মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০৪:২১ পূর্বাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

জন্মভূমিতে এখনো অবহেলিত, উপেক্ষিত ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: মঙ্গলবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ১৫ বার পড়া হয়েছে
ভারত সরকারের পদ্মবিভূষণ, পদ্মভূষণ ও বিশ্বভারতী থেকে দেশি কোত্তম উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন। পেয়েছেন ঢাকা ও দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক আজীবন সদস্যপদ। তিনি বিশ্বখ্যাত সংগীতজ্ঞ, শাস্ত্রীয় সংগীতের বরপুত্র খ্যাত ‘সুরসম্রাট’ ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ। আজ শনিবার তাঁর ৫৩তম মৃত্যুবার্ষিকী।

ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর জন্মভূমি শিবপুর ও জেলা সদরে রেখে যাওয়া তাঁর আরেকটি বাড়িতে স্থাপিত ‘সুরসম্রাট দ্য আলাউদ্দিন খাঁ সংগীতাঙ্গন’ এ নিয়ে স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে গত বৃহস্পতিবার কথা হয়।তারা দুঃখ করে জানায়, সংগীত জগতের এই কিংবদন্তি সংগীতে বিশ্বভুবন জয় করলেও নিজ জন্মভূমিতে এখনো রয়ে গেছে চরম অবহেলিত ও উপেক্ষিত। তাঁর মৃত্যুর ৫৩ বছর পরও তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণে নেওয়া হয়নি তেমন কোনো পদক্ষেপ কিংবা উদ্যোগ!

সরজমিনে দেখা যায়, বিশ্বখ্যাত এই সংগীতজ্ঞের ঐতিহাসিক বাড়িটি এখন অবহেলা ও অযত্নে কর্দমাক্ত জলাবদ্ধ অবস্থায় অত্যন্ত নোংরা পরিবেশে অনেকটা ‘ছাড়াবাড়ি’র আদলে সুনসান নীরবতায় পড়ে থাকতে দেখতে যায়। বাড়িটির মাঝখানে থাকা পুরো উঠোনটি অত্যন্ত নোংরা, দুর্গন্ধযুক্ত পানিতে জলাবদ্ধ অবস্থায় ভাসছে।

Alauddin kha

স্থানীয়রা জানান, রাধিকা সড়কের ঠিক পাশেই অবস্থিত ৮/১০ শতকের এই ঐতিহাসিক বাড়িটির পূর্ব ভিটির যে ঘরটিতে (রসিঘর) আলাউদ্দিন খাঁ জন্মেছিলেন, সেই রসি ঘরটি (মূল ঘর) বহু বছর আগেই ঘরটির সংলগ্ন পুকুরের ভাঙ্গনে পানিতে নিমজ্জিত হয়ে যায়।

ঘরহীন খালি পড়ে থাকা ওই স্থানটির লাগোয়া ঠিক উত্তর পাশেই দেখা যায়, আলাউদ্দিন খাঁর প্রয়াত বাবা সবদর হোসেন খাঁ ওরফে সদু খাঁ ও মাতা সুন্দরী বেগমের দুটি পাকা কবর।

জানা যায়, এই কবর দুটি বহুদিন ধরে বিধ্বস্থ ও পরিত্যাক্ত অবস্থায় থাকলেও, বছর চারেক আগে অবহেলিত ওই কবর দুটি সাবেক ইউএনও একরামুল সিদ্দিকের উদ্যোগে পাকাকরণ ও সংস্কার করা হয়।

সরজমিনে আরো দেখা যায়, বাড়িটির মাঝখানে থাকা পুরো উঠোনটি অত্যন্ত নোংরা, দুর্গন্ধযুক্ত পানিতে জলাবদ্ধ অবস্থায় ভাসছে। এমন অপ্রত্যাশিত দৃশ্য দেখে কারও বিশ্বাসই হবে না, বিশ্বখ্যাত সুর সম্রাটের জন্মভিটার এই করুণ দশা। তবে বাড়িটির ঠিক পশ্চিম দিকে রাধিকা সড়ক ঘেষা সামনের সামান্য জায়গায় দুটো ছোট্ট টিনের চালের ঘর রযেছে।

 

Alauddin Kha 2

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওই দুটি ঘরে বর্তমানে অনেকটা মানবেতর জীবন যাপন করছেন আলাউদ্দিন খাঁর সঙ্গীত গুরু, বড় ভাই আধ্যাত্মিক সাধক ফকির তাপস আপ্তাব উদ্দিন খাঁর বংশধরেরা।

