ট্রাম্পের পেছন পেছন হাঁটছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্টারমার, যিনি নরম ভেটোর মেজোকর্তা। যেখানে ট্রাম্প চিৎকার করেন, স্টারমার সেখানে ইশারা করেন। হাজার হাজার ব্রিটিশ যখন গাজায় যুদ্ধবিরতির জন্য স্লোগান দিচ্ছিল, তখন তিনি ব্রিটেনে আহত কয়েকজন ফিলিস্তিনি শিশুর চিকিৎসার জন্য একটি পালিশ করা ভিডিও প্রকাশ করেছিলেন। অসাধারণ মানবিক তিনি! স্টারমারের এই সংযত সুরের পেছনে রয়েছে ইসরায়েলের প্রতি বিস্ময়কর সহযোগিতা। স্টারমার ইসরায়েলে অস্ত্র রপ্তানি বন্ধ করার জন্য কিছুই করেননি, যার মধ্যে এফ-৩৫ জেটের যন্ত্রাংশও রয়েছে। তিনি বিমান থেকে খাবার ফেলে দেওয়ার কথা এমনভাবে বলেন, যেন তিন হাজার মিটার দূর থেকে খাবার ছুড়ে ফেলা কেবল একটি ছবির অপশনের চেয়েও বেশি কিছু। এই খাবার যতবারই খাওয়ানো হোক না কেন, গাজার ক্ষুধার্ত শিশুটি যেন মারা যায়।
স্টারমার যুক্তিসংগত ব্যক্তির ভূমিকায় চমৎকার অভিনয় করেন—নিরেট ভারসাম্যময়, কোনো চাপ নেই, যেন একটি সুশৃঙ্খল বিবৃতি রাফাহর চিৎকারকে এখনই থামিয়ে দেবে। ব্রিটেন কেন পদক্ষেপ নেবে না জানতে চাইলে ব্রিটিশ কর্মকর্তারা কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলেন, আমাদের অবশ্যই আমেরিকাকে অনুসরণ করতে হবে। তাঁরা সম্ভবত ভুলেই গেছেন, যখন ট্রাম্প ইউক্রেন ত্যাগ করেছিলেন, তখন ব্রিটেন একাই নেতৃত্ব দিয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে ট্রাম্প ও স্টারমারের পার্থক্য সামর্থ্যের মধ্যে নয়, ইচ্ছাশক্তির মধ্যে অথবা বরং সামর্থ্যের অনুপস্থিতিতে। স্টারমার কী করতে পারতেন? করার তো অনেক কিছুই ছিল। ইসরায়েলে অস্ত্র রপ্তানি স্থগিত করা, ইসরায়েলি সম্পদ জব্দ করা, জিএইচএফ-সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া, আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) দক্ষিণ আফ্রিকার গণহত্যা মামলায় যোগ দেওয়া এবং এমনকি রাষ্ট্রদূতকে প্রত্যাহার করা। অন্তত তিনি শব্দটি বলতে পারতেন : ‘গণহত্যা’।
তারপর দৃশ্যপটে আসেন ফরাসি রাষ্ট্রপতি ইমানুয়েল ম্যাখোঁ, রেশমি পোশাক পরে এবং শান্তির ভাষা ব্যবহার করে তাঁর মায়া বেচেন। তিনি ঘোষণা করেন, ফ্রান্স ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেবে। ঘোষণাটি নাটকীয়। যে দেশটির কোনো সীমানা নেই, কোনো রাজধানী নেই, দখলদারির অবসান নেই, কোনো দাঁত নেই; তিনি সেই দেশটির স্বীকৃতি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেন। ঘোষণাটি কানাডার প্রধানমন্ত্রী প্রবর্তিত একই দৃষ্টিভঙ্গিতে রচিত : একটি ‘ইহুদিবাদী ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র’, যা বিকৃত, নিরস্ত্রীকরণ এবং আরব রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে স্বাভাবিকীকরণের জন্য ডিজাইন করা হয়েছে। এটি তো একটি রাষ্ট্র নয়, বরং একটি হলোগ্রাম, একটি শব্দের কামড়, একটি মরীচিকা।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী যখন দখলকৃত পশ্চিম তীরে আক্রমণ চালাচ্ছে, যখন ইসরায়েলি পার্লামেন্ট অধিগ্রহণের জন্য চাপ দিচ্ছে, তখন ম্যাখোঁ কাগজে-কলমে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিচ্ছেন। তাঁর ‘সমর্থন’ হলো হাতের চালাকি, জাতিগত নির্মূলের আসল কাজ যখন বাধাহীনভাবে এগিয়ে চলেছে, তখন বিভ্রান্ত করার জন্য একজন জাদুকরের প্রচেষ্টা।
যদি ম্যাখোঁ ফিলিস্তিনের স্বীকৃতি নিয়ে সিরিয়াস হতেন, তাহলে তিনি ইসরায়েলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতেন, ফরাসি ব্যাংকগুলোতে রিজার্ভ জমা রাখতেন, আইসিজে মামলা সমর্থন করতেন এবং গণহত্যার প্রতিবাদকারী ফরাসি নাগরিকদের গ্রেপ্তার বন্ধ করতেন। কিন্তু গুরুত্ব কখনোই তাঁর মূল বিষয় ছিল না; বাগ্মিতার পারফরম্যান্সই ছিল মুখ্য। যেখানে ম্যাখোঁ মরীচিকা উপস্থাপন করেছিলেন, সেখানে স্টারমার একটি ছায়া উপস্থাপন করেছেন—সংহতি নয়, কৌশল নয়, কেবল ধীরগতিতে জনসংযোগ। ট্রাম্প উপহাস করেন, স্টারমার মঞ্চ পরিচালনা করেন আর ম্যাখোঁ নম্রভাবে প্রতারণা করেন।
গাজা যখন ক্ষুধার্ত এবং সাহায্যকর্মীরা যুদ্ধবিরতির জন্য আবেদন করেন, তখন এই তিন বিশ্বনেতা উদ্ধার নয়, অনুশীলনমূলক লাইনগুলো উপস্থাপন করেন। তাঁরা নেতৃত্বের পরিবর্তে থিয়েটার, ন্যায়বিচারের পরিবর্তে অঙ্গভঙ্গি এবং সাহসের পরিবর্তে শ্রুতিমধুরতা প্রদান করেন।
যখন ইসরায়েলি মন্ত্রীরা গাজা নির্মূলের জন্য প্রকাশ্যে আহ্বান জানান, এই তিন রত্ন মখমলের পর্দার আড়ালে পিছু হটেন, ক্যামেরার সামনে পোজ দেন এবং গম্ভীরভাবে মাথা নাড়ান। তাঁরা রাষ্ট্রনায়ক নন। তাঁরা অভিনয়শিল্পী। তাঁদের স্যুট সেলাই করা। তাদের কাপুরুষতাও প্রশ্নাতীত। ট্রাম্প কেবল স্টাইলে ভিন্ন, সারবস্তুতে নয়। যেখানে ম্যাখোঁ ও স্টারমার কূটনীতি এবং শ্রুতিমধুরতায় তাঁদের সহযোগিতাকে আঁকড়ে ধরেন, সেখানে ট্রাম্প ধ্বংসাত্মক বলের মতো আওয়াজ দেন, কোনো ছদ্মবেশ নেই। কিন্তু মূলকথাটি একই : ফিলিস্তিন সফল হতে দেওয়া যায় না।