বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন একটা ভয়ংকর রকমের অরাজকতা ও দেউলিয়াত্ব চলছে। বিএনপির অন্যতম শীর্ষনেতা সালাহউদ্দিন আহমদ একটি চমৎকার কথা বলেছেন, ‘চাইলাম ডেমোক্রেসি, পেলাম মবক্রেসি’, যা জুলাই আন্দোলনের শিক্ষার্থীদের কণ্ঠোচ্চারিত ‘চেয়েছিলাম অধিকার, হয়ে গেলাম রাজাকার’ বিখ্যাত স্লোগানের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। শুধু কি মবক্রেসি, অতি সাম্প্রতিক গোপালগঞ্জে এনসিপির দলীয় সভার ওপর ছাত্রলীগের ক্যাডাররা যেরূপ হামলা চলিয়ে মারপিট ও ভাঙচুর করেছে, তাতে মনে হতে পারে, ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা পালিয়েছেন, কিন্তু ফ্যাসিবাদ রেখে গেছেন। খুনখারাবি, চুরিডাকাতি, চাঁদাবাজি, ঘুষ, অবৈধ দখল নারীনির্যাতন, দ্রব্যমূল্যবৃদ্ধি ইত্যাদির বিরুদ্ধে আন্দোলন হলো, তা তো বন্ধ হয়নি, বরং অনেককিছু বেড়েই চলেছে। তবে প্রশ্ন জাগে আন্দোলনে শত শত নিরীহ ছাত্রজনতা প্রাণ দিল কেন? শত সহস্র আহতের আর্তনাদ ও আহাজারি এখনো থামেনি। যে আশা ভরসা স্বপ্ন নিয়ে লোকজন জীবনবাজি রেখে আন্দোলন করলো, তার শত ভাগের এক ভাগও যদি পূরণ না হয়, তবে বলতেই হয়, ‘সকলি গরল ভেল।’
রাজনীতিতে নেমেই বেগম খালেদা জিয়া হুসাইন মুহাম্মদ এরশাদের অবৈধভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল ও অগণতান্ত্রিক রাজনীতির বিপক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেন এবং তাঁর অধীনে সকল প্রকার নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত নেন। নানাবিধ অপশাসন ও অপকর্মের জন্য এরশাদ ‘স্বৈরাচার’ খেতাব পেয়ে যান; ‘বিশ্ববেহায়া’ তাঁর অপর তকমা। স্বৈরশাসকের সঙ্গে কোনো আপোস চলে না। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ অংশগ্রহণ করে। অন্যদিকে বেগম খালেদা জিয়া আন্দোলনের মাধ্যমে এরশাদকে ক্ষমতাচ্যুত করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রবর্তন করতে সক্ষম হন। তিনি ১৯৯১ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন লাভ করে জয়ী হন ও সরকার গঠন করে প্রধানমন্ত্রীর পদ আলংকৃত করেন। বেগম খালেদা জিয়া তাঁর নীতিতে অটল থেকে যেরূপ অনমনীয় মনোবল ও সাহসিকতার পরিচয় দেন, তার ফলে দেশবাসী তাঁকে ‘আপোসহীন দেশনেত্রী’ আখ্যায় ভূষিত করে। আমরা পরবর্তী সময়ে দেখছি খালেদা জিয়াকে আমেরিকার নিউ জার্সি স্টেট সিনেট ‘ফাইটার ফর ডেমোক্রেসি’ (২০১১) এবং কানাডার ‘কানাডিয়ান হিউমঅ্যাান রাইটস ইন্টারনেশানাল অর্গানাইজেশন’ নামের একটি সংগঠন ‘মাদার অব ডেমোক্রেসি’ (২০১৮) পদক দান করে। অর্থাৎ তিনি ছিলেন একাধারে ‘গণতন্ত্রের যোদ্ধা’ ও ‘গণতন্ত্রের জননী’। খালেদা জিয়া বিদেশ থেকে এরূপ সম্মাননা ও স্বীকৃতি পাচ্ছেন এমন এক সময়, যখন গণতন্ত্রের জন্য স্বদেশে হাহাকার চলছে। ফোর্বস সাময়িকীর পরিসংখ্যানে ২০০৪ সালে বিশ্বের ১০০ নারীনেতৃত্বের তালিকায় প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার অবস্থান ছিল ১৪তম। নীতি দক্ষতা ও ব্যক্তিত্বগুণে তিনি এসব অর্জন করেন।বাংলাদেশের রাজনীতিতে খালেদা জিয়ার জনপ্রিয়তা প্রশ্নাতীত। তিনি জাতীয় নির্বাচনে তিনবার পাঁচটি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন এবং জয়ী হয়েছেন। রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁর সাফল্য প্রশংসিত হয়েছে। সম্প্রতি দেশের একজন বিজ্ঞ বুদ্ধিবীবী ও রাজনীতিবিদ অধ্যাপক বদরুদ্দিন উমর এক আলোচনা সভায় একমাত্র বিএনপিকে ‘প্রগতিশীল’ রাজনৈতিক দল বলে উল্লেখ করেছেন। আমি বলবো, বিএনপি একটি ‘মেধাবী’ রাজনৈতক দল। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে দীর্ঘ ৪২ বছর ধরে পরিচালিত বিএনপির এরূপ ভাবমর্র্যাদা গড়ে উঠেছে।
