গাজা উপত্যকায় আনুষ্ঠানিকভাবে দুর্ভিক্ষ ঘোষণা করেছে জাতিসংঘ-সমর্থিত ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশন (আইপিসি ফেজ)। সংস্থার সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৫ আগস্ট ২০২৫ পর্যন্ত গাজা গভর্নরেটে দুর্ভিক্ষ (আইপিসি ফেজ -৫) নিশ্চিত হয়েছে, যা এখন ভয়াবহ বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। ওই অঞ্চলে অক্টোবর ২০২৩ থেকে ইসরাইলি হামলায় ইতোমধ্যেই ৬২ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।
একাধিক দেশ, আন্তর্জাতিক রেডক্রস কমিটি এবং জাতিসংঘের সংস্থা আবারও ইসরাইলকে আহ্বান জানিয়েছে গাজায় পর্যাপ্ত মানবিক সহায়তা সরবরাহের সুযোগ দিতে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডাব্লিউএইচও) সতর্ক করেছে যে, দুর্ভিক্ষের কারণে শিশুদের মধ্যে সাধারণ অসুস্থতাও প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে। ডাব্লিউএইচও মহাপরিচালক তেদ্রোস আধানম গেব্রিয়েসুস বলেছেন, ‘এ মানব-সৃষ্ট ব্যাপক অপুষ্টির কারণে এমনকি সাধারণ রোগ যেমন ডায়রিয়াও শিশুদের মধ্যে প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে।‘ইউরোপীয় কমিশনার হাদজা লাহবিব ইসরাইলকে আহ্বান জানিয়েছেন, গাজায় ‘বাধাহীন’ মানবিক প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে হবে, কারণ দুর্ভিক্ষ এখন ফিলিস্তিনি অঞ্চলে এক বাস্তবতা। তিনি বলেন, ‘দুর্ভিক্ষ এখন গাজায় বাস্তবতা। মানুষ অনাহারে মারা যাচ্ছে’।
জাতিসংঘের চারটি সংস্থা- এফ-এ-ও, ইউনিসেফ, ডাব্লিউ এইচ ও এবং বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডাব্লিউ-এফ-পি) এক যৌথ বিবৃতিতে আবারও অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি এবং মানবিক সহায়তার আহ্বান জানিয়েছে, যাতে অনাহারে মৃত্যুর সংখ্যা কমানো যায়।আন্তর্জাতিক রেডক্রস কমিটি বলেছে, ‘আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুযায়ী দখলদার শক্তি হিসেবে ইসরাইলের দায়িত্ব হলো গাজার বেসামরিক জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণ করা এবং তা করতে এটি তার সকল সংস্থান ব্যবহার করবে’। সংস্থাটি আরো জানিয়েছে, ‘ফিলিস্তিনি অঞ্চলে দুর্ভিক্ষ ঘোষণা অবশ্যই অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রেরণা হিসেবে কাজ করা উচিত’।
আয়ারল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী মিশেল মার্টিন বলেছেন, গাজার দুর্ভিক্ষ পূর্বানুমেয় এবং প্রতিরোধযোগ্য ছিল। তিনি ইসরাইলকে অবিলম্বে যুদ্ধ থামানো ও ত্রাণ প্রবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি এই দুর্ভিক্ষকে ‘সম্পূর্ণরূপে মানুষ-সৃষ্ট বিপর্যয়’ আখ্যা দিয়ে বলেন, যথেষ্ট সাহায্য প্রবেশ না দেওয়ার কারণেই এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সেøাভেনিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী টানজা ফাজন এক্স-এ লিখেছেন, ‘গাজায় দুর্ভিক্ষ মানে মানুষকে অনাহারে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া। এটি অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে’ স্কটল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার জন সোয়িনি বলেছেন, পরিবার ও শিশুদের অনাহারে মৃত্যু কেবল ট্র্যাজেডিই নয়, বরং এটি ‘সরাসরি গণহত্যা’। জার্মান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জোসেফ হিন্টারসেহার স্বীকার করেছেন, গাজায় ক্ষুধা বাস্তব এবং দুর্ভিক্ষ চলছে।