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, আপ্তাব উদ্দিন খাঁর কন্যা কমলা বেগমের ছেলে তোতা খানের বংশধর মো. সালাম খান ও তোতা খানের স্ত্রী ৯০ বছর বয়সী কদরন্নেছা বেগম বর্তমানে এই দুটি ঘরে বসবাস করছেন।

এই তোতা খান ছিলেন বিশ্ব সঙ্গীত জগতের আরেক নক্ষত্র ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁরই শিষ্য ওস্তাদ ফুলঝুঁরি খানের আপন ছোটভাই। (যার ছেলে ইউসুফ খান বর্তমানে বিটিভিতে কর্মরত, বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ সরোদ বাদক)।

এ সময় কালের কণ্ঠের পক্ষ থেকে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর পরিবারের এই অবহেলিত ঐতিহাসিক বাড়িটিতে বর্তমানে বসবাসরত সবচেয়ে বয়োজেষ্ঠ কদরন্নেছা বেগম ও তাঁর ছেলে মাসুম খানের সঙ্গে কথা হয়।

ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁকে আপনি দেখেছেন? এ প্রশ্ন করতেই নোংরা পানিতে জলাবদ্ধ থাকা বাড়িটির এক কোণে বসে বৃদ্ধা কদরন্নেছা বেগম বললেন, ‘দ্যাখছি না মানে? আলম নানারে তো (আলাউদ্দিন খাঁর ডাক নাম) আমি নিজের হাতে রান্না কইরা খাওয়াইছি। আমার মাইয়া তারে ফুলের মালা পড়াইছে। তাইনের কাছে তহন ম্যালা মানুষ দেহা করতে এই বাড়িতে আইতো। বাড়িতে আইলে সারাক্ষণ ঐ মসজিদটাতে পইড়া থাকতো। ইতান তো আমার সবই মনে আছে।’

আলাউদ্দিন খাঁর জন্মভিটার এমন করুণ দুর্দশা কেন, এমন প্রশ্ন করলে কদরন্নেছা বেগমের পাশে থাকা তাঁর ছেলে মাসুম খান বলেন, ‘প্রত্যেক বছর বড় আব্বার (আলাউদ্দিন খাঁ) মৃত্যু বার্ষিকী আইলেই আপনার মতো সাংবাদিকরা আইসা আমাগোরে এমুন প্রশ্ন করে। যাওয়ার সময় বইল্যা যায়, এইবার নাকি সরকার এই বাড়িটিতে আলাউদ্দিন খাঁর নামে বড় কইরা মিউজিম (মিউজিয়াম) বানাইব। কিন্তু বছরে পর বছর যায়, সবই ঠোস আর ঠাস! কিছুই হয়না।’

সাংবাদিক এসেছে, এই খবর জানতে পেরে এসময় বাড়িটিতে এসে হাজির হন প্রায় পাঁচ দশক ধরে শিবপুরে প্রতিষ্ঠিত ‘ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ স্মৃতি সংসদ’ এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, রানা শামীম রতন ও কালের কণ্ঠ শুভ সংঘের প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক, সহকারী অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন।

সঙ্গীতে বিশ্বজয়ী ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ এখনও কেন নিজ জন্মভূমিতে এতটা অবহেলিত, উপেক্ষিত এমন প্রশ্নের জবাবে কালের কণ্ঠকে বললেন, ‘আশির দশকে শিবপুরে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ স্মৃতি কমপ্লেক্স (সঙ্গীতের জাদুঘর) নির্মাণের জন্য সরকার একটি উদ্যোগ নিয়েছিল। যেখানে ওস্তাদজীর স্মৃতিকে ধরে রাখতে সঙ্গীত বিদ্যালয়, অতিথিশালা, স্মৃতি জাদুঘর, পাঠাগার, অডিটরিয়াম নির্মাণসহ সঙ্গীতের নানা দিক নিয়ে দেশ বিদেশের সঙ্গীত বিষারদেরা এখানে এসে গবেষণা করবে।  বিশাল এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য ওস্তাদ পরিবারের বংশধর প্রয়াত লাখু খান সেসময় সরকারকে নিজের জমিও দান (দলিল করে) করেছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও, সত্য গত ৫৪ বছরের কত সরকার এল আর কত সরকার গেল, ওস্তাদজীর জন্মভূমি শিবপুরে সরকারের নেয়া সেই পরিকল্পনাটি আজও বাস্তবায়ন হলো না।’

