বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিয়োগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী এসব প্রতিষ্ঠানের নিয়োগে একটি বাছাই কমিটি হবে; যেখানে পিএসসি, দুদক, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক এবং মানবাধিকার কমিশনের প্রধানের নিয়োগ হবে সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায়। আমরা মনে করি, এ পদগুলো নির্বাহী আইনের ভিত্তিতে হলে ভালো। কারণ এতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। তাই এটি সরকারের হাতে থাকা উচিত। নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক নিয়োগ নিয়ে আমরা কোনো আপত্তি করিনি।’পিএসসির বিষয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘বিগত দিনে পিএসসির প্রশ্ন ফাঁস ও দুর্নীতির মূল কারণ ছিল ৫৬ শতাংশ কোটা। এখন আর তা নেই। মাত্র ৭ শতাংশ আছে। আমরা বলেছি, সেটিও সংসদে আলোচনা ও আইনগত নিয়মে থাকা উচিত। আমরা পিএসসির ভাইভা ২০০-এর পরিবর্তে ৫০ নম্বর করার কথা বলেছি। সেখানে কোনো ধরনের বৈষম্য করা যাবে না। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়োগ নিয়ে বিএনপি নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘সংসদ সদস্যরা গোপন ব্যালটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করবেন। এতে সবাই একমত। কেউ ভিন্নমত দেয়নি। তবে কিছু ক্ষমতা আমরা রাষ্ট্রপতিকে দিতে চাই, যাতে একটি ভারসাম্য থাকে।’ তিনি বলেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি। মৌলিক অধিকারের বিষয়গুলোও নিশ্চিতের বিষয়ে আমরা জোর দিয়েছি। আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে দেশ গড়তে চাই।’জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের বলেন, সাংবিধানিক বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়োগে সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণের পক্ষে বেশির ভাগ দল। আর বিএনপিসহ কয়েকটি দল বিপক্ষে ছিল। তার পরও শেষ পর্যন্ত নোট অব ডিসেন্ট দিয়ে তারাও একমত হয়েছে। এই নিয়োগগুলো সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিয়েছে কমিশন।
এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন বলেন, ‘কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী রাজনৈতিক দলগুলোর ভোটের আনুপাতিক হারে সংসদের উচ্চকক্ষের ১০০ সদস্য নির্বাচিত হবেন। এতে সমাজের পরিশীলিত ধারার কিছু ব্যক্তি নির্বাচিত হয়ে আসতে পারবেন। আমরাও এটির পক্ষে। কারণ নিম্নকক্ষের ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো তাঁরা তুলে ধরবেন। এতে বহু দলের সমন্বয়ে দেশ গড়া সম্ভব হবে। আমরা মনে করি, এতে চেক অ্যান্ড ব্যালান্স থাকবে।’সিপিবির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, এ দেশের আর্থ-সামাজিক ও ভূ-পরিবেশ বিবেচনায় উচ্চকক্ষ অনুকূলে নয়। বরং উচ্চকক্ষের প্রস্তাব এ দেশের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা বিবেচনায় উচ্চাভিলাষী। তাই ‘নোট অব ডিসেন্ট’ নয়, উচ্চকক্ষের আলোচনা প্রত্যাখ্যান করেছে সিপিবি, বাসদ, গণফোরামসহ বাম দলগুলো। তিনি বলেন, সব দল সব বিষয়ে একমত নয়। সুতরাং গুটিকয়েক দলের মতের ভিত্তিতে সার্বিক ঐকমত্য বলাটা যুক্তিযুক্ত নয়। যারা ভোটের মাধ্যমে ১ শতাংশ ভোট পেয়েও নির্বাচিত হবে না, তারাই পিআর পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষে প্রতিনিধিত্ব হওয়ার আকাঙ্ক্ষা করছে।