সউদী আরব ইসরাইলকে গাজায় গণহত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত করে বলেছে, দুর্ভিক্ষ মানবতার বিবেকের ওপর কলঙ্ক। সউদী পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ত্রাণে বাধা ও জনগণকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করা ইসরাইলি সেনাদের পরিকল্পিত অপরাধ।এক বিবৃতিতে সউদীর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ইসরাইলের অপরাধের পুনরাবৃত্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং জবাবদিহিতা না থাকায় গাজায় মানবিক বিপর্যয় পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়েছে। সউদী বলেছে, যদি এই ‘গণহত্যার যুদ্ধ’ থামানোর জন্য এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়া হয় তাহলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশেষ করে জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিলের স্থায়ী সদস্যদের বিবেকের ওপর এটি একটি ‘কলঙ্ক’ হিসেবে থাকবে।
অন্যদিকে সুইজারল্যান্ড বলেছে, গাজায় দুর্ভিক্ষ মোকাবিলায় অবিলম্বে বৃহৎ পরিসরে মানবিক হস্তক্ষেপ দরকার। তারা এক্স-এ পোস্ট করে জানিয়েছে, ‘দুর্ভিক্ষ আরো গভীর হওয়ার আগে দ্রুত ও ব্যাপক ত্রাণ সহায়তা পৌঁছানো জরুরি’।
বিশ্ব সম্প্রদায়ের একযোগে উদ্বেগ ও তীব্র নিন্দার পরও গাজায় সহায়তা প্রবেশে বাধা অব্যাহত রয়েছে। শিশু ও পরিবারগুলো প্রতিদিন অনাহারে মারা যাচ্ছে। এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- মানবিক বিপর্যয়ের এ করুণ দৃশ্য কি থামানো সম্ভব হবে, নাকি গাজা আরো গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে?এদিকে জাতিসংঘের খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ক সংস্থা আইসিপি বলেছে, গাজা গভর্নরেটের গাজা সিটি ও এর আশপাশের এলাকায় দুর্ভিক্ষ শুরু হয়েছে। আইপিসি খাদ্য সংকটের মানদ-ে গাজা সিটিকে তাদের শ্রেণিবিভাগে ‘পঞ্চম ধাপে’ উন্নীত করেছে। যা খাদ্য সংকটের সর্বোচ্চ ধাপ। যার অর্থ গাজা সিটি ও আশপাশের এলাকার মানুষ এখন অনাহার এবং চরম দারিদ্রতায় ভুগছেন এবং মানুষ খাওয়ার জন্য কিছুই পাচ্ছেন না। গাজার সিটির পর দেইর এল-বালাহ এবং খান ইউনুস শহরও একই দিকে এগোচ্ছে। সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে এ দুটি শহরে দুর্ভিক্ষ শুরু হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে সংস্থাটি। যার অর্থ গাজাজুড়ে ৫ লাখের বেশি মানুষ দুর্ভিক্ষের কবলে থাকবেন। এছাড়া গাজার মোট জনসংখ্যার ৫৪ শতাংশ বা ১০ লাখ ৭ হাজার মানুষ আইপিসির ‘ধাপ-৪’ এ রয়েছেন। তারা খাদ্য জরুরি অবস্থার মধ্যে আছেন। এসব মানুষ খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাচ্ছেন। অপরদিকে ৩ লাখ ৯৬ হাজার মানুষ (জনসংখ্যার ২০ শতাংশ) ‘ধাপ-৩’ এ আছেন। তারাও খাদ্য সংকটে পড়ার ঝুঁকির মধ্যে আছেন। এদিকে, যুদ্ধ এবং মানবিক সাহায্যের ওপর বারবার নিষেধাজ্ঞার মধ্যে গাজার সংকট প্রায় দুই বছর ধরে অব্যাহত রয়েছে। সূত্র : টিআরটি গ্লোবাল ও সউদী গ্যাজেট।