জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য ও সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, বর্তমান সরকারকে সংবিধানের বাহিরে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ যে সংবিধানে মধ্যে দিয়ে শপথ নিয়েছে। সেই সংবিধানোর আলোকে বর্তমান নির্বাচন করতে হবে। গত ২০২৪ সালে দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনের আগে সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচনের আকাক্সক্ষায় জাতীয় সনদের একটি খসড়া আমরা রাজনৈতিক দলকে দিয়েছি। আগামীতে যারাই ক্ষমতায় আসবেন তাঁরা যেন এই সনদ বাস্তবায়ন করেন। তিনি বলেন, সুজনের রহস্যজনক জরিপ করা হয়নি। এটা কথা ঠিক নয়।সুজনের জরিপ করেছে সারা দেশের এক হাজার ৩৭৩ জন। যার মধ্যে পুরুষ এক হাজার ৩৩ জন, নারী ৩৩৫ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের পাঁচজন। জরিপটি মে থেকে জুলাই মাসের মধ্যে সম্পন্ন হয়। এতে মোট ৪০টি প্রশ্ন রাখা হয়, যার উত্তর দেন অংশগ্রহণকারীরা। জরিপ চলাকালে ১৫টি নাগরিক সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ তাদের মতামত জানান। জাতীয় সংসদ (নি¤œকক্ষ) ও সিনেট (উচ্চকক্ষ) নিয়ে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভার পক্ষে মত দিয়েছেন জরিপে অংশ নেয়া ৬৯ শতাংশ মানুষ। আনুপাতিক পদ্ধতিতে (পিআর) উচ্চকক্ষের আসন বণ্টনের পক্ষে ৭১ শতাংশ মানুষ।
ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, বিগত সরকারের আমলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয়করণ করা হয়েছে, সংবিধানের সংশোধনী ও বিভিন্ন নির্বতনমূলক আইন প্রণয়নের মাধ্যমে এককেন্দ্রিক স্বৈরাচারী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। সুজন পরিচালিত জনমত যাচাইয়ের মাধ্যমে প্রমাণিত হয় মানুষ সংস্কার চায়, যাতে ভবিষ্যতে তাদের অধিকার ভূলণ্ঠিত না হয় এবং স্বৈরাচারী ব্যবস্থা আর ফিরে না আসে। গত সোমবার নাগরিক সংগঠন সুজনÑসুশাসনের জন্য নাগরিক-এর উদ্যোগে ‘প্রস্তাবিত জাতীয় সনদ চূড়ান্তকরণে জনমত যাচাইয়ের তথ্য উপস্থাপন’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে উক্ত মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, সুজন বহুদিন থেকেই রাষ্ট্রকে মেরামত করা ও রাষ্ট্রকে জনগণের কাছে দায়বদ্ধ করার দাবি জানিয়ে এসেছে। এ লক্ষ্যে ২০১৩ সালে আমরা প্রথম জাতীয় সনদের একটি খসড়া তৈরি করি। পরবর্তীতে জাতীয় সনদে বিভিন্ন পরিবর্তন এসেছে। তিনি বলেন, বিগত কয়েক মাসে সারাদেশে ১৫টি সংলাপ আয়োজন এবং জনমত যাচাইয়ের মাধ্যমে আমরা সুজন-এর পক্ষ থেকে একটি ‘জাতীয় সনদ’ প্রণয়ন করেছি। ইতোমধ্যে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনকে জাতীয় সনদের কপি দেওয়া হয়েছে, যাতে ‘জুুলাই জাতীয় সনদ’ প্রণয়নে এটি কমিশনকে সহায়তা করতে পারে।জনমত যাচাইয়ের তথ্য উপস্থাপনকালে একরাম হোসেন বলেন, ‘সুজন কর্তৃক প্রস্তাবিত জাতীয় সনদ চূড়ান্তকরণে ৪০টি প্রশ্ন নিয়ে বিগত মে-জুলাই মাসে সারাদেশের ৬৪টি জেলায় একটি জনমত জরিপ পরিচালনা করা হয়। জরিপে ১ হাজার ৩৭৩ জন নারী-পুরুষ (নারী: ৩৩৫; পুরুষ: ১,০৩৩; তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ: ০৫) অংশগ্রহণ করেন।’ জরিপের ফলাফল তুলে ধরেন তিনি বলেন, ‘৬৯ শতাংশ মানুষ দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা গঠন করা; ৬৩ শতাংশ মানুষ ৪০০ আসন নিয়ে জাতীয় সংসদ গঠন এবং ঘূর্ণায়মান পদ্ধতিতে ১০০ আসন নারীদের জন্য সংরক্ষণ করা; ৮৬ শতাংশ মানুষ জাতীয় সংসদের একজন ডেপুটি ¯িপকার থাকা এবং তাঁকে বিরোধী দল থেকে নির্বাচিত করা; ৭১ শতাংশ মানুষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০টি আসন নিয়ে উচ্চকক্ষ গঠন করা; ৮৭ শতাংশ মানুষ একজন ব্যক্তির একইসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী, সংসদ নেতা এবং দলীয় প্রধান না হওয়ার বিধান করা; ৮৯ শতাংশ মানুষ জাতীয় সংসদের একজন সদস্যের সর্বোচ্চ দুইবারের বেশি প্রধানমন্ত্রী হতে না পারার বিধান করার পক্ষে মত দিয়েছেন। একরাম হোসেন বলেন, ‘উচ্চকক্ষে বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার চান ৮২ শতাংশ মানুষ। নির্বাচনকালে নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে পারেÑ নির্বাহী বিভাগের এমন কার্যক্রম গ্রহণে নির্বাচন কমিশনের অনুমতি নেওয়ার বিধান করার পক্ষে মত দিয়েছেন ৮৭ শতাংশ মানুষ। ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে নির্বাচনের সুষ্ঠুতা, বিশ্বাসযোগ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে নির্বাচন কমিশন কর্তৃক প্রত্যয়ন (সার্টিফাই) করে তা গণবিজ্ঞপ্তি হিসেবে প্রকাশ করার পক্ষে ৮৬ শতাংশ মানুষ মত দিয়েছেন। নির্বাচনী ব্যয় নিরীক্ষণ ও অসত্য তথ্য প্রদানকারীদের প্রার্থিতা বা নির্বাচনী ফলাফল বাতিল করার পক্ষে মত দিয়েছেন ৮৮ শতাংশ মানুষ। ৯২ শতাংশ মানুষ মনে করেন, চিহ্নিত সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, দুর্নীতিগ্রস্ত ও সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের দলের সদস্য হওয়ার অযোগ্য ঘোষণা করা উচিত ।
প্রকাশিত সংবাদের প্রতিবাদ
এদিকে জরিপটি প্রকাশিত হওয়ার ‘ব্র্যাক-সুজনের রহস্যজনক জরিপ’ শিরোনামে দৈনিক ইনকিলাবে গতকাল প্রকাশিত প্রতিবেদনের প্রতিবাদ জানিয়েছে সুজন। গতকাল সুজন-এর পক্ষ থেকে মর্জিনা বিশ্বাস স্বাক্ষরিত প্রতিবাদ লিপিতে বলা হয়, ‘সুজন কোনো রহস্যজনক কারণে উক্ত জরিপটি পরিচালনা করেনি। বরং রাষ্ট্রের মৌলিক সংস্কারে জনগণের মতামত নেওয়ার জন্যই উক্ত জরিপ পরিচালনা করা হয়েছে’।এতে আরো বলা হয়, ‘সুজন সম্পদক ড. বদিউল আলম মজুমদারের নেতৃত্বে গঠিত ‘নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন’ তাদের রিপোর্টে সুস্পষ্টভাবে প্রদর্শন করেছেন যে, আনুপাতিক হারে নিম্নকক্ষের নির্বাচন হলে একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে এবং কোনো দলের পক্ষে এককভাবে সরকার গঠন করা সম্ভব হবে না। ফলে বড় দলগুলো ছোট ছোট দলের কাছে জিম্মি হয়ে যেতে পারে, যা সরকারের স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ঠেলে দেবে। তাই তারা নিম্নকক্ষে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব প্রবর্তনের বিপক্ষে সুপারিশ করেছেন।পক্ষান্তরে সংবিধান সংস্কার কমিশন ও নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন উচ্চকক্ষ গঠন করে পিআর পদ্ধতিতে এর আসন বণ্টনের সুপারিশ করেছে, যা কথায় কথায় সংবিধান সংশোধনের পথে অন্তরায় সৃষ্টি করবে। সুজন জনমত জরিপের মাধ্যমে এ ব্যাপারে মানুষের মতামত জানতে চেয়েছে শুধু। অন্য কোনো সংস্থা কর্তৃক পরিচালিত জরিপের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই।
সুজন দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার চেষ্টা করে আসছে। একইসঙ্গে কতগুলো মৌলিক বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য সৃষ্টি করে একটি ‘জাতীয় সনদ’ তৈরি এবং গণমাধ্যমের সহায়তায় বাংলাদেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে পরিচ্ছন্ন করার লক্ষ্যে অ্যাডভোকেসিসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। সুজন-এর নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ হিসেবেই জাতীয় সনদ চূড়ান্তকরণের লক্ষ্যেই উপরোপক্ত জনমত জরিপটি পরিচালনা করা হয়েছে’।