প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হয়ে খালেদা জিয়া রাষ্ট্রপরিচালনায় যে রাজনৈতিক প্রজ্ঞার ও দূরদর্শী চিন্তাভাবনার পরিচয় দেন, তা তাঁর গৃহীত পদক্ষেপগুলি বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়। আমরা কেবল শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁর অবদানের কথা সংক্ষেপে বলবো। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ন্যায় খালেদা জিয়াও বিশ্বাস করতেন, শিক্ষিত ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়া ছাড়া দেশের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। তিনি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় শিক্ষাখাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রথমে প্রাথমিক শিক্ষার ওপর জোর দেন। এ শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করেন (১৯৯৩) এবং এর বাস্তবায়নে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ও শিক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে অবকাঠামো ও জনবল বৃদ্ধির ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী; তাদের শিক্ষার বাইরে রেখে কাক্সিক্ষত ফল পাওয়া যাবে না। এর জন্য রাষ্ট্রীয় খরচে বিনামূল্যে পুস্তক বিতরণের ব্যবস্থা করেন পল্লী অঞ্চলে মেয়েদের জন্য মধ্যমিক শিক্ষা অবৈতনিক করেন এবং উপবৃত্তি প্রদানের ব্যবস্থা করেন। বছরের শুরুতে তিনি নিজ কার্যালয়ে কোমলমতি ছাত্রছাত্রীদের ডেকে তাদের হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে পাঠ্যবই তুলে দিতেন। এ তো গেল একদিক; অন্যদিকে বয়স্কদের স্বাক্ষর জ্ঞানসম্পন্ন করার জন্য গণশিক্ষার আওতায় ‘শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্য’ কর্মসূচি চালু করেন। এসব কার্য পরিচালনা করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে একটি পৃথক প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিভাগ প্রতিষ্ঠা করা হয়। শিক্ষার প্রসঙ্গ এখানে থেমে যায়নি, তাঁর প্রেরণায় ও পরিকল্পনায় সরকারি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৯৩) এবং উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। উচ্চশিক্ষাকে উৎসাহিত করার জন্য প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তিখাতে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার অনুমোদন দেন। এসব ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে সারাদেশে সবার অজান্তে একটি নীরব ‘শিক্ষা বিপ্লব’ ঘটে যায়, যার সম্পূর্ণ কৃতিত্ব বেগম খালেদা জিয়ার প্রাপ্য।সোনার বাংলা’, ‘ডিজিটাল বাংলা’, ‘স্মার্ট বাংলা’ গড়ার চমকপ্রদ স্লোগান দিয়ে লোক নাচানো নয়, খালেদা জিয়া ধীরে সুস্থে ধৈর্যের সাথে নীরবে গঠন ও উন্নয়নমূলক কাজ করেছেন; ফলাও করে প্রচার করেননি। তাঁর আবেদন ছিল মানুষের হৃদয়ে। জনগণও হৃদয়ের আবেগ দিয়ে তাঁকে মূল্যায়ন করে, স্মরণ করে ও শ্রদ্ধা করে। আজ বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো ব্যক্তিত্বের বড়ই অভাব দেখা দিয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস জ্ঞানীগুণী মানুষ, রাজনীতিবিদ নন। বিএনপি ছাড়া আর সব পরিসর ছোট, নেতৃত্বও সীমিত। বেগম খালেদা জিয়া ভগ্নস্বাস্থ্য নিয়ে দেশের মাটিতে আছেন। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বিদেশে রয়েছেন। বিএনপির চেয়ারপারসন হিসাবে বেগম খালেদা জিয়ার উপস্থিতি দলের এবং দেশবাসীর জন্য এক পরম ভরসা। তিনি অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ, তাঁর জনপ্রিয়তা প্রশ্নাতীত, ভাবমর্র্যাদা অবিতর্কিত। তিনি আছেন, যেন মাথার ওপর একজন অভিভাবক আছেন। আজ জনগণের কাছে একমাত্র তিনিই ‘আস্থার প্রতীক’।