বিএলডিপির চেয়ারম্যান ও ১২ দলীয় জোটের মুখপাত্র শাহাদাত হোসেন সেলিম বলেন, ‘উচ্চকক্ষের নামে নখদন্তহীন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে রাষ্ট্রের ব্যয় বিলাসী চিন্তা হচ্ছে। উচ্চকক্ষের নামে আগামী দিনের সরকারকে হাত-পা বেঁধে সাঁতার কাটার পরিস্থিতি তৈরিতে উচ্চকক্ষের আলোচনার বিরোধিতা করছি।’গত রাত সাড়ে ৯টায় সংবিধানের চার মূলনীতি বাদ দেওয়ার প্রশ্নে বাম দলগুলো সংলাপ বর্জন করে। দলগুলোর মতে, চার মূলনীতি মুক্তিযুদ্ধের সনদ। এর বিপক্ষে সিদ্ধান্ত নেওয়া মানে মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করা। মূলত মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তিগুলো তাদের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতেই এ বিষয়টিকে সামনে নিয়ে এসেছে।তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও মৌলিক অধিকার : রাষ্ট্র পরিচালনায় সংবিধানের চার মূলনীতি নিয়ে আলোচনার আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও মৌলিক অধিকারসংক্রান্ত বিষয়ে আলোচনা হয়। ঐকমত্য ছাড়াই ওই আলোচনা শেষ হয়। কমিশন এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।
সংলাপ শেষে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন বলেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুতে সংসদে একটি মধ্যবর্তী বিধান অন্তর্ভুক্ত করা যায় কি না, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কমিশন এ বিষয়ে একটি সিদ্ধান্ত দেবে। মৌলিক অধিকারসংক্রান্ত আলোচনায় আমরা বলেছি, বিদ্যমান মৌলিক অধিকারের সঙ্গে আধুনিক সময়ের আলোকে কিছু অধিকার যেমন ইন্টারনেটের অধিকার যুক্ত করা যায় কি না। তবে মৌলিক অধিকার একবার সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হলে তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব রাষ্ট্রের।দ্বিতীয় দফায় নোট অব ডিসেন্টসহ ১৯টি বিষয়ে ঐকমত্য : প্রথম পর্বে ৩৩টি দল ও জোটের সঙ্গে ২০ মার্চ থেকে ১৯ মে পৃথক আলোচনা করে কমিশন। এই পর্বে ঐকমত্য হয়নি, এমন ২০টির মতো মৌলিক সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে গত ৩ জুন থেকে সব দলকে একসঙ্গে নিয়ে বিষয়ভিত্তিক আলোচনা শুরু করে ঐকমত্য কমিশন। সংস্কারের ক্ষেত্রে এই প্রস্তাবগুলোকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। দ্বিতীয় পর্বের শেষ দিন পর্যন্ত ১৯টি বিষয়ে নোট অব ডিসেন্টসহ ঐকমত্য হয়েছে বলে কমিশনের পক্ষে জানানো হয়। এসব সিদ্ধান্তের বেশ কয়েকটি বিষয়ে বিএনপি, বিএনপির সমমনা দল ও জোট এবং বাম দলগুলোর আপত্তি রয়েছে।
এর আগে প্রথম পর্বে যেসব বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে, তার একটি তালিকা গত বুধবার দলগুলোকে দেওয়া হয়। সেখানে মোট ৬২টি বিষয় এবং কোন প্রস্তাবে কয়টি দল একমত হয়েছে, তা উল্লেখ রয়েছে। এগুলোর বেশির ভাগই বিচার বিভাগ ও দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কার কমিশনের সুপারিশ। জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের সুপারিশ রয়েছে ছয়টি। এ ছাড়া সংবিধান সংস্কার কমিশনের ১৮টি সুপারিশ রয়েছে। যদিও এর মধ্যে কয়েকটি বিষয় নিয়ে দ্বিতীয় পর্বেও আলোচনা হয়। যেমন—সংবিধান সংশোধন করে দ্বিকক্ষ আইনসভা করার বিষয়ে ৩০টি দল একমত হয়েছে। তবে উচ্চকক্ষের গঠনপ্রক্রিয়া নিয়ে দ্বিতীয় দফায়ও আলোচনা ও সিদ্ধান্ত হয়। আবার প্রথম দফায় সংসদে নারীর আসনসংখ্যা বাড়িয়ে ১০০ করার ব্যাপারে নীতিগতভাবে একমত হয় ১৯টি দল। এটি চূড়ান্ত করতে দ্বিতীয় দফায়ও দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে কমিশন।