এরপর বাড়িটির সামান্য অদূরে রাধিকা আঞ্চলিক সড়ক সংলগ্ন বিশাল জায়গায় এলাকাবাসির উদ্যোগে ১৯৯৫ সালে ওস্তাদের নামানুসারে স্থাপিত ‘সুরসম্রাট আলাউদ্দিন খাঁ ডিগ্রি কলেজ’ এ ঢুকতেই বাঁ পাশে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর একটি চমৎকার ম্যুরাল চোখে পড়ে।

কলেজ কতৃপক্ষ জানান, আলাউদ্দিন ভক্ত সাবেক ইউএনও একরামুল ছিদ্দিকের সদিচ্ছায় চার বছর আগে কলেজটিতে ওস্তাদজীর এই ম্যুরালটি নির্মিত হয়।

এ সময় কথা হয় কলেজটির ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের সঙ্গে। গোটা শিবপুরে এই একটি মাত্র কলেজটি ছাড়া ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর স্মৃতিকে ধরে রাখতে এখনো কেন তাঁর স্মরণে কোন মিউজিয়াম (জাদুঘর) প্রতিষ্ঠাসহ তেমন কোন উদ্যোগ নেয়া হলো না, এমন প্রশ্নের জবাবে কলেজটির ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ এস এম রেজাউল কবির কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এর উত্তরতো আপনারা (সাংবাদিক) ভালো জানেন। প্রতি বছর ৬ সেপ্টেম্বর আসলেই ঢাকা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও নবীনগর থেকে সাংবাদিকেরা এসে এমন সব প্রশ্ন করে পত্রিকা ও টিভিতে সুন্দর সুন্দর রিপোর্ট করে। আমরা এসব দেখে ভাবি, হয়তো এবার এই শিবপুরে ওস্তাদ  আলাউদ্দিন খাঁর নামে কিছু একটা হবে! কিন্তু দেশ স্বাধীনের পর গত ৫৪ বছরে এই শিবপুরে এলাকাবাসির উদ্যোগে এই কলেজটি ছাড়া ওস্তাদজীর নামে আর কিছুই হলো না। যা সত্যিই দুর্ভাগ্যজনক।’

কলেজের পাশেই আলাউদ্দিন খাঁর সঙ্গীতগুরু, বড় ভাই ফকির আধ্যাত্মিক সাধক ও এ উপমহাদেশের প্রখ্যাত মরমি সঙ্গীত ‘মলয়া’র সুরস্রষ্টা ফকির তাপস আপ্তাব উদ্দিন খাঁর মাজার। ওই মাজারটিতে ফকির আপ্তাব উদ্দিন ছাড়াও তার স্ত্রী ও চতুর্থ ভাই নায়েব আলী খাঁ শায়িত আছেন বলে জানান স্থানীয়রা।

এসময় ওই মাজারটিতে জিয়ারত করতে আসা ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শহরের সাংস্কৃতিক সংগঠক, অংকুর শিশু কিশোর প্রতিষ্ঠানের সভাপতি, সঙ্গীতশিল্পী ও উপস্থাপক আনিছুল হক রিপন দু:খ করে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘‘আমি আপ্তাব উদ্দিন খাঁর মাজার জিয়ারত করতে এসে প্রায় দু’ঘন্টা ধরে ওস্তাদজীর জন্মভিটি, তাঁর নিজের হাতে তৈরী একটি জামে মসজিদ, সুরসম্রাট আলাউদ্দিন খাঁ ডিগ্রি কলেজ ও এই মাজারটি ঘুরে যা দেখলাম, তা  সত্যিই দু:খজনক। বিশেষ করে বাবা আলাউদ্দিনের জন্মভিটার যে ভয়ানক করুণ দুর্দশার চিত্র দেখলাম, সেটি বর্ণনা করা যাবে না। আমরা বাবা আলাউদ্দিনের ভক্তরা এই শিবপুরে তাই অচিরের তাঁর স্মৃতিকে ধরে রাখতে এখানে একটি ‘ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ স্মৃতি কমপ্লেক্স’ স্থাপনের জন্য সরকারের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি।’’

