ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন এলাকায় ছাত্র সংগঠনগুলো সমর্থিত ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেন। এদিন উৎসবমুখর পরিবেশে প্রার্থীরা ভোটারদের কাছে লিফলেট বিতরণ ও হাসিমুখে কথা বলে প্রচারণা শুরু করেন।আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরুর দিন গতকাল সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনের মূল অডিটরিয়ামে ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিভিন্ন প্যানেল ও স্বতন্ত্র সহসভাপতি (ভিপি), সাধারণ সম্পাদক (জিএস), সহসাধারণ সম্পাদক (এজিএস) প্রার্থীদের এক সভা অনুষ্ঠিত হয়।সভায় প্রার্থীদের নির্বাচনী আচরণবিধি মেনে চলা এবং সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে রিটার্নিং কর্মকর্তারা দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। ডাকসু
নির্বাচনে আট কেন্দ্রে তিন স্তরের নিরাপত্তা, থাকবে সেনাবাহিনী : সিনেটে অনুষ্ঠিত সভায় নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে ভোট গ্রহণের দিন আটটি ভোটকেন্দ্রে তিন স্তরের নিরাপত্তা থাকবে বলে জানানো হয়। এর মধ্যে প্রথম স্তরে থাকবে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনসিসি সদস্য ও প্রক্টরিয়াল টিম। দ্বিতীয় স্তরে পুলিশ বাহিনী মোতায়েন থাকবে।আর তৃতীয় স্তরে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাতটি প্রবেশমুখে সেনাবাহিনী ‘স্ট্রাইকিং ফোর্স’ হিসেবে অবস্থান করবে। প্রয়োজন অনুযায়ী সেনাবাহিনী ক্যাম্পাসে প্রবেশ করবে এবং ভোট শেষে ফলাফল প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত ভোটকেন্দ্র সেনা সদস্যরা কর্ডন করে রাখবেন। ভোট গণনার সময় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ছাড়া অন্য কারো প্রবেশের সুযোগ থাকবে না।এ ছাড়া সভায় আরো জানানো হয়, ‘নির্বাচনের সাত দিন আগে থেকে আবাসিক হলে কোনো বহিরাগত থাকতে পারবে না।নিয়মিত টহল পরিচালনার মাধ্যমে এ ব্যবস্থা কার্যকর করা হবে। তবে ছাত্রীদের হলগুলোয় কখনো বহিরাগতরা থাকতে পারে না। নির্বাচনের আগের দিন (৮ সেপ্টেম্বর) ও নির্বাচনের দিন (৯ সেপ্টেম্বর) মেট্রো রেলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্টেশন বন্ধ থাকবে। নির্বাচনের দিন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস পুরোপুরি সিলগালা থাকবে। বৈধ শিক্ষার্থী, অনুমোদিত সাংবাদিক ও নির্বাচন পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা ছাড়া অন্য কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করতে পারবে না।যেসব শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসের বাইরে থাকেন, তাঁদের ভোটদানের জন্য বিভিন্ন রুটে বাসের অতিরিক্ত ট্রিপের ব্যবস্থা করা হবে। এসব বাস নির্বিঘ্নে চলাচল নিশ্চিত করতে পুলিশের পক্ষ থেকে সার্বিক সহযোগিতা করা হবে।’
ভোট গণনা হবে সিসিটিভি ক্যামেরার সামনে : ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচন ঘিরে কঠোর নিরাপত্তা নিশ্চিতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে বৈঠক করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। গতকাল সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনের কনফারেন্সকক্ষে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, গতকাল থেকেই ক্যাম্পাসের প্রবেশমুখ ও ভেতরে পুলিশের টহল জোরদার করা হয়েছে। এ ছাড়া বুথ ছাড়া পুরো ভোটকেন্দ্র সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় থাকবে। ভোট গণনাও সিসিটিভি ক্যামেরার সামনে সম্পন্ন হবে। সাইবার বুলিং বা অনলাইনে গুজব ছড়ানোর অভিযোগ এলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
‘স্মৃতি চিরন্তনে’ শ্রদ্ধায় ছাত্রদলের প্রচার শুরু : একাত্তরের শহীদদের স্মৃতি ফলক ‘স্মৃতি চিরন্তনে’ ফুলেল শ্রদ্ধা নিবেদন করে ডাকসু নির্বাচনের প্রচার শুরু করেছে ছাত্রদল। গতকাল বিকেল ৪টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি চত্বরে ‘স্মৃতি চিরন্তনে’ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন ছাত্রদল নেতাকর্মীরা। এ সময় ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রদলের ভিপি পদপ্রার্থী আবিদুল ইসলাম খান, জিএস প্রার্থী তানভীর বারী হামীম ও এজিএস প্রার্থী তানভীর আল হাদী মায়েদসহ অন্য সম্পাদক প্রার্থী ও সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে আবিদুল ইসলাম খান সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা ১৯ আগস্ট জুলাই শহীদদের স্মরণ করে তাঁদের কবর জিয়ারতের মধ্য দিয়ে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছিলাম। আজ মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের স্মৃতি স্মরণ করে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে আমাদের প্রচারণা শুরু করছি।’
