কিন্তু তার পরও নির্বাচন শেষ পর্যন্ত হবে কি না তা নিয়ে অনেকের সংশয়, সন্দেহ ছিল। সেই সব সংশয়, সন্দেহের কারণ ছিল দেশের বিদ্যমান নানা পরিস্থিতি। একের পর এক মব সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, বৈষম্যবিরোধী কিছু ছাত্রনেতার বেপরোয়া ভয়ংকররূপে আত্মপ্রকাশ দেশে এক উদ্বেগজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। এসব ঘটনা শেষ পর্যন্ত দেশকে কোন দিকে নিয়ে যাবে তা নিয়ে জনমনে সৃষ্টি হয়েছিল হতাশা এবং আতঙ্ক। বিশেষ করে ৫ আগস্টের আগেই একজন ছাত্র উপদেষ্টা ফেসবুকে ‘আরেকটি এক-এগারোর পদধ্বনির’ কথা লিখে এই শঙ্কাকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু প্রধান উপদেষ্টা অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি এসব বিভক্তি এবং নানা মতের মধ্যে জনগণের কণ্ঠস্বরটি গ্রহণ করেছেন, জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে গ্রহণ করেছেন।প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ধন্যবাদ দিতে চাই এ কারণে যে তিনি জনগণের অভিপ্রায়ের কথা শুনেছেন। জনগণের আকাঙ্ক্ষার অনুরণন ঘটিয়েছেন তিনি তাঁর বক্তব্যে। এটির মাধ্যমে প্রমাণিত হয়, ড. মুহাম্মদ ইউনূস গত এক বছরে জনবিচ্ছিন্ন হননি, বরং জনগণের ভাবনা, দুঃখ-কষ্টগুলোকে তিনি প্রতি মুহূর্তে শুনছেন এবং জনগণের দুঃখ-কষ্ট লাঘবের জন্য তিনি চেষ্টা করছেন। গণতন্ত্রের যে অঙ্গীকার এক বছর আগে তিনি করেছেন, তা পূরণে তিনি অটল।মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা, এখন নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণা করা হয়েছে। নির্বাচনের জন্য আর ছয় মাস মাত্র সময় হাতে আছে। ছয় মাস খুবই স্বল্প সময়। এই সময়ের মধ্যে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ আপনাকে করতে হবে অত্যন্ত কঠোরভাবে। আমরা জানি, আপনি একজন সফল মানুষ। আপনি একজন দায়িত্ববান মানুষ এবং আপনি একজন বিচক্ষণ ব্যক্তিত্ব। আপনি যে দায়িত্ব নেন সে দায়িত্ব আপনি সফলতার সঙ্গে সম্পন্ন করেন। অতীতে আপনার কোনো ব্যর্থতার রেকর্ড নেই। আর সে কারণেই আপনার ওপর দেশবাসীর আস্থা আছে। নির্বাচনের এই বৈতরণী আপনার নেতৃত্বেই পার হতে হবে। এই সময়টা হবে অত্যন্ত কঠিন, বন্ধুর এবং ঝঞ্ঝাবিক্ষুুব্ধ।
মনে রাখতে হবে, দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো না, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নাজুক। এ রকম একটি পরিস্থিতির মধ্যে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। এ জন্য এখন থেকে আপনাকে কঠোরভাবে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। বহুদিন দেশের মানুষ ভোট দিতে পারে না। কাজেই মানুষের ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার এই অভিযাত্রা খুব সহজ নয়। যারা গণতন্ত্রবিরোধী শক্তি আছে, তারা এই নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করা, নির্বাচনকে বিতর্কিত করা এবং নির্বাচনকে বানচাল করার জন্য নানা রকম চেষ্টা চালিয়ে যাবে—এটা বলাই বাহুল্য। সেই চেষ্টা প্রতিরোধ করে দেশের ইতিহাসে একটি সবচেয়ে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন করা এখন প্রধান উপদেষ্টার নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব। দেশবাসী বিশ্বাস করে, আস্থা রাখে যে ড. মুহাম্মদ ইউনূস সে দায়িত্ব সফলভাবে পালন করতে পারবেন।
নির্বাচনের জন্য এখন দেশের সামনে পাঁচটি চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রথমত, এই নির্বাচন নিয়ে যেন কোনো বিরোধ সৃষ্টি না হয়। এই নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর বিএনপিসহ দেশের সিংহ রাজনৈতিক দলগুলো একে স্বাগত জানিয়েছে। গত বছর জুলাই বিপ্লবে অংশগ্রহণকারী প্রায় সব শক্তি নির্বাচনের ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছে। বৃহত্তর জনস্বার্থে তারা নির্বাচনের তারিখ মেনে নিয়েছে। এটিই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। গণতন্ত্রের সব সিদ্ধান্ত আপনার পক্ষে যাবে না। সব সিদ্ধান্ত আপনার পছন্দ হবে না। কিন্তু তার পরও যেটি সবার সিদ্ধান্ত, সেই সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়ার চর্চাই হলো গণতান্ত্রিক রীতি। এখন জনগণের ম্যান্ডেট দেওয়ার জন্য তারা জনগণের কাছে যাবে, জনগণের মতামত গ্রহণ করবে এবং জনগণের কাছে নিজেদের কর্মসূচি পেশ করবে। একটা প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনী লড়াইয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করবে। শেষ পর্যন্ত জনগণই ক্ষমতার উৎস।
