মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০৫:৫১ পূর্বাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চৌধুরী মামুন

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: বুধবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ৯ বার পড়া হয়েছে

কোনো ব্যক্তিকে উঠিয়ে আনা, গুম করা এবং ক্রসফায়ারে দেয়ার মতো সিরিয়াস নির্দেশনাগুলো সরাসরি দিতেন শেখ হাসিনা। কিছু নির্দেশনা দিতেন তার সামরিক উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিকী। র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ান-র‌্যাব পুলিশের আইজির আওতায় থাকলেও সব সময় চেইন অব কমান্ড মানা হতো না।
জুলাই-আগস্ট আন্দোলন যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছিল তখন ছাত্র সমন্বয়কদের তুলে আনার নির্দেশনা দিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। এটি বাস্তবায়ন করেন ডিবির হারুন। ‘রাজসাক্ষী’ হিসেবে এমন সাক্ষ্য দিয়েছেন শেখ হাসিনার সরকারের শেষ সময়কার আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন।গতকাল মঙ্গলবার বিচারপতি মো: গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তার সাক্ষ্য রেকর্ড করেন। জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেন চৌধুরী মামুন।

বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন প্রথমেই নিয়মানুযায়ী শপথ করে বলেন, ‘যাহা বলিব সত্য বলিবা। সত্য বৈ মিথ্যা বলিব না।’শপথের পর তিনি তার সাক্ষ্য প্রদান শুরু করেন। মামুন তার কর্মজীবন, শিক্ষা, পরিবার ও শৈশবের বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘আমি বিসিএস পুলিশ ক্যাডারে ১৯৮৬ সালের ২০ ডিসেম্বর যোগদান করি। বিভিন্ন পর্যায়ে পুলিশের দায়িত্ব পালনের পর ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি, র‌্যাবের মহাপরিচালক ও পুলিশের আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। আমাকে দুইবার চুক্তিভিত্তিক আইজিপি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। মোট ২২ মাস আইজিপির দায়িত্ব পালন করেছি। আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম। ছাত্রজীবনে সক্রিয় রাজনীতি করিনি। তবে আমার পরিবার আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। আমার বাবা সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার চেয়ারম্যান ছিলেন। আমার সুনাম এবং সরকারের প্রতি আমার কাজের স্বীকৃতি হিসেবে পুলিশের ডিআইজি, সিআইডির প্রধানসহ র‌্যাবের মহাপরিচালক হিসেবে আমাকে দায়িত্ব প্রদান করে। পরবর্তীতে পুলিশ বাহিনীতে গোপালগঞ্জ কেন্দ্রিক অফিসারদের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়ায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল আমার সততা, দক্ষতা বিবেচনাক্রমে আইজিপি হিসেবে নিয়োগ প্রদান করেন। পুলিশ বাহিনীর সুনাম এবং অফিসারদের মধ্যে প্রকাশ্যে গ্রুপিং যাতে দেখা না দেয়, সেজন্য আমাকে পরবর্তীতে দুইবার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয়। চৌধুরী মামুন বলেন, ২০১৪ সালে নির্বাচনের পর থেকে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে ব্যাপকভাবে রাজনৈতিক মেরুকরণ ও গোপালগঞ্জ কেন্দ্রিক বিভিন্ন বলয় তৈরি হয়। রাজনৈতিক বিষয় এবং বিতর্কিত কর্মকা-ে পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা জড়িয়ে পড়েন। সিনিয়র অফিসার হিসেবে আমার মতো পুলিশ কর্মকর্তাদের বাহিনীকে কন্ট্রোল করার সুযোগ সীমিত ছিল। রাজনৈতিক যোগাযোগ থাকায় বিতর্কিত পুলিশ অফিসাররা স্বাভাবিক আইন-কানুনের তোয়াক্কা না করে সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়নে ব্যাপক তৎপর ছিল।সাক্ষ্যে মামুন বলেন, ২০১৮ সালে নির্বাচনের সময় আমি ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি হিসেবে কর্মরত ছিলাম। তৎকালীন আইজিপি জাবেদ পাটোয়ারী রাতের বেলায় ব্যালট বক্সে প্রায় ৫০ শতাংশের মতো ভোট রাখার পরামর্শ সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দিয়েছিলেন বলে শুনেছি। মাঠপর্যায়ে সরকারের পক্ষ থেকে রাতে ব্যালট বাক্সে ভোট দেয়ার ব্যাপারে নির্দেশনা পাঠানো হয়। রাজনৈতিক নেতাদের সহযোগিতা ও উদ্যোগে জেলা প্রশাসন, ডিসি, ইউএনও, এসি ল্যান্ড, এসপি ও থানার ওসিরা মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। পরবর্তীতে পুলিশের বিপিএম ও পিপিএম পদক নির্বাচনের ক্ষেত্রে নির্বাচনসহ রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সক্রিয় পুলিশ অফিসারদের বিবেচনা করা হতো। এ ক্ষেত্রে সঠিকভাবে পেশাদারিত্ব দেখানো হয়নি।

