সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০৬:৪৪ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

কবিতা

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: শুক্রবার, ৮ আগস্ট, ২০২৫
  • ৬ বার পড়া হয়েছে
আজ পঁয়ত্রিশ বছরের দাম্পত্য জীবনের অবসান হলো লাবনীর! পঁয়ত্রিশ বছর অনেক সময়। পুরো একটা জীবনই তো! লাবনীর দাম্পত্য জীবন কি সুখের ছিল? এই প্রশ্ন করার সময় এখন নয়। সে এখন কবরস্থানে যাচ্ছে স্বামীকে কবরে শায়িত করতে। কবরস্থানের সব নিয়ম পালন শেষে শফিক মানে লাবনীর স্বামীকে কবরে শায়িত করা হলো।

শফিকের কবর থেকে কয়েক হাত দূরে একটি বড় গাছের নিচে একটি বেঞ্চে লাবনী বসল। সন্ধ্যার পরও বেশ খানিকক্ষণ থেকে সে হেঁটে হেঁটে বাসায় ফিরল।লাবনী এখনো বেশ শক্ত সমর্থ। হবেই বা না কেন। বয়স খুব বেশি বলা যাবে না। ষাট বছর কী এমন বয়স? শফিক সাতষট্টি পার করেছিল মাসখানেক আগে। অবশ্য বাসা থেকে কবরস্থান খুব বেশি দূরে নয়।পরদিন অফিস থেকে বের হতে দেরি হলো। সন্ধ্যার একটু পর ফুলের তোড়া নিয়ে কবরস্থানে পৌঁছল লাবনী। শফিকের কবরের কাছে গিয়ে লাবনী দেখল, আজও একদম তাজা একগুচ্ছ রজনীগন্ধা আর গোলাপের তোড়া শফিকের মাথার কাছে সুবাস ছড়াচ্ছে। লাবনী হাতের তোড়াটি শফিকের মাথার কাছে রেখে কবরের সামনে দাঁড়িয়ে জিয়ারত শেষে সেই বড় গাছটার নিচে বেঞ্চে বসল। রাত যত বাড়ছে, রজনীগন্ধার পাপড়িগুলো একটু একটু করে মেলছে আর চারপাশটা মন-মাতানো সুবাসে ভরে উঠছে। পঁয়ত্রিশ বছর! পুরো একটা জীবন কিভাবে যেন চোখের পলকে কেটে গেল! এইতো সেদিন বিয়ে হলো ওদের। কেমন কাটল ওদের দাম্পত্য জীবন?

জীবন আসলে বহতা নদীর মতো। বাধা পেলে নদী যেমন কখনো থমকে না দাঁড়িয়ে বাঁক বদল করে অবিরাম বয়ে চলে, জীবনও ঠিক তা-ই। লাবনীর জীবনেও বাধা এসেছিল, ও ভেবেছিল, হয়তো জীবন থমকে দাঁড়াবে। কিন্তু না, তা হয়নি। ওর জীবন ঠিকই বাঁক বদল করে বয়ে চলছে।

রাশেদ ছাড়া অন্য কাউকে বিয়ে করে লাবনী কখনো সুখী হতে পারবে ভাবেনি। কিন্তু মা-বাবা যখন শফিকের সঙ্গে বিয়েতে ওকে বাধ্য করে, তখন বিয়ের রাতেই শফিককে সব খুলে বলে লাবনী। লাবনীর বলা কথাগুলো শফিককে কষ্ট দিয়েছে কি না তা লাবনী কখনো বুঝতে পারেনি। শফিকের অভিব্যক্তিতে লাবনী কিছু বুঝতে পারেনি কখনো। এক আশ্চর্য মানুষ শফিক! ধীরে ধীরে সময় গড়াতে থাকে, সেই সঙ্গে ওর মনের মধ্যে বাস করা রাশেদও যেন গড়িয়ে গড়িয়ে দূরে, বহুদূরে চলে যায়। ভালোবাসা, মায়া-মমতা আর যত্ন-আত্তিতে খুব অল্প সময়েই রাশেদের জায়গাটা শফিক দখল করে নিয়েছে। বছর দুয়েক যেতেই লাবনী যখন বুঝতে পারে ওর মনে আর রাশেদের কোনো জায়গা নেই, ওর মনের পুরোটাই শফিক দখল করে নিয়েছে, তখন লাবনী শফিকের কাছে নিজেকে পুরোপুরি সমর্পণ করে। বিয়ের রাতেই শফিকের কাছে লাবনী সময় চেয়েছিল। লাবনীকে দেওয়া কথা শফিক রেখেছিল। এরপর একে একে দুই মেয়ের জন্ম, চাকরি আর সংসারের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে ওদের বড় করা, বিয়ে দেওয়া। কেটে গেল পঁয়ত্রিশ বছর! লাবনী এখন অনুভব করে, ওদের দাম্পত্য জীবন খুব সুখের ছিল। হ্যাঁ, খুব সুখেই কেটেছে ওদের দাম্পত্য জীবন।