দ্বিতীয়ত, এই নির্বাচন পরিচালনার জন্য যে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি থাকা দরকার, তা এখনো নেই বলেই চলে। দ্রুত আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে কঠোর এবং নির্মোহভাবে সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ এবং মব বাহিনীকে দমন করতে হবে। কোনো দল বা প্রভাবশালী ব্যক্তির ছত্রচ্ছায়া যেন মব বাহিনী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দখল না করতে পারে, চাঁদাবাজি করতে না পারে, জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করতে না পারে সে ব্যাপারে এখন থেকেই অন্তর্বর্তী সরকারকে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। প্রয়োজনে এখানে সশস্ত্র বাহিনীর নজরদারি এখন অনেক বাড়াতে হবে।
সশস্ত্র বাহিনী প্রত্যাশা করেছিল ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সেই প্রত্যাশিত সময়ের কাছাকাছি নির্বাচন দেওয়া হয়েছে। এ দেশের জনগণ সশস্ত্র বাহিনীর প্রতি অত্যন্ত আস্থাশীল, শ্রদ্ধাশীল। জনগণ আশা করে, দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিশেষ করে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সশস্ত্র বাহিনী পুলিশ এবং অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে সহযোগিতা করে একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করবে। এটি কোনো কঠিন কাজ নয়। আন্তরিকতা থাকলে পক্ষপাতহীনভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলে এটি সহজেই সম্ভব।
তৃতীয়ত, এই নির্বাচন ঘিরে পতিত ফ্যাসিবাদ এবং স্বৈরাচার নানা রকম ষড়যন্ত্র করতে পারে। নানা রকম অপপ্রচার, গুজবের মাধ্যমে নির্বাচনব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। সেটি প্রতিরোধে অবশ্যই অন্তর্বর্তী সরকার কাজ করবে বলে দেশবাসী বিশ্বাস করে।
চতুর্থত, এই নির্বাচন কেবল দেশের মানুষের জন্যই জরুরি না, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সারা বিশ্বই নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে থাকবে। কাজেই বিশ্বের কোনো বন্ধু দেশকে যেন ভুল বুঝিয়ে নির্বাচন সম্পর্কে বিভ্রান্ত না করা হয় সে ব্যাপারে অন্তর্বর্তী সরকারকে অবশ্যই সচেতন থাকতে হবে। বৈশ্বিক কূটনীতিক তৎপরতা বাড়াতে হবে। শুধু সরকার নয়, রাজনৈতিক দলগুলোকে এ ব্যাপারে তৎপর হতে হবে।
পঞ্চমত, এই নির্বাচনের আগে দেশে একটি স্বস্তির পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। গত এক বছরে ফ্যাসিবাদবিরোধী অভিযানের নামে নিরীহ ব্যবসায়ী, শিল্পপতি এবং সাধারণ জনগণ নানারকম হয়রানির শিকার হয়েছেন। ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ। অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান অচল হয়ে আছে। কোনো কোনো ব্যবসায়ীকে ফ্যাসিবাদীর দোসর তকমা দিয়ে অকারণে হয়রানি করা হচ্ছে। নির্বাচনের উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টির জন্য এসব হয়রানি এবং নিপীড়ন অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। সুনির্দিষ্টভাবে যাঁরা হত্যার সঙ্গে জড়িত, যাঁরা ব্যাংক লুটেরা, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক, আপত্তি নেই। কিন্তু ঢালাওভাবে সবাইকে স্বৈরাচারের দোসর বলে হয়রানি করার এই প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। নির্বাচন করতে হবে একটি উৎসবমুখর পরিবেশে। এ রকম হয়রানি, দমন-নিপীড়নের মধ্য দিয়ে দেশে আতঙ্ক থাকবে, তাতে মানুষ ভোট দিতে পারবে না।
দেশবাসী প্রত্যাশা করে, আগামী ফেব্রুয়ারিতে দেশে একটি গণতন্ত্রের উৎসব হবে। সেই উৎসবে সব মানুষ নির্ভয়ে তাদের পছন্দের ব্যক্তিকে ভোট দেবেন। এই নির্বাচনে যেই ফলাফলই হোক না কেন, অংশগ্রহণকারী সব রাজনৈতিক দল তা মেনে নেবে। পরাজিত দল বিজয়ী দলকে অভিনন্দন জানাবে। সবাই মিলেমিশে এক নতুন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার পথে আমরা এক সঙ্গে হাঁটব।