ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনকে ঘিরে ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে উত্তাপ। দীর্ঘ ৫ বছরের প্রতীক্ষার পর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে বিরাজ করছে উৎসবমুখর পরিবেশ। প্রার্থীদের প্রচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে টিএসসি থেকে শুরু করে, মধুর ক্যান্টিন ও প্রতিটি আবাসিক হল। এরই মাঝে শিক্ষার্থীদের নজর কাড়ছেন কিছু হেভিওয়েট প্রার্থী, যারা ইতোমধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সাংগঠনিক ও শিক্ষাবান্ধব কর্মকা-ে নিজেদের অবস্থান দৃঢ় করেছেন।গত মঙ্গলবার ডাকসু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, আগামী ১৯ আগস্ট পর্যন্ত মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া যাবে। প্রার্থীদের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হবে ২৫ আগস্ট। আর ভোট গ্রহণ হবে ৯ সেপ্টেম্বর।আসন্ন এ নির্বাচনে প্যানেল তৈরি নিয়ে আলোচনায় আছে ছাত্র সংগঠনগুলো। এখন পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ প্যানেল ঠিক করতে পারেনি কোনো ছাত্র সংগঠন। ছাত্র সংগঠনগুলোর বাইরে স্বতন্ত্র প্রার্থীদেরও একটি প্যানেল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানা যায়। তবে এখন পর্যন্ত কোনো ছাত্র সংগঠন একক প্যানেল দেওয়ার ব্যাপারে অবস্থান পরিষ্কার করেনি। ছাত্র নেতাদের সাথে কথা বলে জানা যায়- এবার অতীতের মতো কোনো একক ছাত্র সংগঠনের প্রভাব খুব একটা থাকবে না। তাই সমন্বিত প্যানেল ঘোষণার সম্ভাবনাই প্রবল।হেভিওয়েট প্রার্থীদের তালিকায় কারা কারা?বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদ ও হলভিত্তিক ছাত্র সংগঠন থেকে উঠে আসা অনেকেই এবার ডাকসুর গুরুত্বপূর্ণ পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। এ তালিকায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের পক্ষে রয়েছে সংগঠনটির ঢাবি শাখার সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহস, সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন, সহ-সভাপতি আনিসুর রহমান খন্দকার অনিক ও সাংগঠনিক সম্পাদক নূরে আলম ভূঁইয়া ইমন। সংগঠনটির তুলনামূলক সিনিয়রদের ছাড়াও জুনিয়রদের মধ্যে শিক্ষার্থীদের মাঝে ইতোমধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবিদুল ইসলাম খান ও সংগঠনটির কবি জসিমউদদীন শাখার নেতা শেখ তানভীর বারি হামীম। তবে সংগঠনটির নেতাদের সাথে কথা বলে জানা যায়- ডাকসু নির্বাচনে কারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন সে ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের উপর নির্ভরশীল। এছাড়া প্যানেল নিয়েও এখনো কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারেনি সংগঠনটি।বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এবারের ডাকসু নির্বাচন হবে একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন। হেভিওয়েট প্রার্থীদের অংশগ্রহণে নির্বাচনের গুরুত্ব আরও বেড়ে গেছে। শিক্ষার্থীরাও প্রত্যাশা করছেন, এরা কেউ বিজয়ী হলে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন, গণতন্ত্র চর্চা ও শিক্ষার্থীদের কল্যাণে কার্যকর ভূমিকা রাখবেন।
ডাকসু নির্বাচনের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই জমে উঠছে ভোটের হিসাব-নিকাশ। শেষ পর্যন্ত কারা হবেন বিজয়ী, তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে ভোটের দিন পর্যন্ত। তবে হেভিওয়েট প্রার্থীদের উপস্থিতি ইতোমধ্যেই ক্যাম্পাস রাজনীতিকে নতুন করে চাঙা করে তুলেছে।এবারের নির্বাচনে প্রথমবারের মতো আলোচনায় রয়েছেন বাংলাদেশ ইসলামি ছাত্রশিবিরের নেতারা। শীর্ষ দুই পদে এখন পর্যন্ত সংগঠনটির কেন্দ্রীয় প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ও ঢাবি শাখার সাবেক সভাপতি আবু সাদিক কায়েম ও ঢাবি শাখার বর্তমান সভাপতি এসএম ফরহাদের নাম জানা যায়। প্যানেল নিয়ে কেন্দ্র ও হল পর্যায়ে সমন্বিত প্যানেল দেওয়ার ব্যাপারে ভাবছেন বলে জানান সংগঠনটির নেতারা। তবে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি সংগঠনটি।বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে শীর্ষ দুই পদে কেন্দ্র ও ঢাবি শাখার দুই নেতার নাম অনেকটাই চূড়ান্ত করা হয়েছে। তারা হলেন- ভিপি পদে ঢাবি শাখার আহ্বায়ক ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক আব্দুল কাদের ও জিএস পদে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের আহ্বায়ক ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক আবু বাকের মজুমদার।