বেশ রাত হয়েছে। লাবনীর একদম উঠতে মন চাইছে না, তবু ধীর পায়ে হাঁটতে থাকে সে।

পরদিন অফিস শেষে লাবনী ফুলের তোড়া নিয়ে শফিকের কবরের সামনে দাঁড়ায়। আজও শফিকের কবরে একগুচ্ছ রজনীগন্ধা ও গোলাপ ফুলের তোড়া কেউ রেখে গেছে। এবার লাবনীর মনে তোলপাড় শুরু হলো। শফিকের কোনো আত্মীয়, বন্ধু যে ফুলের তোড়াটি নিয়ে আসে না, এটা লাবনী একরকম নিশ্চিত। কারণ ভাই-বোন ছাড়া শফিকের এমন কোনো আপনজন নেই, যারা যানজটের এই শহরে মৃত্যুর এত দিন পর ওর কবরে ফুলের তোড়া নিয়ে আসবে। শফিকের ভাই-বোনদের লাবনী জিজ্ঞেস করেছিল, ওরা কেউ এই কদিনে ওর কবরে গিয়েছিল কি না। না, কেউ যায়নি। ঘরে বসেই শফিকের জন্য দোয়া-দরুদ পড়ছে তারা। দুই মেয়ের বিয়ে হয়েছে। স্বামী-সন্তান নিয়ে ওরা ঢাকায়ই থাকে। ওরা দুই দিন এসেছিল, কবর জিয়ারত করে ফিরে গেছে।

তাহলে কে সে?

বেশ রাত পর্যন্ত সেই গাছটার নিচে বসে থাকল লাবনী। পুরো একটা জীবনের ছোট-বড় কত কথা মনে বুদবুদ হয়ে উঠে আসছে! কিন্তু এত কথার ফাঁকে ফুলের তোড়াটির কথা ওকে বারবার খোঁচা দিচ্ছে। কে আসে রোজ রোজ শফিকের পছন্দের ফুলের তোড়া নিয়ে?

আজ ওর বাসায় যেতে একদমই মন চাইছে না। তবু পা জোড়া টেনে টেনে বাড়ির দিকে হাঁটা দেয় লাবনী।

পরদিন এসেও লাবনী একই জায়গায় ফুলের তোড়াটি দেখতে পায়। এর পরদিন থেকে লাবনী আর ফুলের তোড়া নিয়ে আসে না। যে জিনিস রোজ একজন নিয়ে আসে, সেই একই  জিনিস ওর আনার প্রয়োজন কি? তা ছাড়া লাবনীর শরীরটাও আর আগের মতো শক্তপোক্ত নেই। এই কদিনেই লাবনীর শরীরে যেন ধস নেমেছে। রোজ অফিস শেষে এতটা রাস্তা পেরিয়ে কাটাবন গিয়ে ফুলের তোড়া নিয়ে কবরস্থানে আসাটা বেশ ঝক্কি। কেউ যদি না আনত তাহলে লাবনী যত দিন বেঁচে থাকত, যত কষ্টই হোক, ও শফিকের পছন্দের  ফুলগুলো নিয়ে আসত। এই ফুলগুলোর সুবাস নিতে না পারলে শফিকের ঘুম যে গভীর হয় না!

প্রতিদিন সকালে চোখ খুলেই লাবনীর মনে প্রশ্ন জাগে, আজও কি শফিকের কবরে ফুলের তোড়াটি দেখতে পাবে সে? প্রতিদিন লাবনী অফিস শেষে কবরস্থানে যায়। ছুটির দিনগুলোতেও লাবনী সন্ধ্যার দিকেই শফিকের কবরে আসে। কারণ এ সময় এই জায়গাটা বেশ চুপচাপ থাকে। অনেকক্ষণ নিজের মতো বসে থাকা যায়।

বছর গড়িয়ে গেল, মানে ৩৬৫ দিন! এতগুলো দিন পেরিয়ে গেল, কিন্তু লাবনীর কৌতূহলে বিন্দুমাত্র ভাটা পড়েনি। বরং যত দিন যাচ্ছে, লাবনীর কৌতূহল বেড়েই চলছে। প্রতিদিন গিয়ে তাজা ফুলের তোড়া দেখতে পায় সে। রোজ লাবনী যায় কবরস্থানে, ফুলের তোড়াটি দেখতে, নাকি শফিকের কবর জিয়ারত করতে, তা লাবনী নিজেও জানে না।

লাবনীর মনে সারাক্ষণ একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খায়, কে সে? কে?

বৃষ্টি-বাদল, ঝড়ঝাপটা, শীত উপেক্ষা করে লাবনী রোজ যায় কবরস্থানে।

কেন?

