দ্বিতীয়ত, শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা : প্রধান উপদেষ্টার নির্বাচনের ঘোষণার পরপরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। হলে ছাত্ররাজনীতি করা যাবে না, এই দাবিতে শিক্ষার্থীরা গত শুক্রবার মধ্যরাতে উপাচার্যের বাসভবন ঘেরাও করে। শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে উপাচার্য দাবি মেনে নেন। সামনে ডাকসু নির্বাচন। ডাকসু নির্বাচনের আগে ঢাবি ক্যাম্পাসে এ ধরনের পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। আমরা জানি যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হলো আন্দোলনের সূতিকাগার। যেকোনো ঘটনা বা দুর্ঘটনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটলে সেটি সারা দেশে পল্লবিত হতে বেশি সময় লাগে না। কাজেই অন্তর্বর্তী সরকারকে ঢাকা বিদ্যালয়ের পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ডাকসু নির্বাচন করাটা কতটা যৌক্তিক এবং সে ধরনের প্রস্তুতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের আছে কি না? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখনো একটি নাজুক পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে নানা দল, নানা মত ক্যাম্পাসে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য চেষ্টা করছে। ফলে প্রতিনিয়তই ক্যাম্পাসে নানা রকম উত্তেজনা তৈরি হচ্ছে। গত ৫ আগস্ট ছাত্রশিবিরের সঙ্গে বাম ছাত্রসংগঠনগুলোর বিরোধ আমরা দেখেছি। আবার ছাত্রদলের হল কমিটি ঘোষণা নিয়ে যেভাবে উপাচার্যের বাসভবন ঘেরাও করা হয়েছে, তাতে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস এখনো উত্তপ্ত। ডাকসু নির্বাচনকে ঘিরে সামনে এই উত্তাপ আরো বাড়বে। এখানে একটি গোষ্ঠী নির্বাচন বানচালের জন্য যদি সক্রিয় চেষ্টা করে, তাহলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোর পরিস্থিতিও স্বাভাবিক নয়। ক্যাম্পাসগুলো বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে নেই। বিশ্ববিদ্যালয় কখনো পুলিশ বা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না, যাবেও না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে দরকার বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নিবিড় পরিচর্যা, তৎপরতা। ডাকসুর নির্বাচনকে ঘিরে যেন কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয়, সে ব্যাপারে কঠোরভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। শুধু নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যদি তামাশা দেখতে চায়, তাহলে সেটি হবে বড় ভুল। ডাকসু নির্বাচনে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে তার মাসুল দিতে হবে গোটা দেশকে। তার প্রভাব অনিবার্যভাবে জাতীয় নির্বাচনের ওপর পড়বে। কাজেই ডাকসু নির্বাচন এবং অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচনগুলো অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে করতে হবে। এখানে জয়-পরাজয়ের চেয়ে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান সবচেয়ে বড় বিষয় বলে মনে করেন অনেকে।
তৃতীয়ত, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার : প্রধান উপদেষ্টার নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণার পর আমরা দেখছি যে, ঢাকার বিভিন্ন স্থান থেকে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা হচ্ছে। এই অস্ত্রগুলো যে গত বছর ৫ আগস্টের পরে বিভিন্ন থানা থেকে লুণ্ঠিত সেটা বুঝতে কারো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। আর এসব অবৈধ অস্ত্র এখনো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন স্থানে। অনেকের ধারণা, এই অবৈধ অস্ত্রগুলো আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির একটি বড় কারণ। