় সরকার। এ জন্য ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সুবিধাভোগীর সংখ্যা এবং মাথাপিছু বরাদ্দ উভয়ই বাড়ানোর দিকে নজর দেওয়া হয়েছে। বাজেটে বয়স্ক ভাতার মাসিক হার ৬০০ থেকে বাড়িয়ে ৬৫০ টাকা, বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা মহিলাদের মাসিক ভাতা ৫৫০ থেকে বাড়িয়ে ৬৫০ টাকা, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মাসিক ভাতা ৮৫০ থেকে বাড়িয়ে ৯০০ টাকা এবং মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচির আওতায় দেওয়া মাসিক ভাতার হার ৮০০ থেকে বাড়িয়ে ৮৫০ টাকা করা হয়েছে, যদিও এই ভাতার পরিমাণ যথেষ্ট নয়। দেশের ৫৫ লাখ মানুষ এই কর্মসূচির আওতায় আছেন।
বয়স্ক ভাতার ক্ষেত্রে বয়স বেশি দেখিয়ে ও দলীয় বিবেচনায় নাম তালিকাভুক্তির অভিযোগ আছে।
এখনো প্রবীণদের কোনো সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে পারেনি মন্ত্রণালয়। এমনকি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পরিচয়পত্রও দিতে পারেনি তারা। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রবীণ উন্নয়ন ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা হলে দেশের প্রতিটি জেলায় এক বা একাধিক প্রবীণ নিবাস বা আবাসন নির্মাণ, চিকিৎসাসেবা প্রদান, জীবন মান উন্নয়নে সহায়তা, সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও ব্যায়ামসহ নানা সুযোগ-সুবিধা পাবেন প্রবীণরা। এ ছাড়া বিনামূল্যে ও স্বল্প মূল্যে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানসহ সব ধরনের যানবাহনে আসন সংরক্ষণ করা হবে প্রবীণদের জন্য। পাশাপাশি বিশেষ ছাড়ে টিকিট দেওয়া, আলাদা টিকিট কাউন্টার স্থাপন, তাঁদের জন্য দিবা সেবাকেন্দ্র স্থাপন করা হবে। তাঁদের সম্পদ রক্ষা, সঞ্চয় প্রকল্প গ্রহণ ও বিনোদনমূলক ব্যবস্থা নেবে সরকার।
আমরা যাঁদের প্রবীণ বলি, তারাই তো দেশ পরিচালনা করছেন। বর্তমান প্রধান উপদেষ্টা ও উপদেষ্টামণ্ডলীর প্রায় সবাই প্রবীণ। আগের সরকারের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা, প্রধান বিচারপতি—সবাই প্রবীণ। অথচ সাধারণ প্রবীণরা আছেন মহাসংকটে। এর কারণ কী? এক প্রবীণ কেন অন্য বিপদগ্রস্ত প্রবীণের কথা ভাবতে পারছেন না? এটিই হলো সংকট। ব্র্যাক যিনি চালান, তাঁর বয়স ৮০ বছরের ওপরে, কিন্তু ওখানে চাকরির বয়সের সর্বোচ্চ সীমা ৩৫ বছর। দেশের প্রতিটি ব্যাংকের চেয়ারম্যান প্রবীণ, কিন্তু তাঁরা ৫২ বছর পর কাউকে ঋণ দেন না। কী অদ্ভুত বৈপরীত্য? সব প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার প্রবীণ। অথচ তাঁরা চাকরির ক্ষেত্রে কেবল তরুণ খোঁজেন!
বিজ্ঞজনরা বলছেন, বয়স্কদের প্রতি যত্নশীল হতে হবে। তাঁরা যেন কোনোভাবে নিজেদের তুচ্ছ, অবহেলিত মনে না করেন। বয়স্করা মানসিকভাবে অনেক স্পর্শকাতর হয়ে থাকেন, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। খাবারের ব্যাপারেও দিতে হবে বাড়তি গুরুত্ব। শিশুকে শেখান বয়স্কদের সঙ্গে কেমন আচরণ করতে হবে। জানার চেষ্টা করুন তাঁর শারীরিক অবস্থা। প্রয়োজন হলে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান। পরিবারের কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে তাঁর মতামতের গুরুত্ব দিন। সক্ষম বয়স্কদের কাজের ব্যবস্থা করতে হবে।