ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও গত কয়েক দিনের ভারি বর্ষণে তিস্তা নদীর পানি ডালিয়া পয়েন্টে বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজে বিপদসীমা ধরা হয় ৫২ দশমিক ১৫ সেন্টিমিটার। এতে করে লালমনিরহাটসহ চার জেলার নদী তীরবর্তী এলাকায় নতুন করে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।গতকাল ডালিয়া পয়েন্টে পানির সমতল রেকর্ড করা হয়েছে ৫২ দশমিক ১৫ মিটার, যা বিপৎসীমার ওপরে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত ডালিয়ায় পানি ২৯ সেন্টিমিটার বেড়েছে। বর্তমানে পানি ধীর গতিতে বাড়ছে। তবে ভারতের উজানে পশ্চিমবঙ্গের দোমোহনী ও গজলডোবা এলাকায় পানির স্তর কিছুটা কমেছে। দোমোহনীতে ১১ ঘণ্টায় পানি কমেছে ৭ সেন্টিমিটার। একই সময়ে গজলডোবা ব্যারাজে পানি ৫ সেন্টিমিটার কমেছে। উজানে পানির এমন প্রবণতা থাকলেও ভাটিতে তিস্তায় পানি কিছুটা বাড়তে পারে। এরপর তা স্থিতিশীল থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে আবহাওয়ার পূর্বাভাস বলছে, তিস্তা অববাহিকায় আগামী ৭২ ঘণ্টায় ভারি বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। এর ফলে তিস্তার পানি আবার বাড়তে পারে এবং নতুন করে বন্যার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর ও কুড়িগ্রাম জেলার তিস্তা নদীসংলগ্ন নি¤œাঞ্চলগুলোতে এই ঝুঁকি বেশি বলে জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। তবে আবহাওয়া অফিস অবশ্য কিছুটা সুখবর দিয়েছে। তারা বলছে মৌসুমি বায়ুর সক্রিয়তা কমে গেছে। এতে করে সারাদেশে বৃষ্টি কমছে এবং আগামী চারদিন সারাদেশে বৃষ্টি কম হতে পারে। ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী বলেন, পানি কিছুটা বেড়েছে ঠিকই, তবে এখনো বড় ধরনের বন্যার আশঙ্কা নেই। আমরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছি।নীলফামারী জেলা সংবাদদাতা মোশফিকুর রহমান সৈকত জানান, বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়া তিস্তার পানি গতকাল থেকে কমতে শুরু করেছে। ভারত থেকে নেমে আসা ঢলে তিস্তার পানি কমে বিপদসীমার ৮ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে ফের বন্যার শঙ্কায় রয়েছেন তিস্তা তীরবর্তী নি¤œাঞ্চলের হাজারো মানুষ। গতকাল তিস্তার ডালিয়া পয়েন্টে পানি বিপদসীমার ৮ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তিস্তা ব্যারাজ কন্ট্রোল রুমের ইনচার্জ নুরুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, শুক্রবার রাত ৯টায় ডালিয়া ব্যারাজ পয়েন্টে পানিপ্রবাহ রেকর্ড করা হয় ৫২ দশমিক ১৫ মিটার। শনিবার সকাল ৬টায় ডালিয়া পয়েন্টে পানিপ্রবাহ ছিল বিপদসীমার ২ সেন্টিমিটার নিচে, দুপুর ১২টার দিকে আরও কমে ৮ সেন্টিমিটার নিচে নামে। তবে পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে ব্যারাজের সব জলকপাট খোলা রয়েছে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। আবহাওয়া অফিস জানায়, উজানে পানির সমতল হ্রাস পাওয়ায় শুক্রবার রাত ১২টা পর্যন্ত তিস্তা নদীর পানি ধীর গতিতে বৃদ্ধি পায় এবং পরে স্থিতিশীল থেকে হ্রাস পেতে শুরু করে। তবে আগামী ৭২ ঘণ্টায় ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস থাকায় পুনরায় পানির স্তর বৃদ্ধি পেতে পারে। এর ফলে নীলফামারী জেলার তিস্তা নদীসংলগ্ন নি¤œাঞ্চলে বন্যার ঝুঁকি রয়েছে।