মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০২:০৮ পূর্বাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

চীনা বিনিয়োগকারীদের আগমন

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: রবিবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৫
  • ৫ বার পড়া হয়েছে

চলতি মাসের ৭ তারিখ থেকে কার্যকর করা মার্কিন পাল্টা শুল্কের প্রভাব এখন স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। মার্কিন বাজারে চীনা ও ভারতীয় পণ্যের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপের ফলে বাংলাদেশ এখন ক্রেতাদের নজরে এসেছে। এই পরিস্থিতি দেশের রফতানিমুখী পোশাক খাতকে নতুন সম্ভাবনার মুখে দাঁড় করিয়েছে।বাংলাদেশি তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তা ও রফতানিকারকরা বলছেন-মার্কিন বাজারে চীনা ও ভারতীয় পণ্যের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপের ফলে ক্রেতারা দ্রুত অর্ডার স্থানান্তর করছেন এবং এ সুযোগে বাংলাদেশকে নতুন বিনিয়োগ ও অর্ডারের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বিবেচনা করছেন। এই পরিস্থিতি শুধু রফতানিতে বৃদ্ধি আনছে না, বরং শিল্পে নতুন বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাও তৈরি করছে। শিল্প সংশ্লিষ্টরা আশাবাদী, চীন থেকে সরানো অর্ডার প্রবাহ আগামী মাসগুলোতে আরও বাড়তে পারে। ইউরোপীয় ক্রেতারাও বাংলাদেশে অর্ডার বাড়াতে আগ্রহী। সঠিক সহায়তা ও অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ ২০২৮ সালের মধ্যে ১০০ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক রফতানি অর্জন করতে সক্ষম হবে।২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে টি-শার্ট রফতানিতে শীর্ষে উঠে এসেছে বাংলাদেশ। নিকারাগুয়া, হন্ডুরাস ও চীনের মতো প্রথিতযশা রফতানিকারক দেশগুলোকে পেছনে ফেলে এটি বাংলাদেশের জন্য এক ঐতিহাসিক অর্জন।

যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কমিশনের (ইউএসআইটিসি) তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে যুক্তরাষ্ট্র ১১৭টি দেশ থেকে মোট ৩৫২ কোটি ডলারের টি-শার্ট আমদানি করেছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ থেকে এসেছে ৩৭ কোটি ৩২ লাখ ডলারের সমমূল্যের টি-শার্ট, যা নিকারাগুয়ার ৩৬ কোটি ১২ লাখ ডলারের রফতানি অতিক্রম করেছে। বাংলাদেশ এর আগে কখনও যুক্তরাষ্ট্রের টি-শার্ট বাজারে শীর্ষস্থান অধিকার করতে পারেনি। ১৯৮৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ৩৬ বছর ধরে হন্ডুরাস, নিকারাগুয়া, হংকং, জ্যামাইকা, মেক্সিকো ও চীনের মতো দেশগুলো এই বাজারে আধিপত্য বজায় রেখেছিল। চীন ও হংকং ছাড়া বাকি দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তির কারণে শুল্ক সুবিধা পেয়ে আসছিল। তবে ২০২৫ সালের শুরুতে এই চিত্র বদলে গেছে। এপ্রিল থেকে ট্রাম্প প্রশাসন সব দেশের পণ্য আমদানিতে ন্যূনতম ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করলে-শুল্ক সুবিধা ভোগকারী নিকারাগুয়া ও হন্ডুরাসকেও যুক্তরাষ্ট্রে টি-শার্ট রফতানিতে অতিরিক্ত শুল্ক দিতে হয়। এই নতুন চ্যালেঞ্জের মধ্যেই বাংলাদেশের টি-শার্ট যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শীর্ষে পৌঁছেছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শুল্কের চাপে অন্য দেশগুলোতে রফতানি ব্যাহত হওয়ায় বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের জন্য এটি এক সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে কাজ করেছে।এদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ৩১ জুলাই বাংলাদেশি পণ্যে পাল্টা শুল্ক ২০ শতাংশ নির্ধারণ করেন। অপরদিকে চীনের পণ্যে বাড়তি শুল্ক ৩০ শতাংশ এবং ভারতের পণ্যে ২৫ শতাংশ। তবে রাশিয়া থেকে জ্বালানি তেল আমদানির কারণে ভারতের ওপর অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। মার্কিন বাজারে চীনা পণ্যের ওপর উচ্চ শুল্কের কারণে ক্রেতারা বিকল্প খুঁজতে শুরু করেছেন এবং বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতকে এই বিকল্প বাজার হিসেবে দেখা যাচ্ছে।বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের সবচেয়ে বড় একক বাজার যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন বাজারে শীর্ষ ১০ রফতানিকারক দেশ হলো-ভিয়েতনাম, চীন, বাংলাদেশ, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মেক্সিকো, হন্ডুরাস, কম্বোডিয়া, পাকিস্তান ও কোরিয়া। মার্কিন শুল্ক কাঠামোর পরিবর্তনের কারণে চীনের হারানো বাজার দখলে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন প্রথম ছয় মাসে চীনের পোশাক রফতানি কমেছে ১১০ কোটি ডলার, যা বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামের জন্য একটি বড় সুযোগ তৈরি করেছে। একই সময়ে ভিয়েতনামের রফতানি বেড়েছে ১১৯ কোটি ডলার এবং বাংলাদেশের বেড়েছে ৮৫ কোটি ডলার।
শিল্প বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মার্কিন শুল্কনীতির কারণে বাংলাদেশের পণ্যের প্রতিযোগিতা বেড়েছে। বাংলাদেশের মার্কেট শেয়ার এ বছরের জুনে ১০ শতাংশে পৌঁছেছে, যা গত বছরের ৯.২৬ শতাংশের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। এ ধরনের প্রবৃদ্ধি রফতানিমুখী খাতের জন্য এক নতুন সূচনা এবং দীর্ঘমেয়াদে এটি দেশের রফতানি প্রবৃদ্ধিকে শক্তিশালী করবে। বিগত দুই সপ্তাহে মার্কিন ক্রেতাদের কাছ থেকে বাড়তি ক্রয়াদেশের চাপ লক্ষ্য করা গেছে। আগে স্থগিত হওয়া অর্ডারও ফেরত আসতে শুরু করেছে। মূলত দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন ক্রেতাদের সঙ্গে কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলোই সবচেয়ে বেশি নতুন অর্ডারের প্রস্তাব পাচ্ছে।স্প্যারো গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের এমডি জানান, আগামী বসন্তের জন্য আমাদের কাছে ৫-১০ শতাংশ এবং গ্রীষ্মের জন্য ১০-১৫ শতাংশ বাড়তি ক্রয়াদেশ রয়েছে। ভারত ও চীন থেকে সরে আসা অর্ডার ধরে রাখতে আমরা ইতোমধ্যে অতিরিক্ত ওভারটাইমের অনুমতি নিয়েছি। শীর্ষ রফতানিকারক স্নোটেক্স গ্রুপের এমডি এস এম খালেদ বলেন, এক মার্কিন ক্রেতা গত বছর ৭ লাইনে উৎপাদিত জ্যাকেটের কাজ এ বছর ১৭ লাইনে নিতে চাচ্ছেন। আরেক ক্রেতা ২০ লাইনের উৎপাদন ১০-১৫ লাইন বাড়াতে চাইছেন। বাড়তি অর্ডারের জন্য আমাদের প্রায় আড়াই লাখ ডলার বিনিয়োগ করতে হবে। অনুকূল পরিস্থিতি থাকলে রফতানি ৩৫ কোটি ডলার ছাড়াবে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রফতানি হয়েছে ৮৬৯ কোটি ডলার, যার প্রায় ১৮ শতাংশ আসে মার্কিন বাজার থেকে। এর মধ্যে তৈরি পোশাকের অংশ ৭৫৪ কোটি ডলার। এটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে মার্কিন বাজার বাংলাদেশের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ রফতানি ক্ষেত্র।অন্যদিকে, চীনা বিনিয়োগকারীরাও বাংলাদেশে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। হান্ডা (বাংলাদেশ) গার্মেন্টস কোম্পানি চট্টগ্রামের মিরসরাই বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রায় ৪ কোটি ডলারের বিনিয়োগে পোশাক কারখানা স্থাপন করবে। একই অঞ্চলে খাইশি গ্রুপও ৪ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগে অন্তর্বাসসহ বিভিন্ন পোশাক উৎপাদনের কারখানা নির্মাণ করবে। বেপজা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত ৩৪টি চীনা বিনিয়োগকারী প্রস্তাব দিয়েছেন। এর মধ্যে জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত আটটি চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। মোট প্রস্তাবিত বিনিয়োগ প্রায় ১৫ কোটি ডলার। এসব প্রতিষ্ঠান তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ব্যাগ, হালকা প্রকৌশল পণ্য উৎপাদন করবে। বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, চীনা বিনিয়োগ ইতিবাচক। তারা শুধু বিনিয়োগ করবে না, ক্রেতাও নিয়ে আসবে। তবে অর্ডার বাড়াতে ব্যাংকিং সহায়তা, গ্যাস-বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ এবং কাস্টমস সহযোগিতা প্রয়োজন।বায়াররা জানান, মার্কিন শুল্কের কারণে চীনের রফতানি প্রথমার্ধে ১৬ শতাংশ কমেছে। চীনের মার্কেট শেয়ার কমে এসেছে ১৮.৮৮ শতাংশে। অপরদিকে, ভিয়েতনাম একই সময়ে ৭৭৭ কোটি ডলার রফতানি করে বাজারের শীর্ষে পৌঁছেছে। বাংলাদেশের মার্কেট শেয়ার বেড়ে ১০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মার্কিন শুল্কনীতির কারণে চীনের অর্ডার বাংলাদেশে স্থানান্তরিত হচ্ছে। চীনের রফতানি চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুনে কমেছে ১১০ কোটি ডলার। একই সময়ে ভিয়েতনামের রফতানি বেড়েছে ১১৯ কোটি ডলার এবং বাংলাদেশের বেড়েছে ৮৫ কোটি ডলার। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মার্কিন শুল্কনীতির কারণে চীনের অর্ডার স্থানান্তরিত হয়ে আসছে এবং বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।তুসুকা গ্রুপের চেয়ারম্যান আরশাদ জামাল বলেন, সেপ্টেম্বর থেকে আগামী গ্রীষ্মকালীন মৌসুমের ক্রয়াদেশ আসতে শুরু করবে। তখন বোঝা যাবে বাড়তি কতো অর্ডার এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ব্যবহার করলে শুল্ক কিছুটা কমানো সম্ভব, যা আমাদের প্রতিযোগিতা আরও বাড়াবে।তবে সব চ্যালেঞ্জের মাঝেও শিল্প সংশ্লিষ্টরা আশাবাদী। চীন থেকে সরানো অর্ডার, মার্কিন ক্রেতার বাড়তি চাহিদা, চীনা বিনিয়োগ এবং রফতানি বাড়ানোর জন্য সরকারিনীতি সমন্বয়— এগুলো একসঙ্গে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের জন্য নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলছে। বাজার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মার্কিন শুল্ক কাঠামো অপরিবর্তিত থাকলে, বাংলাদেশের রফতানি প্রবৃদ্ধি আরও গতিশীল হবে এবং দেশে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ধারা তৈরি হবে।

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com