গতকালের সংলাপ শেষে ব্রিফিংয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেনে, দ্বিতীয় পর্যায়ের বৈঠকে ১৯টি বিষয়ে আলোচনা হয়েছে৷ এসব বিষয়ে নোট অব ডিসেন্টসহ ঐকমত্য এবং সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। যেসব ঐকমত্য বা সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে তা জুলাই জাতীয় সনদে পরিণত করতে হবে। ডিসেন্টসহ যেসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে তা হলো সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে অর্থবিল ও আস্থা ভোটের সঙ্গে সংবিধান সংশোধন ও জাতীয় নিরাপত্তা (যুদ্ধ পরিস্থিতি) যুক্ত করা, নারী প্রতিনিধিত্ব, বিচার বিভাগ বিকেন্দ্রীকরণ ও সুপ্রিম কোর্টের বিকেন্দ্রীকরণ, প্রধানমন্ত্রীকে একাধিক পদে রাখার প্রশ্ন, পিএসসি, দুদক, সিএএন্ডজি এবং ন্যায়পাল নিয়োগের বিধান সংবিধানে সংযোজন না করে সংশ্লিষ্ট আইনগুলো প্রয়োজনীয় সংশোধনের মাধ্যমে নিশ্চিত করা, উচ্চকক্ষ গঠন, রাষ্ট্রপতির নির্বাচন পদ্ধতি, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও দায়িত্ব, তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিষয়ে উত্থাপিত সমন্তিত প্রস্তাবের ৮, ৯, ১১ এবং ১২ ক্রমিক নম্বর, নাগরিকের মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ, সুরক্ষা এবং বাস্তবায়নে সাংবিধানিক ও আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি।অধ্যাপক আলী রীয়াজ জানান, নারীদের আসন বৃদ্ধির প্রশ্নে সবচেয়ে বেশি নোট অব ডিসেন্ট দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির বিষয়ে গণফোরাম, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী), বাসদ, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) নোট অব ডিসেন্ট প্রদানসহ সভা বর্জন করে। এ ছাড়া এই বিষয়ে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল এই ইস্যুতে ভিন্নমত প্রদান করে। তিনি আরো জানান, রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে যেসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে তা বাস্তবায়নের পথ নিয়ে আলোচনা করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। এ ক্ষেত্রে কমিশনও মনে করে, যেকোনো প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের জন্য সুনির্দিষ্ট পথ-পদ্ধতি চিহ্নিত করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকেও এ ব্যাপারে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করার আহবান জানান তিনি। তিনি বলেন, ঐকমত্য কমিশন এ বিষয়ে অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে।কারণ সংবিধানের ২৬ থেকে ৪৭ অনুচ্ছেদে থাকা অধিকারগুলো সেলফ এনফোর্সেবল এবং ৪৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নাগরিকরা তা প্রয়োগে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারেন। তাই অত্যন্ত সচেতনভাবে নতুন কোনো অধিকার সংযোজন করতে হবে।সালাহউদ্দিন বলেন, ‘আমরা আগেই জানিয়েছি, পঞ্চম সংশোধনের মাধ্যমে গৃহীত রাষ্ট্রের মূলনীতিগুলোর সঙ্গে ঐকমত্য কমিশনের প্রস্তাবিত বাক্যটি যুক্ত করার ক্ষেত্রে আমরা একমত। এতে বলা হয়েছে সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতি বজায় রাখা।’