লাবনী জানে না।

শফিকের কবর জিয়ারত করতে? শফিককে অনুভব করতে? নাকি ফুলের তোড়াটি দেখতে?

লাবনীর কাছে এর কোনো সঠিক উত্তর নেই।

হঠাৎ লাবনী জ্বরে পড়ে। মেয়েরা পালাক্রমে এসে মায়ের সেবা করে। লাবনী প্রায় চার-পাঁচ দিন কবরস্থানে যেতে পারেনি। একটু সুস্থ হলে লাবনী ছুটে যায় কবরস্থানে। কেন?

লাবনীর উত্তর জানা নেই।

পশ্চিম আকাশে সূর্যটা একটু একটু করে তলিয়ে যাচ্ছে। বিকেলটা মুখ গোমড়া করে আছে। গোমড়ামুখো বিকেলটার মুখ ধীরে ধীরে কালচে  রং ধারণ করছে। লাবনী উদগ্রীব হয়ে শফিকের কবরের দিকে তাকায়। না, আজ শফিকের কবরে কোনো তাজা ফুলের তোড়া নেই। মাথা ছুঁয়ে রাখা কয়েক দিন আগের তোড়ার ফুলগুলো একদম শুকিয়ে গেছে। লাবনীর ঠোঁটের কোণে একটুকরো হাসি দেখা দিয়ে মিলিয়ে গেল। শফিকের কবরে তোড়া নেই বলে লাবনী খুশিতে হাসল? নাকি দুঃখ পেয়ে? বোঝা গেল না। লাবনী দোয়া-দরুদ পড়তে শুরু করল। মোনাজাত শেষে লাবনী চমকে ওঠে। একজন পুরুষ, বয়স পঁয়ষট্টি-ছেষট্টি হবে, দাঁড়িয়ে আছে শফিকের কবরের ঠিক বাঁ পাশে, নতুন একটি কবরের পাশে। নতুন কবরটার দিকে এতক্ষণ লাবনী খেয়াল করেনি। শফিকের বাঁ পাশে এত দিন যে কোনো কবর ছিল, তা লাঠির আগায়  বাধা নেমপ্লেট না থাকলে বোঝা যেত না। মাটি একদম সমান হয়ে গিয়েছিল। এখন এখানে নতুন কবর! মনে হয় এক-দুই দিন আগে এখানে কাউকে শায়িত করা হয়েছে। ভদ্রলোকটির হাতের ফুলের তোড়াটির দিকে তাকিয়ে লাবনীর নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার অবস্থা! তিনি একগুচ্ছ রজনীগন্ধা ও দুটি লাল টকটকে বড় বড় গোলাপ ফুলের তোড়া নিয়ে কবরটির কাছে দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করে দোয়া পড়ছেন। লাবনী বস্ফািরিত চোখে তোড়াটির দিকে তাকিয়ে আছে। একটু পরে তিনি কবরটির মাথার কাছে ফুলের তোড়াটি রেখে দিলেন। লাবনী আর স্থির থাকতে পারল না।  জানতে চাইল, যিনি এই কবরে শায়িত আছেন, তিনি আপনার কে হন?

আমার স্ত্রী।

আপনার স্ত্রীর বুঝি গোলাপ আর রজনীগন্ধা খুব পছন্দের ফুল?

হ্যাঁ। ওর খুব পছন্দের ফুল।

একটু দম নিয়ে, কবরের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ভদ্রলোক আপন মনে বিড়বিড় করেন, দুই বছর আগে ওর ক্যান্সার ধরা পড়ে। বছরখানেক আগে আমার সঙ্গে জিদ ধরে পাশাপাশি এই দুটি কবরের জায়গা পঁচিশ বছরের জন্য রিজার্ভ করে।

বছরখানেক আগে? লাবনী চমকে প্রশ্ন করে।

লোকটি একটু অপ্রস্তুত হয়, না…হ্যাঁ, মানে গত বছর মে মাসে ওর আর আমার জন্য এই দুটি কবরের জায়গা রিজার্ভ করে সে।

শফিক মারা যায় গত বছর এপ্রিলে, এক মাস  যেতে না যেতেই ওর ঠিক পাশের জায়গা উনি রিজার্ভ করেন? লাবনী মুখ-চোখ কুঁচকে ওপরের ঠোঁট দিয়ে নিচের ঠোঁট শক্ত করে চেপে ধরে।

লোকটি লাবনীর মুখের দিকে তাকিয়ে বলেন, আপনি কি অসুস্থ বোধ করছেন?

লাবনী নিজেকে সামলিয়ে বলে, না না, তেমন কিছু না।

‘আসি’ বলে লোকটি চলে যায়।

রাতে বিছানায় থকথকে ঘন অন্ধকারে ডুবে যেতে যেতে বিড়বিড় করে লাবনী, আট কুঠরি, শূন্য দরজা।

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com