মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী সংকট আবারও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের সর্বশেষ উত্তেজনা পরিস্থিতিকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছে, যেখানে হাজার হাজার নিরীহ ফিলিস্তিনি আবারও নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হচ্ছেন। ক্ষুর্ধাথ অঞ্চলসহ গাজা ও পশ্চিম তীরের বহু জায়গায় ব্যাপক হামলার কারণে ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে, অবকাঠামো ভেঙে পড়েছে এবং বেঁচে থাকার মৌলিক উপকরণ—খাদ্য, পানি ও ওষুধের চরম সংকট দেখা দিয়েছে। এই ভয়াবহ পরিস্থিতির কারণে বহু মানুষ অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই নিতে বাধ্য হচ্ছেন, আবার কেউ কেউ সীমান্তবর্তী অঞ্চলে পালিয়ে যাচ্ছেন জীবন বাঁচানোর জন্য। শিশু ও নারীদের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি; তাদের মধ্যে অনেকেই মারাত্মক আহত কিংবা ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কাহিল হয়ে পড়েছেন।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের খবরে জানা গেছে, গত কয়েক দিনে ইসরায়েলি বিমান হামলা ও গোলাবর্ষণে ক্ষুর্ধাথসহ আশেপাশের গ্রাম ও বসতিগুলো প্রায় বিরানভূমিতে পরিণত হয়েছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েছেন বহু মানুষ। যে পরিবারগুলো কোনোভাবে বেঁচে গেছেন, তারা জীবনের নিরাপত্তার জন্য ঘর ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন। হাজার হাজার মানুষ কেবল একটি ব্যাগ বা হাতে থাকা সামান্য জিনিসপত্র নিয়ে আশ্রয়ের খোঁজে পথে নেমেছেন। তাদের অনেকেরই জানা নেই সামনে কোথায় থামতে হবে, কিংবা কোথায় তারা নিরাপদ আশ্রয় পাবেন। যুদ্ধ পরিস্থিতি তাদের জন্য এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ তৈরি করেছে।
জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই ক্রমবর্ধমান মানবিক বিপর্যয় নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (UNHCR) জানিয়েছে, প্রতিদিনই কয়েক হাজার মানুষ নিজেদের বাড়ি-ঘর হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হচ্ছেন। স্কুল, হাসপাতাল ও মসজিদে তারা আশ্রয় নিলেও সেখানেও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না, কারণ হামলার আওতা প্রায় সর্বত্র বিস্তৃত হয়েছে। গাজা স্ট্রিপ ও পশ্চিম তীরের মতোই ক্ষুর্ধাথ অঞ্চলেও খাদ্য ও চিকিৎসা সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে অবরুদ্ধ এই অঞ্চলের মানুষদের এখন জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে।
শিশুরা বিশেষভাবে এই সংকটের শিকার। শিক্ষা বন্ধ হয়ে গেছে, খেলাধুলা বা স্বাভাবিক শৈশব হারিয়ে তারা এখন কেবল যুদ্ধের ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা পাচ্ছে। হাজার হাজার শিশু তাদের বাবা-মা হারিয়েছে বা আহত অবস্থায় চিকিৎসাহীন হয়ে কষ্ট পাচ্ছে। অনেক শিশু মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে, তারা সারাক্ষণ আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। এ ছাড়া গর্ভবতী নারীদের জন্য পর্যাপ্ত চিকিৎসা নেই, ফলে মাতৃমৃত্যুর হার বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ফিলিস্তিনের স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, ক্ষুর্ধাথ এলাকায় এখন আর কোনো নিরাপদ আশ্রয় নেই। ঘরবাড়ি, দোকানপাট, স্কুল ও বাজার ধ্বংস হয়ে গেছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ, পানি ও খাবারের তীব্র সংকট চলছে। হাসপাতালে চিকিৎসা সামগ্রী শেষ হয়ে যাওয়ায় ডাক্তাররা অসহায় হয়ে পড়েছেন। অনেক মানুষ আহত অবস্থায় চিকিৎসা না পেয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছেন। যারা জীবিত আছেন তারা প্রতিদিন বেঁচে থাকার জন্য জীবন-মৃত্যুর লড়াই চালাচ্ছেন।
