গত বছর জুলাইয়ে ছাত্র আন্দোলন শুরুর পর সহিংসতা ও মৃত্যুর ঘটনায় জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তর সরব ছিল। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন।
বাংলাদেশে মিশন খুলতে যাচ্ছে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তর (ওএইচসিএইচআর)। এ লক্ষ্যে গত সপ্তাহে ওএইচসিএইচআরের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করেছে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। গতকাল শুক্রবার জেনেভায় ওএইচসিএইচআরের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মানবাধিকারের প্রচার ও সুরক্ষায় সহায়তা করার লক্ষ্যে বাংলাদেশে একটি মিশন খোলার জন্য তিন বছর মেয়াদি একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে দুই পক্ষ।
বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম এবং জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তরের পক্ষে মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক এই সমঝোতা স্মারকে সই করেছেন।
ওএইচসিএইচআর জানায়, গত বছরের আগস্ট থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে জাতিসংঘের মানবাধিকার অফিসের সম্পৃক্ততা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। মানবাধিকার সংস্কারকে এগিয়ে নিতে এবং গণবিক্ষোভের মারাত্মক দমন-পীড়নের বিষয়ে একটি বিস্তৃত তথ্য অনুসন্ধান তদন্ত পরিচালনা করার জন্য মানবাধিকার বিষয়ক দপ্তর বিভিন্ন অংশীদারের সঙ্গে কাজ করে আসছে।
ভলকার তুর্ক বলেন, ‘এই স্মারক স্বাক্ষরের মাধ্যমে দেশের মানবাধিকারের প্রতি অঙ্গীকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা পাঠানো হয়েছে, যা পরিবর্তনের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।
’ তিনি বলেন, ‘এটি আমার দপ্তরকে আমাদের তথ্য অনুসন্ধান প্রতিবেদনে প্রদত্ত সুপারিশ বাস্তবায়নে আরো ভালোভাবে সহায়তা করতে সক্ষম করবে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশ যে মৌলিক সংস্কারগুলো ভবিষ্যতে গ্রহণ করতে যাচ্ছে, সেগুলোতে আমাদের দক্ষতা এবং সহায়তার মাধ্যমে সরকার, নাগরিক সমাজ এবং অন্যদের সঙ্গে সরাসরি মাঠ পর্যায়ে জড়িত হতে সক্ষম করে তুলবে।’
ওএইচসিএইচআর জানায়, নতুন মিশনটি দেশের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার প্রতিশ্রুতি পূরণের লক্ষ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষকে প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করবে। এর পাশাপাশি সরকারি প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সমাজের কর্মীদের জন্য সক্ষমতা বৃদ্ধির কাজ করবে।
গত বছর জুলাইয়ে ছাত্র আন্দোলন শুরুর পর সহিংসতা ও মৃত্যুর ঘটনায় জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তর সরব ছিল। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ গত ১৪ জুলাই এক বিবৃতিতে ঢাকায় জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের মিশন স্থাপনের অনুমোদন দেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরকারকে সরে আসার আহবান জানিয়েছিল। দলটির যুক্তি, এই মিশন স্থাপনের কোনো ইতিবাচক দিক নেই। এই মিশন খোলার অনুমতি দেওয়া দেশের জন্য দীর্ঘ মেয়াদে বিপদ ডেকে আনবে।
তবে মানবাধিকার মিশন খোলার পক্ষেও আছেন সাবেক রাষ্ট্রদূতদের অনেকে। তাঁদের মতে, মানবাধিকার লঙ্ঘনের ইচ্ছা না থাকলে ভয় পাওয়ার কারণ নেই।
জানা গেছে, মিশন খোলার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সরকারের বিভিন্ন অংশীজনের মধ্যে এ বিষয়ে পক্ষে-বিপক্ষে নানা মত এসেছে। বিশেষ করে এগুলো ভবিষ্যতে বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও স্বার্থের বিরুদ্ধে ব্যবহার হতে পারে এমন আশঙ্কাও করেছেন অনেকে। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তরের মিশন বাংলাদেশ পরিস্থিতি আরো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারবে। তবে জাতিসংঘ মানবাধিকারকে স্থানীয় দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে বড় পরিসরে বিবেচনা করে। সমকামী অধিকারের মতো ইস্যুকে মানবাধিকার হিসেবে গণ্য করে জাতিসংঘ। এ নিয়ে বাংলাদেশে সামাজিক ও ধর্মীয় সংবেদনশীলতা আছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তর গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, আটক অবস্থায় নির্যাতন ও মৃত্যু, বৈষম্য, সমকামীদের অধিকারসহ সব ধরনের অধিকার নিয়ে কাজ করে। মিশন খোলার পর মানবাধিকার ইস্যুতে তারা সরকারের সঙ্গে দেনদরবার করে। এ ছাড়া নিয়মিত মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, অপরাধের শিকার ব্যক্তি, সরকার, নাগরিক সমাজসহ অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা ও কারিগরি সহায়তা দিয়ে থাকে মানবাধিকার দপ্তর।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, আগামী দিনে যে সরকারগুলো আসবে তারাই সবচেয়ে চাপে থাকবে। বর্তমানে জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তর ও নিউইয়র্কে মানবাধিকার অফিসের বাইরে মানবাধিকারবিষয়ক অফিস/মিশন আছে মাত্র ১৬টি দেশে। দেশগুলো হলো বুরকিনা ফাসো, কম্বোডিয়া, চাদ, কলম্বিয়া, গুয়াতেমালা, গিনি, হন্ডুরাস, লাইবেরিয়া, মৌরিতানিয়া, মেক্সিকো, নাইজার, ফিলিস্তিন, সিরিয়া, সুদান, তিউনিশিয়া ও ইয়েমেন। এর বাইরে উত্তর কোরিয়ার পরিস্থিতি নজরদারির জন্য দক্ষিণ কোরিয়ায় একটি এবং মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য ইউক্রেনে একটি কার্যক্রম রয়েছে। ওই দেশগুলোর পরিস্থিতি বাংলাদেশের চেয়ে নাজুক। গত প্রায় দেড় দশক ধরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এবং সর্বশেষ গত বছরের আগস্টে অভ্যুত্থানের পটভূমিতে অন্তর্বর্তী সরকার বাংলাদেশেও জাতিসংঘের মানবাধিকার অফিস খোলার অনুমতি দিল।
জাতিসংঘ বাংলাদেশ ছাড়াও ৪৩টি দেশে মানবাধিকার কার্যালয়/মিশন খুলতে চায়। এই দেশগুলো পশ্চিমা বলয়ের নয়। মানবাধিকার অফিস/মিশন খোলার জন্য জাতিসংঘকে অর্থায়ন করবে পশ্চিমা দেশগুলো। স্বাগতিক দেশকে মিশনের কর্মীদের দায়মুক্তিসহ সুরক্ষা দিতে হবে।