ওইসময় মাজারের পাশে একটি দোকানে বসে থাকা স্থানীয় বাসিন্দা দুই মুরুব্বী মলাই মিয়া ও অপর চা বিক্রেতা মতি মিয়া ওস্তাদের জন্মভূমি শিবপুরে সরকারের পক্ষ থেকে এখনো কোন পদক্ষেপ গ্রহণ না করায় ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর সব স্মৃতিচিহ্ন  ইতিমধ্যে ‘মুইচ্ছা যাইতাছে’ মন্তব্য করে বলেন, ‘শুধু বাংলাদেশ না, ইন্ডিয়া, আমেরিকা থাইক্যাও মাঝে মাঝে গান পাগল আলাউদ্দিন খাঁর ভক্তরা ওস্তাদজীর অবহেলিত বাড়িডা দেইখ্যা অনেকেই কাইন্দা (কেঁদে) যান। জানিনা, জীবদ্দশায় শিবপুরে আমরা আলাউদ্দিনের নামে কিছু দেইখ্যা যাইতে পারুম কিনা!’

এরপর শিবপুর সুরসম্রাট কলেজের ঠিক উত্তরদিকে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর ব্যক্তিগত অর্থায়নে ১৮৯৮ সালে স্থাপিত শিবপুর খাঁ পাড়া জামে মসজিদটিতে গিয়ে দেখা যায়, সংস্কার ও মেরামতের অভাবে অনেকটা বিধ্বস্থ অবস্থায় পড়ে আছে মসজিদটি।

সরজমিনে দেখা গেল, প্রাচীন এই ঐতিহাসিক মসজিদটি থেকে যে কোনো সময় পলেস্তরা পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এসময় নামাজ পড়তে আসা কয়েকজন মুসল্লী ওস্তাদজীর নিজ হাতে স্থাপিত প্রাচীন এই মসজিদটির আশু সংস্কার ও মেরামতের জন্য জোর দাবি জানান।

এরপর শিবপুর গ্রামটি ঘুরে কোথাও ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ স্মরণে তেমন কোনো স্মৃতিচিহ্ন খুঁজে না পেয়ে আমাদের প্রতিনিধি বিকেলে ছুটে যান ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সদরে অবস্থিত প্রাচীন সঙ্গীত শিক্ষালয় ‘সুরসম্রাট দ্য আলাউদ্দিন খাঁ সঙ্গীতাঙ্গন’ প্রাঙ্গণে। ১৯৫৬ সালে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর নিজের কেনা শহরের জেল রোডে অবস্থিত বিশাল এই একতলা বাড়িটিতেই তাঁর মৃত্যুর পর ‘সুরসম্রাট দ্য আলাউদ্দিন খাঁ সঙ্গীতাঙ্গন’ নামকরণ করে সঙ্গীতের নানা বিষয়ের উপর সারাবছর ধরে বিভিন্ন কর্মযজ্ঞ চলছে।

তবে সুরসম্রাট দ্য আলাউদ্দিন খাঁ সংগীতাঙ্গন সূত্র জানিয়েছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ছাত্রলীগ, ব্যবসায়ী ও পুলিশের সঙ্গে মাদ্রাসার ছাত্রদের সংঘর্ষে মাসুদুর রহমান নামের এক ছাত্রের নিহতের ঘটনায় বিগত ২০১৬ সালের ১২ জানুয়ারি সুরসম্রাট দি আলাউদ্দিন সংগীতাঙ্গনে ভয়াবহ হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। সে সময় এই সঙ্গীতাঙ্গনে সংরক্ষিত ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর ব্যবহৃত দুটি সরোদ, দুটি বেহালা, একটি সন্তুর, একটি ব্যাঞ্জো, একটি সারেঙ্গি, তাঁর হাতে লেখা অন্তত ২৫টি চিঠি, হজের সময় সৌদি আরবের বাদশাহর দেওয়া জায়নামাজ, ব্রিটিশ শাসনাধীন তৎকালীন ভারতের দেশীয় রাজ্য মাইহারের রাজা বৃজনাথ সিংয়ের দেওয়া রেওয়াজের দুটি গালিচা, তাঁর নিজের একটি বড় ছবি, দেশ-বিদেশের রাষ্ট্রনায়ক, সরকারপ্রধান ও বিশ্ব ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে তোলা অন্তত এক হাজার দুষ্প্রাপ্য আলোকচিত্র ও আলোকচিত্রের অনুলিপি নির্দয়ভাবে আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। যা মনে পড়লে আজও জেলার সংস্কৃতি অঙ্গনের মানুষেরা নীরবে কাঁদে।