আন্তর্জাতিক মহল ইতোমধ্যে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র ও আরব লীগ উভয় পক্ষকে সংযম প্রদর্শন এবং আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খুঁজে বের করার জন্য অনুরোধ করেছে। তবে এখন পর্যন্ত বাস্তব পরিস্থিতিতে এর কোনো প্রভাব পড়েনি। বরং সংঘাত দিন দিন আরও তীব্র আকার ধারণ করছে। স্থানীয় পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ইসরায়েলি বাহিনীর সামরিক অভিযানের কারণে ফিলিস্তিনিদের জন্য জীবনযাপন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় তারা ঘর ছেড়ে চলে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় দেখছেন না।
ক্ষুর্ধাথের বাস্তুচ্যুত মানুষদের অধিকাংশ এখন অস্থায়ী শিবিরে অবস্থান করছেন। সেখানে শীত, গরম, খাদ্যাভাব ও রোগব্যাধির ভোগান্তি নতুন করে তাদের দুর্দশা বাড়াচ্ছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা সাহায্যের চেষ্টা করলেও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে তা পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে হাজার হাজার মানুষ না খেয়ে দিন কাটাচ্ছেন। বিশেষ করে শিশুদের জন্য দুধ ও পুষ্টিকর খাবার সরবরাহ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এর ফলে অপুষ্টিজনিত জটিলতা দেখা দিচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ফিলিস্তিনি জনগণ বছরের পর বছর ধরে সংঘাত ও বাস্তুচ্যুতির শিকার হচ্ছেন। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় ভয়াবহ। ক্ষুর্ধাথের মানুষজন মনে করছেন, তারা যেন দুনিয়ার সবচেয়ে অবহেলিত ও পরিত্যক্ত জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছেন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় থেকে সহানুভূতি পেলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে না।
মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, প্রতিনিয়ত ফিলিস্তিনিদের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। নিরাপত্তা, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষার অধিকার থেকে তারা বঞ্চিত। সবচেয়ে বড় কথা, তাদের জীবনের অধিকার হুমকির মুখে। প্রতিদিন নতুন নতুন মানুষ নিহত হচ্ছেন, আহত হচ্ছেন বা বাস্তুচ্যুত হচ্ছেন। বিশ্ববাসীর কাছে এই সংকট এখন মানবিক বিপর্যয়ের এক করুণ চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সর্বশেষ তথ্যানুসারে, ক্ষুর্ধাথ অঞ্চল থেকে কয়েক হাজার মানুষ ইতোমধ্যে ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে গেছেন। যাদের অনেকেই সীমান্তবর্তী এলাকায় অস্থায়ীভাবে আশ্রয় নিচ্ছেন। তবে সেই আশ্রয়ও দীর্ঘস্থায়ী নয়। মানবিক সাহায্য পৌঁছাতে না পারলে আরও বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সবশেষে বলা যায়, ক্ষুর্ধাথ ফিলিস্তিনিদের ঘর ছাড়ার এই মর্মান্তিক দৃশ্য কেবল একটি অঞ্চলের নয়, বরং গোটা ফিলিস্তিনের চলমান দুর্দশার প্রতিচ্ছবি। যুদ্ধ, দখল ও ধ্বংসযজ্ঞের শিকার নিরীহ সাধারণ মানুষ তাদের স্বাভাবিক জীবনযাপন থেকে বঞ্চিত হয়ে প্রতিনিয়ত মৃত্যুভয় নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। এভাবে বারবার বাস্তুচ্যুত হয়ে তারা আজ দিশেহারা। আন্তর্জাতিক মহল যদি কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, তবে এই মানবিক বিপর্যয় আরও ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করবে।