তিন বড় ছাত্র সংগঠনের বাইরে ভিপি পদে হেভিওয়েট প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদের সভাপতি বিন ইয়ামিন মোল্লা। মোল্লা দীর্ঘদিন ধরে ডাকসু নির্বাচন নিয়ে সরব ভূমিকা পালন করে আসছেন। ডাকসুর দাবিতে অনশন পর্যন্ত করেছেন এই নেতা। ইতোমধ্যে ডাকসু নিয়ে নিজেদের প্যানেলের নাম ও স্লোগান ঠিক করেছে সংগঠনটি।মোল্লা ইনকিলাবকে বলেন, সংগঠন ও সংগঠনের বাইরে যারা ব্যক্তি পর্যায়ে থেকে ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন এবং বর্তমানেও যারা শিক্ষার্থী বান্ধব কাজে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছেন তাদের সমন্বয়ে আমাদের নেতৃত্বে একটা প্যানেল হতে পারে। আমরা এ বিষয়ে আরো আলোচনা করব। আমাদের প্যানেলের নাম ইতোমধ্যে চূড়ান্ত হয়েছে। তা হলো- ডাকসু ফর চেইঞ্জ। এবং আমাদের স্লোগান হলো- নো মোর পলিটিক্স, নো মোর ভায়োলেন্স; মেইক দ্য ডাকসু ফর অ্যাকাডেমিক অ্যাক্সিলেন্স।প্যানেল নিয়ে উদার মানসিকতায় আছি বলে জানান গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের আহ্বায়ক আবু বাকের মজুমদার। তিনি বলেন, প্যানেলের ব্যাপারে এখন পর্যন্ত আমরা উদার মানসিকতায় আছি। গণঅভ্যুত্থানে ভূমিকা রাখা যেকোন ছাত্র সংগঠন কিংবা ব্যক্তি পর্যায়ে যারা অবদান রেখেছে তাদের ব্যাপারে আমরা উদার। যেকেউ আমাদের সাথে আসতে পারে। তবে নেতৃত্বে অবশ্যই আমরাই থাকব।শীর্ষ পদে আলোচনায় আছে আরো বেশ কয়েকটি মুখ। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য রয়েছে- বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক মুখপাত্র উমামা ফাতেমা, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সহ-সমন্বয়ক এবি জুবায়ের, মুসাদ্দিক আলি ইবনে মোহাম্মদ, স্বাধীন বাংলাদেশ ছাত্র সংসদের আহ্বায়ক জামালুদ্দীন মুহাম্মদ খালিদ, স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী শামিম হোসেন। এছাড়া বাম ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে আলোচনায় রয়েছে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের ঢাবি শাখার সভাপতি মেঘমল্লার বসু।থাকছে না বয়সের বাধা:সর্বশেষ ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০১৯ সালে। ২৮ বছর পর অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনে প্রার্থীর সর্বোচ্চ বয়স ছিল ৩০ বছর। তবে আসন্ন ডাকসু নির্বাচনে প্রার্থীর সর্বোচ্চ বয়সসীমা তুলে দেওয়া হয়েছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ণকালীন শিক্ষার্থী হলেই নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া যাবে।বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত মতে, এবারের নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না সান্ধ্যকালীন কোর্সের শিক্ষার্থীরা। ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনে ভোটার ও প্রার্থী হতে হলে শিক্ষার্থীকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ণকালীন শিক্ষার্থী হতে হবে, যিনি ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে স্নাতক প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়ে স্নাতক, স্নাতকোত্তর বা এমফিলে অধ্যয়নরত এবং কোনো আবাসিক হলে অবস্থানরত বা সংযুক্ত।এ ছাড়া সান্ধ্যকালীন কোর্সের পাশাপাশি পেশাদার বা এক্সিকিউটিভ মাস্টার্স, ডিপ্লোমা, সার্টিফিকেট ও ভাষা কোর্সে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরাও ভোটার বা প্রার্থী হওয়ার যোগ্য হবেন না। একইভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ও সংযুক্ত কলেজ বা ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীরা নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না।তা ছাড়া ছাত্রত্ব না থাকলে ডাকসু নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা। আইনি জটিলতা এড়াতে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে ডাকসু নির্বাচন আয়োজনে গঠিত নির্বাচন কমিশন।
ডাকসু নির্বাচনে সহসভাপতি (ভিপি), সাধারণ সম্পাদক (জিএস), সহসাধারণ সম্পাদকসহ (এজিএস) এবার মোট ২৮টি পদের বিপরীতে লড়বেন প্রার্থীরা। ছাত্রসংগঠনগুলোর দাবির মুখে এবার গবেষণা ও প্রকাশনা সম্পাদক; ক্যারিয়ার উন্নয়ন সম্পাদক; স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সম্পাদক এবং মানবাধিকার ও আইনবিষয়ক সম্পাদক নামে চারটি নতুন পদ তৈরি করা হয়েছে।