আলাউদ্দিন খাঁ কেন নিজ জন্মভূমিতে এখনও অবহেলিত, উপেক্ষিত— এ নিয়ে তখন  এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলেন সুরসম্রাট দ্য আলাউদ্দিন সঙ্গীত বিদ্যায়তনের প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক, জেলা শহরের বিশিষ্ট নাট্যজন আবদুল মান্নান সরকার।

তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিশ্বাস করুন, এটি সত্যিই আমরা মেনে নিতে পারছি না যে, জগৎখ্যাত শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের এতবড় একজন মনিষী তাঁর নিজ জন্মভূমিতে এখনো কিভাবে এতটা অবহেলিত, উপেক্ষিত। দেশের কুষ্টিয়ায় লালন শাহ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং সিলেটে হাসন রাজা ও বাউল শাহ আবদুল করিমের স্মৃতিকে ধরে রাখতে সরকারি উদ্যোগে কত কিছু হচ্ছে, অথচ সারা পৃথিবীতে যিনি সঙ্গীতকে সুউচ্চ আসনে পরিচিত করিয়েছেন, সেই সুরের সম্রাট খ্যাত বাবা আলাউদ্দিনের জন্মভূমিতে তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণে এখনো কোনো কিছু করা হয়নি, সেটি কি ভাবা যায়, বলুন?’

এ বিষয়ে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর ভ্রাতুস্পুত্র,  একুশে পদকপ্রাপ্ত এ উপমহাদেশের প্রখ্যাত সঙ্গীত পরিচালক, শেখ সাদী খান (ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁর পুত্র) কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘‘আমাদের বাপ চাচাদের পাঁচ ভাইয়ের দ্বিতীয়জন বড় জেঠা মহাশয় (সুরসম্রাট) প্রায় ২০০ রকমের নানা বাদ্যযন্ত্র বাজাতে পারদর্শী ছিলেন। তবে তিনি ‘সরোদ শিল্পী’ হিসেবে গোটা পৃথিবীতে সুনাম ও পরিচিতি অর্জন করেছেন। এছাড়া, জগৎখ্যাত এই কিংবদন্তী, সুরস্রস্টা সঙ্গীতেভুবনে রাগ হেমন্ত, হেম-বেহাগ, মদন-মঞ্জরি, মঝ খাম্বাজ, শুভাবতী, দুর্গেশ্বরী, প্রভাকরী, হেমন্ত-ভৈরব ইত্যাদিসহ নতুন নতুন অনেক রাগরাগিণী সৃষ্টি করে গেছেন। যা আজ শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রভূত উন্নতির ক্ষেত্রে বিশাল এক অবদান রেখে যাচ্ছে। অথচ, সুরের যাদুকর এই বিশ্বখ্যাত ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ নিজ জন্মভূমিতে এখনও রয়ে গেলেন উপেক্ষিত, চরম অবহেলিত।’’

এমনকি বিশ্ব সঙ্গীত দরবারে তাঁকে সেভাবে তুলে ধরার জন্যও আমাদের  সরকারের পক্ষ থেকে তেমন কোনো উদ্যোগও দেখিনা, যা খুবই কষ্টদায়ক, পীড়াদায়ক—বললেন শেখ সাদী খান।

তবে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ তাঁর নিজ জন্মভূমিতে আর বেশি দিন অবহেলিত ও উপেক্ষিত থাকবেন না, এমন আশার বাণী শুনিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ দিদারুল আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘‘শিবপুরে আশির দশকে সরকারের নেয়া ‘ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ কমপ্লেক্স’ নির্মাণের সেই প্রকল্পটির কাজ শিগগিরই নতুন করে বাস্তবায়নের জন্য জেলা প্রশাসন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। আশা করছি, খুব শিগগিরই জেলাবাসি সেটি দেখতে পাবেন।’’

তিনি সহসাই জেলার সংস্কৃতি অঙ্গনের বোদ্ধাজনদের সঙ্গে নিয়ে অরক্ষিত, অবহেলিত থাকা আলাউদ্দিন খাঁর সেই জন্মভিটা দেখতে শিবপুর গ্রামে যাবেন বলেও আশ্বস্ত করেন।

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com