পিটারের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো কোচ কি চান, কেন চান, কিভাবে চান, এসব কিছুই খেলোয়াড়রা সহজেই বুঝতে পেরেছেন। তাঁরা বুঝতে পেরেছেন কোচের আসল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। কোচ বুঝতে পেরেছেন খেলোয়াড়দের মনমানসিকতার পাশাপাশি তাঁদের মেধা ও সম্ভাবনা। তিনি প্রথম থেকেই চেয়েছেন স্বাভাবিক খেলা। পরীক্ষা-নিরীক্ষা তো প্রস্তুতির অংশ। প্রথম থেকেই নারী ফুটবলাররা কোচের প্রশিক্ষণ কর্মসূচিকে দারুণভাবে উপভোগ করেছেন। কোচ তাদের মধ্যে আশ্বর্যজনক সাহস ও আত্মবিশ্বাসের জন্ম দিতে সক্ষম হয়েছেন। তিনি প্রত্যেকের ‘আনলিমিটেড’ সম্ভাবনাকে নাচিয়ে তোলার পাশাপাশি তাদের মধ্যে নতুন স্বপ্নের জন্ম দিতে সক্ষম হয়েছেন। তিনি তাদের বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন কেন সব সময় প্রস্তুতি পর্ব বা ফ্রেন্ডলি ম্যাচে ফিফা র্যাংকিংয়ে এগিয়ে থাকা দলের সঙ্গে খেলার দরকার আছে। খেলোয়াড়দের মাঠের নৈপুণ্যের মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন তিনি আর তাঁর নারী ফুটবল সৈনিকরা ‘রাইট ডাইরেকশনে’ আছেন। তবে আগামী দিনগুলোতে অনেক চ্যালেঞ্জও আছে। প্রয়োজনীয় চাহিদাগুলো পূরণ না করতে পারলে সম্ভাবনাময় ফুটবল সমস্যায় পড়ে যেতে পারে।
‘গ্রাউন্ড ব্রেকিংয়ের’ কাজটা কোচ পিটার করেছেন। যেটি আগে কখনো করা হয়নি। বিভিন্ন পর্যায়ে নারী ফুটবলে কোচরা উল্লেখ করার মতো অবদান রেখেছেন। তবে প্রত্যেকের একটি সীমাবদ্ধতা আছে। এটি মেনে নিতে হবে। যে কাজের জন্য যিনি যোগ্য তাকেই বেছে নিতে হবে খেলার ভালো চাইলে। ‘অ্যাবিলিটি’ আর ‘অ্যাটিটিউড’ মাঠে এবং মাঠের বাইরে এর তো কোনো বিকল্প নেই। কোচ খেলোয়াড়দের কাছে চাচ্ছেন ‘হাই ইনটেনসিটি’ এবং ‘হাই প্রেস’ ফুটবল। পিটার আমাকে বলেছেন, ‘মেয়েরা আমাকে বারবার উসকে দিচ্ছে। এরাই আমাদের ভবিষ্যৎ। এদের মানসিকতা হলো সত্যি ‘গোল্ড’। তারা দেশের জন্য সব কিছু করতে প্রস্তুত। প্রয়োজন শুধু তাদের পাশে দাঁড়ানো। বড় স্বপ্ন তখনই বাস্তবে বাস্তবায়িত হবে—যখন মাঠ এবং মাঠের বাইরে সবাই ফুটবলারদের পাশে দাঁড়াবেন।
আমরা সবাই নারী ফুটবলে সাফল্য দেখতে চাই। চাই নারী ফুটবলারদের সাফল্যের দোলায় দোল খেতে। আমরা হয়তো জানি না কোন পরিবেশে, কোন ধরনের পরিস্থিতি মোকাবেলা করে আঞ্চলিক পর্যায়ে বয়সভিত্তিক এবং জাতীয় দল নৈপুণ্য প্রদর্শন করে চলেছে। সত্যি কথা বলতে কি আমরা এরই মধ্যে সীমাবদ্ধতায় আটকে পড়েছি। এখান থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন ভবিষ্যতের জন্য পরিকল্পিত উদ্যোগ।
এশিয়ান কাপে কোয়ালিফাই করে দেশে ফেরার সময় গভীর রাতে হাজার হাজার মানুষ নারীদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। এটি ইতিবাচক। তবে প্রয়োজন হলো সর্বমহলের সহযোগিতা ও সমর্থন। উচ্ছ্বাস আর সুন্দর সুন্দর কথা বলে তো নারী ফুটবলে কোনো লাভ হবে না, যদি না এই ফুটবলের পাশে না দাঁড়ানো হয়। নারী ফুটবলের জন্য যেটি দরকার সেটি হলো সরকারের শতভাগ সমর্থন, সাহায্য ও সহযোগিতা। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর নারী দল এশিয়ান কাপে কোয়ালিফাই করেছে প্রথমবারের মতো, এর আগে সাউথ এশিয়ান ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপে দ্বিতীয়বারের মতো চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। কিছুদিন আগে অনূর্ধ্ব-২০ ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে নারী দল। অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে লিখিতভাবে নারী ফুটবলের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা এবং তার সমাধানের জন্য আবেদন করা হয়েছিল, কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। দুঃখজনক হলেও সত্য যে ২০১৮ থেকে ঢাকা ব্যাংক ছাড়া আর তেমন কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নারী ফুটবলে এগিয়ে আসেনি। বাণিজ্যিক স্পন্সর নারী ফুটবলে খুব দরকার।
ভাবা যায়, নারী দল এশিয়ান কাপে কোয়ালিফাই করেছে। দক্ষিণ এশিয়ার গণ্ডি ছাড়িয়ে এশিয়া মহাদেশের ফুটবলে প্রবেশ করেছে। সেই বাংলাদেশ নারী দলের কোনো ফুটবল কাঠামো নেই। অনুশীলন করার জন্য সারা দেশে একটিও ফুটবল প্র্যাকটিস গ্রাউন্ড নেই। নেই পৃথক আধুনিক জিমনেসিয়াম। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকতে হয় মেয়েদের আবাসিক ক্যাম্পে। খেলোয়াড়দের ফুটবল নিউট্রেশনে আছে প্রচণ্ড ঘাটতি। অর্থের অভাবে নারী দল নিয়মিতভাবে বিদেশে গিয়ে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে খেলতে পারে না। দেশে নারীদের লীগ নিয়মিতভাবে অনুষ্ঠিত হয় না। ক্লাবগুলো অনেক কথা বললেও নারী দল গঠনের ক্ষেত্রে সব সময় পিছু হটে চলেছে বিভিন্ন কারণে। দীর্ঘ সময় পেশাদার নারী লীগ অনুষ্ঠিত না হলে তো দেশের বাইরে এএফসি নারী কম্পিটিশনের কিছু কিছু দরজা সব সময় বন্ধ থাকবে। এত প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও আন্তর্জাতিক ফুটবলে নৈপুণ্য প্রদর্শন করে চলেছেন নারী ফুটবলাররা তারা কি সত্যি সবাই জাদুকর।