ঢাবির কেন্দ্রীয় মসজিদ থেকে শিবিরের প্রচারণা : গতকাল দুপুর থেকে প্রচার কার্যক্রম শুরু করেছে ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থীজোট। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ থেকে তাঁরা কার্যক্রম শুরু করেন। পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ভিপি প্রার্থী সাদিক কায়েম। তিনি বলেন, আমরা কেমন বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণ করতে চাই, সে রূপরেখা শিক্ষার্থীদের দেওয়া উচিত। কিন্তু আমরা যদি প্রোপাগান্ডা করি, ট্যাগিং এবং ফ্রেমিংয়ের রাজনীতি করি, তাহলে শিক্ষার্থীরা তাঁদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবেন। তিনি আরো বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়কে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান থেকে একাডেমিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে চাই আমরা।
শিবির সমর্থিত প্যানেলের ছবি ভাঙচুর : ডাকসু নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচারণার প্রথম দিনেই ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেলের ছবি ভাঙচুর করা হয়েছে। গতকাল ঢাবির চারুকলা অনুষদে ছাত্রশিবির সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোটে’র ফেস্টুন ফেলে দেওয়া হয়েছে ও হিজাব পরিহিত নারী প্রার্থীর মুখ কালি দিয়ে লেপে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এদিন সকালে চারুকলা অনুষদে ছাত্রশিবির তাদের পূর্ণাঙ্গ প্যানেলের ছবিসংবলিত ফেস্টুনটি টানানোর কিছুক্ষণের মধ্যে ভেঙে ফেলা হয়। যদিও এই ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত, তা নিশ্চিত করে জানা যায়নি।
অন্যদের প্রচারণা : এ ছাড়া গতকাল সকাল ১১টার দিকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে প্রতিরোধ পর্ষদের ভিপি প্রার্থী শেখ তাসনিম আফরোজ ইমি, জিএস প্রার্থী মেঘমল্লার বসু এবং এজিএস প্রার্থী মো. জাবির আহমেদ জুবেলের নেতৃত্বে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের মাধ্যমে পর্ষদের নির্বাচনী প্রচারণার কার্যক্রমের সূচনা করা হয়। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে প্রতিরোধ পর্ষদের প্রার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান অনুষদের সামনে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেন।জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবর জিয়ারতের মধ্য দিয়ে ডাকসু নির্বাচনের প্রচারণা শুরু করেছে ইসলামী ছাত্র আন্দোলন সমর্থিত প্যানেল ‘সচেতন শিক্ষার্থী সংসদ’। গতকাল সকাল পৌনে ১১টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজী নজরুল ইসলামের কবর জিয়ারত করেন সংগঠনটির নেতাকর্মীরা।এ ছাড়া দুপুরের দিকে জগন্নাথ হলের বধ্যভূমিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে ‘স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্য’-এর প্রচারণা কার্যক্রম শুরু করা হয়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন এই প্যানেলের ভিপি প্রার্থী উমামা ফাতেমা, জিএস প্রার্থী আল সাদী ভূঁইয়াসহ অন্য সদস্যরা।
‘সমন্বিত শিক্ষার্থী সংসদ’ নামে একটি স্বতন্ত্র প্যানেল গতকাল সকালে ক্যাম্পাস এলাকায় গণসংযোগ শুরু করে। মো. জামাল উদ্দীন খালিদ এই প্যানেল থেকে ভিপি প্রার্থী।এ ছাড়া কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে থেকে কয়েকজন স্বতন্ত্র প্রার্থী দুপুরের দিকে ডাকসু নির্বাচনের প্রচারণা শুরু করে। তাঁদের মধ্য রয়েছেন স্বতন্ত্র এজিএস প্রার্থী তাহমীদ আল মুদ্দাসসির চৌধুরী, স্বতন্ত্র ক্রীড়া সম্পাদক প্রার্থী জহিন ফেরদৌস জামি ও স্বতন্ত্র সদস্য প্রার্থী সরদার নাদিম মাহমুদ শুভ।বিকেল ৪টায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের নিয়ে গঠিত নতুন ছাত্রসংগঠন বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র আন্দোলনের সমর্থিত প্যানেল ‘বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সংসদ’-এর ডাকসু ও হল সংসদের নির্বাচনী প্রচার শুরু করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলপাড়া এলাকার কবি জসীমউদ্দীন হলের মাঠ থেকে তারা তাদের নির্বাচনী প্রচার শুরু করে। এ সময় উপস্থিত ছিলেন প্যানেলটির ভিপি পদপ্রার্থী আব্দুল কাদের, জিএস পদপ্রার্থী আবু বাকের মজুমদার, এজিএস পদপ্রার্থী আশরেফা খাতুনসহ তাদের পূর্ণাঙ্গ প্যানেল। বিকেল ৪টা থেকে তারা হলপাড়া এলাকায় শুরু করে ব্যবসা শিক্ষা অনুষদ প্রাঙ্গণ হয়ে শ্যাডোতে এসে এদিনের মতো প্রচার শেষ করে।