পাউবো সূত্র জানায়, ভারতের উজানে ভারী বর্ষণের ফলে নদীতে হঠাৎ করে পানির প্রবাহ বেড়ে যায়। শুক্রবার রাতে পানি বাড়ায় নীলফামারীর তীরবর্তী চরাঞ্চল ও নি¤œাঞ্চল প্লাবিত হয়। এতে হাজারো পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। ডুবে গেছে আমন ধান, সবজির ক্ষেত ও পুকুর। সড়কপথ যোগাযোগ বন্ধ থাকায় নৌকা ও ভেলা এখন চলাচলের একমাত্র মাধ্যম হয়ে উঠেছে।এদিকে, তিস্তার বন্যায় জেলার ডিমলা উপজেলার পূর্ব ছাতনাই, খগাখাড়বাড়ী, টেপাখড়িবাড়ী, খালিশা চাপানী, ঝুনাগাছ চাঁপানী, গয়াবাড়ী ও জলঢাকার গোলমুন্ডা, ডাউয়াবাড়ী, শৌলমারী ও কৈমারী ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকায় চরগ্রামের ৮-১০ হাজার পরিবারের বাড়িঘরে পানি প্রবেশের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে বলে জানান স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। এ ছাড়াও ব্যারাজের পূর্ব দিকে (ভাটি অঞ্চল) লালমনিরহাট জেলার হাতিবান্ধা, কালিগঞ্জ উপজেলার নদীবেষ্টিত চর ও চরের গ্রামগুলো প্লাবিত হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন বাসিন্দারা। এলাকার বানভাসি লোকজন বন্যা আতঙ্কে রয়েছেন। বাড়িঘরে হাঁটুসমান পানি প্রবেশ করেছে। পরিবার-পরিজন নিয়ে উঁচু এলাকায় সরে যাচ্ছেন তারা। উপজেলার টেপাখড়িবাড়ী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম শাহিন জানান, ১০টি চরগ্রামের লোকজন আতঙ্কে রয়েছেন। নি¤œাঞ্চল ও বিস্তীর্ণ এলাকাগুলো প্লাবিত হয়ে ধীরে ধীরে বাড়িঘরে পানি প্রবেশ করছে। আজ সন্ধ্যা নাগাদ ব্যারাজ পয়েন্টে পানি আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। ইতোমধ্যে উপজেলার খগাখড়িবাড়ির বাইশপুকুর গ্রামটি প্লাবিত হয়ে বাড়িঘরে পানি প্রবেশ করছে। এদিকে, জেলার জলঢাকা উপজেলার ডাউয়াবাড়ী, গোপালঝাড় ও আলসিয়াপাড়ার প্রায় শতাধিক পরিবারের বাড়িঘর বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। এ ছাড়াও পার্শ্ববর্তী লালমনিরহাট জেলার হাতিবান্ধা, কালিগঞ্জ উপজেলার নদ-নদী বন্যার পানিতে থইথই করছে।
গাইবান্ধা থেকে আবেদুর রহমান স্বপন, জেলার তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র নদ ,যমুনা , ঘাঘট ও করতোয়ার বিভিন্ন নদীর গুরুত্বপূর্ন পয়েন্টে পানি বৃদ্ধি পেলেও বিপদসীমার অনেক নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। শনিবার বিকাল ৩ টায় গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ বিভাগীয় প্রকৌশলী জানান, সুন্দরগঞ্জ পয়েন্টে তিস্তা নদীর পানি বিপদসীমার ১৭০ সে.মি নিচ দিয়ে, ফুলছড়ি পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বিপদসীমার ১৫১ সে.মি নিচ দিয়ে , ঘাঘাট নদীর পানি নিউ ব্রীজ স্টেশন পয়েন্টে ১১০ সে.মি নিচ দিয়ে এবং করতোয়া নদীর পানি চক রহিমাপুর স্টেশন পয়েন্টে ২০১ সে.মি নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে- জেলার ৭৮ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ৫টি ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁধের মেরামতের কাজ চলামান রয়েছে।