জনমনে এক আতঙ্কের নাম হয়ে উঠেছে কিশোর গ্যাং। সাম্প্রতিক সময়ে ডাকাতি, ছিনতাই, হত্যাসহ ভয়ংকর সব অপরাধে জড়িয়ে গেছে কিশোররা। যদি এমন প্রবণতা অব্যাহত থাকে, তাহলে বয়স বিবেচনায় অপরাধকে আলাদা করার আর কোনো সুযোগ থাকবে না কিংবা এখনই নেই বলা চলে। বগুড়ায় বিয়ের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় কিশোরীকে ছুরিকাঘাত এবং তাকে বাঁচাতে গিয়ে ওই কিশোরীর দাদি ও ভাবি নিহতের ঘটনা ঘটিয়েছে একটি কিশোর গ্যাং দ্বারা।ঢাকার মোহাম্মদপুরের আদাবরে এক ঘণ্টার ব্যবধানে দুটি খুন করেছে কিশোর গ্যাং। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতেই কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য রয়েছে কয়েক হাজার। শুধু রাজধানী নয়, দেশের প্রতিটি বড় শহর, জেলা ও থানায়, এমনকি গ্রামেও কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা রয়েছে। ঢাকায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ৪০ শতাংশ করে কিশোর গ্যাং সদস্যরা।সহজভাবে বলতে গেলে একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে কিশোর গ্যাং গড়ে ওঠে। কেননা জন্মগতভাবে কেউই অপরাধী হয়ে জন্মলাভ করে না। বংশগতির কোনো না কোনো প্রভাব তার শরীরে থাকতেও পারে, কিন্তু তা যে ব্যাপক নয়, তা গবেষণা দ্বারা প্রমাণিত। সমাজে আমরা স্বভাবতই ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশে বড় হই।ভিন্ন পরিবেশ, ভিন্ন সংস্কৃতি, ভিন্ন সামাজিকীকরণ, ভিন্ন মূল্যবোধ ও নৈতিকতার মধ্য দিয়ে আমাদের বেড়ে ওঠা। আর এর প্রতিটি আমরা পরিবার, পারিবারিক ও সামাজিক পরিমণ্ডল থেকে পেয়ে থাকি। কৃষ্টির প্রভাবে কোনো শিশুর ব্যক্তিত্ব হয়তো অপরাধীর ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিকাশ লাভ করতে পারে। পরিবেশ তার ওপর নানা ধরনের প্রভাব রাখে। চোরদের মধ্যে বড় হলে সেই পরিবেশের কারণেও কোনো শিশু চুরি করতে শিখতে পারে।কাজ করে উপার্জন করার সুযোগ পেলেও চুরি তার কাছে সহজ বিকল্প মনে হবে। আবার ভদ্র ঘরে জন্মগ্রহণ করেও অপরাধমূলক পরিবেশ ও প্রভাবে একটি শিশু ধীরে ধীরে অপরাধীতে পরিণত হতে পারে। সমাজের মধ্যে কিছু উপকৃষ্টীয় অঞ্চল থাকে। যে উপকৃষ্টীয় অঞ্চলে অপরাধমূলক ব্যবহারের প্রাধান্য রয়েছে, সেখানকার শিশু-কিশোরদের অপরাধী হওয়ার আশঙ্কা বেশি। দলে মিলে খারাপ হওয়ার যে প্রবাদটি আমাদের দেশে প্রচলিত, তা এ কারণে হতে পারে।একেক বয়সের শিশু ও কিশোরের চাহিদা একেক রকম। তাদের চাহিদা ও প্রয়োজন এবং তা পূরণের মাধ্যম উপযুক্ত ও মানানসই হওয়া উচিত। তাদের চাহিদা ও প্রয়োজন যেমন বস্তুগত, তেমনি অবস্তুগত। দুটিই পূরণ করতে হবে। মা-বাবার সামর্থ্য অনুযায়ী বস্তুগত চাহিদা পূরণের ব্যবস্থা করা উচিত। সন্তানদের মা-বাবার সামর্থ্য সম্পর্কে সচেতন থাকা উচিত। অবস্তুগত চাহিদা পূরণে কোনো অবহেলা করা ঠিক নয়। শিশু-কিশোরদের সুষ্ঠু সামাজিকীকরণ ও স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার পেছনে অবস্তুগত চাহিদা পূরণ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরিবার কর্তৃক বস্তুগত প্রয়োজন পূরণের অভাব এবং মা-বাবার দায়িত্বশীলতার মধ্যে নিজেদের নিয়োজিত করতে না পারার বর্থ্যতা অপরাধপ্রবণতার জন্য দায়ী । এর সঙ্গে যুক্ত আধুনিক জীবনধারণের মোহ এবং মাদকাসক্তি ও অন্যান্য সামাজিক সমস্যার ব্যাপক প্রভাব। যখন পারিবারিক পরিবেশে শিশু-কিশোররা মা-বাবার স্নেহ থেকে বঞ্চিত হয়, তখন বাইরের পরিবেশ তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকে। মা-বাবার স্নেহের বঞ্চনা শিশু-কিশোরদের মনে যে নিরাপত্তাহীনতার বোধ তৈরি করে, তার সুযোগ নেয় কোনো না কোনো কিশোর গ্যাং কিংবা বড় ভাইয়েরা। এ ধরনের গ্যাং কিংবা বড় ভাইদের সঙ্গে মিশে শিশু-কিশোররা খুঁজতে চেষ্টা করে তাদের নিরাপত্তা। নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে এমন সব আচরণ করে, যা অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। সমাজ থেকে তৈরি হওয়া কিশোর গ্যাং সমস্যা সমাধানের উপায়ও সমাজ থেকেই চিন্তা করতে হবে। শিশু-কিশোররা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড অনেক সময় বয়স্কদের দ্বারা শিখে থাকে। কাজেই বয়স্কদের অপরাধ ও অপরাধের নৃশংসতা যত বৃদ্ধি পাবে, কিশোরদের অপরাধও তত বৃদ্ধি পেতে থাকবে। কাজেই বয়স্কদের অপরাধপ্রবণতা কমানোর প্রতি আমাদের জোর দিতে হবে। শিশুদের চাহিদা ও প্রয়োজনের প্রতি প্রতিটি পরিবারকে জোর দিতে হবে। বস্তুগত চাহিদার তুলনায় অবস্তুগত চাহিদার প্রতি বেশি মনোযোগ দেওয়া আমাদের বেশি করণীয়। আমরা বেশির ভাগ সময়ে আমাদের অবহেলা ও অসচেতনতার জন্য এই চাহিদাগুলোকে পূরণ করি না এবং এই চাহিদাগুলো পূরণের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারি না। ফলে শিশু-কিশোররা অপূর্ণ চাহিদা ও প্রয়োজন নিয়ে বেড়ে ওঠে। আমাদের দরকার পর্যাপ্ত খেলার মাঠ, পর্যাপ্ত সুস্থ বিনোদন এবং পরিবারের সদস্যদের মধ্যকার আন্তঃসম্পর্ক ও পারস্পরিক মেলামেশার পর্যাপ্ত সুযোগ। অবসর সময় কাটানোর জন্য দরকার একটি সুন্দর পরিবেশ, যে পরিবেশটি হবে বিনোদন, গঠনমূলক, আনন্দদায়ক ও শিক্ষণীয়; যেখানে শিশু-কিশোররা চিন্তা করার সুযোগ পাবে। তাদের মধ্যে কোনো বিষয় চিন্তার খোরাক জোগাবে।শুধু তা-ই নয়, শৈশব থেকেই নেতৃত্বের গুণাবলি বিকশিত হওয়ার সুযোগ দিতে হবে। মা-বাবার দায়িত্ব সন্তানদের নিয়মিত অনুসরণ এবং পর্যাপ্ত পর্যবেক্ষণ করা। কোথায় যায়, কী করে এবং কাদের সঙ্গে ওঠাবসা—এসবের খোঁজ রাখতে হবে। সন্তানদের কথাবার্তা, চালচলন, আচার-ব্যবহার বিশেষভাবে খেয়াল করতে হবে। কেননা বাইরের জগৎ এখন বিশাল এবং ব্যাপক। অনেক কিছুই এখন সহজলভ্য। যেকোনো খারাপ কাজে যুক্ত হওয়া অনেক সহজ। সার্বক্ষণিক নজরদারি এবং পর্যবেক্ষণ আমাদের শিশু-কিশোরদের সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারে। তাদের মধ্যে অপরাধমূলক সংঘবদ্ধতা রোধ করতে পারে।