জুলাই অভ্যুত্থানে নিহত শহীদ আস-সাবুরের বাবা মো. এনাব নাজেজ জাকি বলেছেন, ‘যেভাবে আসামিরা আমার ছেলেকে গুলি করে পুড়িয়ে হত্যা করেছে, আমি সে রকমই শাস্তি চাই।’
গতকাল সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রইব্যুনাল-১-এ সাক্ষ্য দিতে গিয়ে তিনি এ কথা বলেন। বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে বিচারপতি শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী সদস্য হিসেবে রয়েছেন।
গত বছর ৫ আগস্ট গণ-আন্দোলনে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের দিন সাভারের আশুলিয়ায় আন্দোলনকারী পাঁচজনের লাশের সঙ্গে আরো একজনকে মরণাপন্ন অবস্থায় পোড়ানো হয়।
গতকাল মামলায় তিনজন সাক্ষ্য দেন। তাঁরা হলেন শহীদ আস-সাবুরের বাবা এনাব নাজেজ জাকি, যাত্রাবাড়ীতে নিহত ইমাম হাসান তায়িমের ভাই রবিউল আওয়াল ভূঁইয়া এবং রাজশাহীতে নিহত আলী রায়হানের সহযোদ্ধা জসিম উদ্দিন।সাক্ষ্যে এনাব নাজেজ জাকি বলেন, ‘৫ আগস্ট বিকেলে ছেলের মোবাইল বন্ধ পাওয়া যায়। ৬ আগস্ট আশুলিয়া থানার সামনে পোড়া লাশ থাকার খবর পেয়ে আমাদের আত্মীয়রা গিয়ে পোড়া টি-শার্ট ও মোবাইল সিম দেখে আস-সাবুরকে শনাক্ত করেন।’
তিনি জানান, ‘সেনাবাহিনীর কাছ থেকে লাশ নেওয়ার পর আমি একনজর তাকিয়ে দেখি, চেহারা এতটাই বিকৃত ছিল যে চেনার উপায় ছিল না।’
এনাব জাকি অভিযোগ করেন, ‘শেখ হাসিনার নির্দেশে ওবায়দুল কাদেরের উসকানিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কামাল ও আইজিপি মামুনের নির্দেশে পুলিশ আমার ছেলেকে হত্যা করে।আশুলিয়া থানার ওসি, এসআই, কনস্টেবল, ডিবি কর্মকর্তা ও স্থানীয় সাবেক এমপি সাইফুল ইসলামের সহায়তায় ছয়জনকে পুলিশ ভ্যানে তুলে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মারা হয়।’তিনি দুটি ভিডিও দাখিল করেন। একটিতে দেখা যায় পোড়া লাশ রিকশাভ্যানে তোলা হচ্ছে, অন্যটিতে পুলিশভ্যানে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ভিডিওতে ছেলের লাশ শনাক্ত করে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
তিনি বলেন, ‘আমি আমার ছেলের হত্যাকারীদের শান্তি চাই না, বিচার চাই।যেভাবে তারা আমার ছেলেকে পুড়িয়ে হত্যা করেছে, আমি সে ধরনের শাস্তিই চাই।’পরে আসামিপক্ষের রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মো. আমীর হোসেন তাঁকে জেরা করেন। এরপর সাক্ষ্য দেন শহীদ ইমাম হাসান তায়িমের বড় ভাই রবিউল আওয়াল ভূঁইয়া।
তিনি বলেন, গত বছরের ২০ জুলাই রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে তায়িম গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। সেদিন তিনি সিলেটে ছিলেন। ফোনে মায়ের কাছে খবর পেয়ে তিনি জানতে পারেন, কাজলা ফুটওভার ব্রিজের পাশে তায়িমের রক্ত ও জুতা পড়ে ছিল। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, পুলিশ তাঁকে ভ্যানে করে যাত্রাবাড়ী থানার দিকে নিয়ে গেছে।
রবিউল বলেন, পরে খালা শাহিদা আক্তার ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে সাংবাদিকের কাছে তায়িমের ছবি দেখে শনাক্ত করেন। তাঁর শরীরে ২০০টির মতো ছররা গুলির চিহ্ন ছিল।
তায়িমের বন্ধু রাহাতের বরাত দিয়ে রবিউল বলেন, ‘গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর তায়িম আধা ঘণ্টা ঘটনাস্থলে পড়ে ছিল। সাংবাদিকরা তাঁকে উদ্ধার করতে চাইলে পুলিশ বাধা দেয়। পরে পুলিশভ্যানে করে নিয়ে গিয়ে বুট দিয়ে মাড়িয়ে তাঁর মুখমণ্ডল বিকৃত করে।’
তিনি বলেন, ‘সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সাবেক আইজিপি, সাবেক স্বরাষ্ট্রসচিবদের নির্দেশে আন্দোলনে অংশ নেওয়া প্রায় দুই হাজার ছাত্র-জনতাকে হত্যা করা হয়। আমি তাদের ফাঁসি চাই।’
সাক্ষ্য শেষে তিনি একটি ভিডিও পেনড্রাইভে দাখিল করেন, যাতে তায়িমকে গুলি করার দৃশ্য রয়েছে। ভিডিও প্রদর্শনের সময় তিনিও কান্নায় ভেঙে পড়েন।
সাক্ষ্য দেন জসিম উদ্দিনও। তিনি বলেন, ৫ আগস্ট রাজশাহীতে স্বচ্ছ টাওয়ারের সামনে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের কর্মীদের গুলিতে আলী রায়হান নিহত হন। ৮ আগস্ট হাসপাতালে মারা যান তিনি।
তিনি বলেন, ‘এই হত্যার দায়ে শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদের, আইজিপি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও স্থানীয় মেয়র খায়রুজ্জামান লিটনের ফাঁসি হওয়া উচিত।’
তিনিও আলী রায়হানকে নিয়ে ভিডিও দাখিল করেন এবং আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগ নেতাদের শনাক্ত করেন। ভিডিওতে আহত রায়হানকে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন। জেরা শেষে ট্রাইব্যুনাল বুধবার পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য করেন।