রাজসাক্ষী সাবেক আইজিপি বলেন, ২০১৮ সালের পর পুলিশ বাহিনীতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও প্রভাব আরো বেশি বৃদ্ধি পায়। কিছু পুলিশ অফিসার প্রভাবশালী পুলিশ অফিসার হিসেবে স্বীকৃতি পান। এসব অফিসারদের নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তারাও তাদের নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা রাখতেন না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বাসায় রাতের বেলা নিয়মিত বৈঠক হতো। এ বৈঠক গভীর রাত পর্যন্ত চলত। মন্ত্রীর বাসায় নিয়মিত যাতায়াত ছিল ডিএমপি কমিশনার হাবিব, ডিবির হারুন অর রশীদ, এসবির মনিরুল ইসলাম, ডিআইজির নুরুল ইসলাম, বিপ্লব কুমার, অ্যাডিশনাল এসপি কাফি, ওসি মাজাহার, ওসি ফরমান, ওসি অপূর্ব হাসানসহ আরো বেশ কিছু অফিসারের। এরা কেউই আমি বা আইজিপির নির্দেশ সঠিকভাবে মানতেন না। তারা মনে করতেন রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাবান ও সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। প্রধানমন্ত্রীসহ সিনিয়র রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে তাদের কারো কারো ভালো সম্পর্ক ছিল। আইজিপি হিসেবে আমি চাইতাম- পুলিশ পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করুক।চৌধুরী মামুন বলেন, পুলিশে গোপালগঞ্জ জেলার অবস্থান বেশ শক্ত। অফিসার ও ওসি পর্যায়ে গোপালগঞ্জ জেলার প্রাধান্য ছিল। তারা সাধারণত কমান্ড মানতেন না এবং নিজেদের ইচ্ছামতো কাজ করতেন। এদের বিষয় সাধারণত দেখতেন তৎকালীন এসবি প্রধান মনিরুল ইসলাম ও পুলিশ কমিশনার হাবিবুর রহমান। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। ঢাকার বেশির ভাগ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে গোপালগঞ্জ জেলার পুলিশ অফিসার ছিলেন। পুলিশের মধ্যে অ্যাডিশনাল আইজিপি, তৎকালীন এসবি প্রধান মনিরুল ও কমিশনার হাবিবের মধ্যে সখ্যতা ছিল। তারা আলাদাভাবে তাদের লোকজন ও সমমনা পুলিশ অফিসারদের মেইনট্যান্স করতেন। পুলিশ বাহিনীর ইমেজ রক্ষায় ও নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব প্রথমিত করার লক্ষ্যে আমাকে আইজিপি করা হয়।তিনি বলেন, ২০২০ সালের ১৪ এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় আমি র‌্যাবের মহাপরিচালক ছিলাম। র‌্যাবের মহাপরিচালক থাকার কারণে আমি জানি যে, টিএফআই সেল র‌্যাবের সদর দফতরের অধীনে পরিচালিত হতো। এটির অবস্থান হলো উত্তরার র‌্যাব-১ এর কম্পাউন্ডের ভেতরে। এছাড়াও র‌্যাবের ইউনিটগুলোর অধীনেও আলাদা আলাদা সেল/বন্দিশালা ছিল। যেগুলো সংশ্লিষ্ট র‌্যাব ইউনিটগুলোর কমান্ডারদের অধীনে পরিচালিত হতো। র‌্যাব কর্তৃক রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বী এবং সরকারের জন্য হুমকি হয়ে ওঠা কোনো ব্যক্তিকে তুলে আনা এবং গোপন বন্দিশালায় আটক রাখার বিষয়টি র‌্যাবের ভেতরে একটা কালচার হিসেবে বিবেচিত হতো। তবে এই কাজগুলো প্রধানত র‌্যাব (অপারেশন্স) এবং র‌্যাবের গোয়েন্দা বিভাগের পরিচালকরা সমন্বয় করতেন।রাজসাক্ষী সাবেক আইজিপি চৌধুরী মামুন বলেন, র‌্যাব কর্তৃক কোনো ব্যক্তিকে উঠিয়ে আনা, গুম করার নির্দেশনা বা ক্রসফায়ারে হত্যা করার মতো সিরিয়াস নির্দেশনাগুলো সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে আসত বলে শুনেছি। আমার সময় আমি এ ধরনের আদেশ পাইনি। কিছু কিছু নির্দেশনা তৎকালীন নিরাপত্তা ও সামরিক উপদেষ্টা তারিক সিদ্দিকীর পক্ষ থেকে আসত বলে জানতে পারি। র‌্যাব যদিও পুলিশের আইজির অধীনে ছিল, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চেইন অব কমান্ড মানা হতো না। র‌্যাবের প্রধানরা আইজিপিকে উপেক্ষা করেই কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের নির্দেশে কাজ করত।