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও এই অবৈধ অস্ত্রগুলো ব্যবহার হতে পারে। আর এ কারণেই সরকারের অনতিবিলম্বে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের জন্য অভিযান পরিচালনা করা উচিত। এসব অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা না হলে আগামী নির্বাচনের শঙ্কা-উৎকণ্ঠা কাটবে না। আমাদের মনে রাখতে হবে, কেবল একটা নির্বাচন অনুষ্ঠানই একমাত্র কথা নয়। নির্বাচন যেন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়, সেটি নিশ্চিত করাটাই হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সেটি করার জন্য অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের কোনো বিকল্প নেই। দেশে নতুন করে সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজির দৌরাত্ম্য বেড়েছে। তারা তাদের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে নতুন করে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করছে। সঙ্গে কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত সীমাহীন পর্যায়ে পৌঁছেছে। এই কিশোর গ্যাং এবং শীর্ষ সন্ত্রাসীদের কঠোর নজরদারির মধ্যে আনতে হবে। তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। কোন বিবেচনায় কিভাবে তারা জেল থেকে ছাড়া পেল, সেটি অবশ্যই দেখতে হবে। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, শীর্ষ সন্ত্রাসী এবং কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে যদি দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা না যায়, তাহলে আগামী নির্বাচনে বড় ধরনের সহিংসতার আশঙ্কা কেউ উড়িয়ে দিতে পারে না।
চতুর্থত, স্বাভাবিক পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে : নির্বাচনের আর মাত্র ছয় মাস বাকি আছে। এই সময় দেশকে একটি স্বস্তিদায়ক পরিস্থিতির মধ্যে আনতে হবে। সরকারকে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হবে। কারণ ভোটের উৎসব তখনই সফল হবে, যখন দেশের মানুষ শঙ্কাহীন স্বস্তিতে থাকবে, বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষ নির্ভয়ে তাদের মতামত প্রকাশ করতে পারবে, তাদের চিন্তা-ভাবনাগুলোকে রাজনৈতিক দলের কাছে বলতে পারবে। সারা দেশে যে ব্যবসায়ীদের হয়রানি করা হচ্ছে, বিভিন্ন ব্যবসায়ীর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করা হচ্ছে, ভুয়া হত্যা মামলাসহ নানা ধরনের নিপীড়নমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে, তা অনতিবিলম্বে বন্ধ করে ব্যবসাবান্ধব বা অর্থনীতিবান্ধব একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে হবে। অন্য পেশাজীবীদের কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। চাঁদাবাজদের হাত থেকে ব্যবসায়ীদের মুক্ত করতে হবে। এই ছয় মাসে ব্যবসায়ীদের নির্ভয়ে বিনিয়োগ এবং ব্যবসা করার সুযোগ তৈরি করতে হবে। একটি স্থিতিশীল আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি ছাড়া অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হয় না—এটিই বাস্তবতা। সরকার যত তাড়াতাড়ি এই বাস্তবতা উপলব্ধি করবে, তত ভালো হবে।
পঞ্চমত, উপদেষ্টামণ্ডলীর মধ্যে অনেকের বিরুদ্ধে নানা রকম অভিযোগ উঠছে। সম্প্রতি একজন সাবেক সচিব প্রকাশ্যে আটজন উপদেষ্টার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ করেছেন। আটজন উপদেষ্টা দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত কি না, সে বিতর্কে আমি যেতে চাই না। তবে কয়েকজন উপদেষ্টার বিরুদ্ধে যে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। বিশেষ করে ছাত্রদের প্রতিনিধি হিসেবে যে দুজন উপদেষ্টা রয়েছেন, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর ওই দুজন উপদেষ্টার অনতিবিলম্বে পদত্যাগ করা উচিত। কারণ তাঁদের সঙ্গে এনসিপির সম্পর্ক এখন প্রকাশ্য হয়েছে। এ অবস্থায় নৈতিকতার স্বার্থে তাঁদের পদত্যাগ করা উচিত। তাঁরা নির্বাচন করবেন কী করবেন না, সেটি পরের বিষয়। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারকে এখন অবশ্যই একটি নিরপেক্ষ চরিত্র গ্রহণ করতে হবে, যেন ভবিষ্যতে কেউ এ নিয়ে প্রশ্ন না তোলেন। দু-একজন উপদেষ্টাকে নিয়ে তাঁদের এলাকায় এবং ঢাকায় নানা রকম প্রশ্ন উঠেছে। যেখানে তিনি যাচ্ছেন, সেখানেই বিতর্ক সৃষ্টি করছেন। এ রকম পরিস্থিতিতে নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণার পর তাঁদের উপদেষ্টামণ্ডলীতে থাকা যৌক্তিক কি না সেই প্রশ্ন উঠেছে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, এখন সরকারের একমাত্র লক্ষ্য হলো অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য একটি সহায়ক পরিস্থিতি তৈরি করা। সেই সহায়ক পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য একযোগে সবাইকে কাজ করতে হবে। সুষ্ঠু নির্বাচন করার জন্য যা যা করা দরকার, সেটাই সরকারকে করতে হবে। কারণ সময় ফুরিয়ে আসছে, হাতে মাত্র ছয় মাস আছে। এ সময়ের মধ্যে দেশে একটি স্বাভাবিক নির্বাচনী পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে হবে।