শিশুর মানসিক বিকাশ ও শারীরিক সুস্থতার জন্য মায়ের বুকের দুধের বিকল্প নেই। বাংলাদেশে গত এক দশকে শিশুর মাতৃদুগ্ধ পানের হারে কোনো অগ্রগতি হয়নি। বরং কিছু কিছু ক্ষেত্রে কমেছে। সম্প্রতি এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, গড়ে ৪৯ শতাংশ শিশু জন্মের প্রথম ছয় মাস মায়ের দুধ পায়।
বাংলাদেশ জনমিতিক ও স্বাস্থ্য জরিপের (বিডিএইচএস) সর্বশেষ ২০২২ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জন্মের পর থেকে পাঁচ মাস বয়সের শিশুদের শুধু বুকের দুধ পানের হার ৫৫ শতাংশ। ২০১৭-১৮ সালে এই হার ছিল ৬৫ শতাংশ। এর আগে ২০১৪ সালে এ হার ৫৫ শতাংশ, ২০১১ সালে ৬৪ শতাংশ, ২০০৭ সালে ৪৩ শতাংশ এবং ২০০৪ সালে ৪২ শতাংশ ছিল।শিশুর মাতৃদুগ্ধ পানের হারে অগ্রগতি না হওয়ার পেছনে প্রধান চারটি কারণ জানিয়েছেন পুষ্টি বিশেষজ্ঞরা।তাঁরা বলছেন, জাতীয় ব্রেস্টফিডিং কমিটির নিষ্ক্রিয়তা, প্রশিক্ষণ বন্ধ থাকা, সচেতনতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে প্রচারের অভাব ও মাতৃদুগ্ধের বিকল্প শিশুখাদ্য বিক্রি, বিপণন ও প্রচার নিয়ে দেশে আইনের প্রয়োগ না থাকা।এমন পরিস্থিতির মধ্যে দেশব্যাপী আজ শুক্রবার শুরু হচ্ছে বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ। ওয়ার্ল্ড অ্যালায়েন্স ফর ব্রেস্টফিডিং অ্যাকশনের (ডাব্লিউএবিএ) দেওয়া এ বছরের প্রতিপাদ্য হচ্ছে, ‘বুকের দুধ খাওয়ানোকে অগ্রাধিকার দিন : টেকসই সহায়তা ব্যবস্থা তৈরি করুন।’ দিবসটি উপলক্ষে প্রতিবছর গর্ভবতী মা, শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের মাতৃদুগ্ধ দান, মাতৃদুগ্ধ বিকল্প শিশুখাদ্য এবং পুষ্টিবিষয়ক অবহিতকরণসহ নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হলেও এবার তা হয়নি।বাংলাদেশ ব্রেস্টফিডিং ফাউন্ডেশনের পরিচালক ও পুষ্টিবিদ খুরশিদ জাহান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মাতৃদুগ্ধের হারে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে প্রথম। তবে এ হার দিন দিন কমছে। সম্প্রতি আট বিভাগের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, জন্মের প্রথম ছয় মাস পর্যন্ত মায়ের বুকের দুধ পায় গড়ে ৪৯ শতাংশ শিশু।’
খুরশিদ জাহান বলেন, ‘শিশুর মায়ের দুধ পানের হারে বাংলাদেশের অগ্রগতি না হওয়ার পেছনে প্রধান যে কয়টি কারণ রয়েছে এর মধ্যে একটি—সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য প্রচার-প্রচারণা নেই। যে প্রোগ্রামগুলো ছিল সেগুলো এখন আর হচ্ছে না।
মাতৃদুগ্ধের বিকল্প শিশুখাদ্য বিক্রি, বিপণন ও প্রচার নিয়ে দেশে আইন আছে, তবে এর কোনো প্রয়োগ নেই। চিকিৎসকদের, নার্সদের প্রশিক্ষণ বন্ধ রয়েছে। সর্বশেষ ২০১৬-২০১৭ সময়ে কিছু মানুষকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল।’ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুর প্রথম ছয় মাস মায়ের বুকের দুধ (এক্সক্লুসিভ ব্রেস্টফিডিং) শিশুর অপুষ্টিজনিত সমস্যা কমায় এবং ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত শিশুমৃত্যু কমায়। দুধ না খাওয়ালে নিউমোনিয়ায় মৃত্যুর ঝুঁকি প্রায় ১৫ গুণ বৃদ্ধি পায়। ডায়রিয়ায় মৃত্যুর ঝুঁকি প্রায় ১১ গুণ বাড়ে। এ ছাড়া অপুষ্টি ও অন্যান্য কারণে মৃত্যুর ঝুঁকি প্রায় ১৪ গুণ বৃদ্ধি পায়।জাতীয় পুষ্টিসেবা প্রতিষ্ঠানের ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. সুপ্তা চৌধুরী বলেন, ‘একটা শিশুর যতটুকু পুষ্টি দরকার, তার সবটুকুই মায়ের দুধে বিদ্যমান। আমরা বলি, প্রথম ছয় মাস পর্যন্ত শিশুকে এক ফোঁটা পানিও দেওয়া যাবে না। যখন একটি শিশু মায়ের গর্ভে থাকে তখন থেকেই তার মস্তিষ্কের বিকাশের কাজ শুরু হয়ে যায়। জন্মের পর শিশুর মস্তিষ্কে আর নতুন করে কোনো কোষ (সেল) তৈরি হয় না। একটা শিশু ১০ হাজার কোটি (১০০ বিলিয়ন) মস্তিষ্কের কোষ নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। জন্মের পর এই কোষগুলোর মাত্র ২৫ শতাংশের যোগাযোগ বা সংযোগ থাকে নিউরনে (স্নায়ুকোষ)। বাকিগুলোর মধ্যে ৯৫ শতাংশের সংযোগ স্থাপনের কাজ জন্মের তিন বছরের মধ্যে হয়ে যায়। এই ক্ষেত্রে দেখা যায়, যারা ছয় মাস পর্যন্ত শুধু মায়ের দুধ খেয়েছে তারা অন্যদের তুলনায় ৩৫ শতাংশের বেশি মেধাবী হয়। তাই এখানে ছয় মাস পর্যন্ত শুধু মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানোর বিষয়টিকে খুব বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।’