জুলাই-আগস্ট বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকালে পুলিশের আইজি ছিলেন চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন। ওই সময় দায়িত্ব পালন সম্পর্কেও তিনি তথ্য দেন। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট আন্দোলন দমনের জন্য তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বাসায় ১৯ জুলাই থেকে প্রায় প্রত্যেক রাতেই নিয়মিত ‘কোর কমিটির মিটিং হতো। আমি (চৌধুরী মামুন) কোর কমিটির সদস্য হিসেবে মিটিংয়ে উপস্থিত থাকতাম। সেখানে স্বরাষ্ট্র সচিব জাহাঙ্গীর, অতিরিক্ত সচিব রাজনৈতিক টিপু সুলতান, অতিরিক্ত সচিব রেজা মোস্তফা, তৎকালীন এসবি প্রধান মনিরুল ইসলাম, ডিবি প্রধান মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ, র‌্যাবের ডিজি ব্যারিস্টার হারুনুর রশিদ, ডিএমপি কমিশনার মো: হাবিবুর রহমান, বিজিবির ডিজি মেজর জেনারেল আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী, আনসারের ডিজি মেজর জেনারেল এ কে এম আমিনুল হক, তৎকালীন এনটিএমসির ডিজি মেজার জেনারেল জিয়াউল আহসান ও ডিজিএফআই প্রধান উপস্থিত থাকতেন। সেখানে আন্দোলন দমন থেকে শুরু করে বিভিন্ন পদক্ষেপের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হতো।কোর কমিটির একটি বৈঠকে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সমন্বয়দের আটকের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে ডিজিএফআই এবং তৎকালীন ডিবি প্রধান মোহাম্মদ হারুন অর রশীদকে তাদের আটক করার দায়িত্ব দেয়া হয়। পরবর্তীতে তাদের আটক করে ডিবি হেফাজতে নেয়া হয়। সরকারের সঙ্গে আপস করার জন্য মানসিক নির্যাতনসহ বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ করা হয়। তাদের আত্মীয়স্বজনকেও নিয়ে আসা হয়। সমন্বয়কদের আন্দোলন প্রত্যাহার করার জন্য টেলিভিশনে বিবৃতি প্রদানে বাধ্য করা হয়। কোর কমিটির মিটিংয়ে তাদের আটকের বিষয়ে আমি বিরোধিতা করি। কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সিদ্ধান্তের তাদের আটক করা হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জমান খান কামালের সঙ্গে ডিবি প্রধান হারুনের গভীর সম্পর্ক ছিল। হারুনকে ‘জ্বীন’ নামে ডাকতেন আসাদুজ্জামান খান কামাল। তিনি হারুনকে খুব কর্মতৎপর এবং সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে রাজনৈতিকভাবে খুব কার্যকর মনে করতেন।

চৌধুরী মামুন বলেন, র‌্যাব কর্তৃক কোনো ব্যক্তিকে উঠিয়ে আনা, গুম করার নির্দেশনা বা ক্রসফায়ারে হত্যা করার মতো সিরিয়াস নির্দেশনাগুলো সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে আসত বলে শুনেছি। আমার সময় আমি এই ধরনের আদেশ পাইনি। কিছু কিছু নির্দেশনা তৎকালীন নিরাপত্তা ও সামরিক উপদেষ্টা তারিক সিদ্দিকীর পক্ষ থেকে আসত বলে জানতে পারি। র‌্যাব যদিও পুলিশের আইজির অধীনে ছিল। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চেইন অব কমান্ড মানা হতো না। র‌্যাবের প্রধানরা আইজিপিকে উপেক্ষা করেই কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর দফতরের নির্দেশে কাজ করত।

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com