সম্প্রতি প্রকাশিত এসএসসি ও সমমানের ফলাফলের পর শিক্ষার্থীদের মধ্যে যেমন আনন্দের ঢেউ লেগেছে, তেমনি একাদশে ভর্তির দুশ্চিন্তাও ক্রমেই বাড়ছে। দেশের কলেজগুলোতে আসনসংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি থাকা সত্ত্বেও মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বল্পতার কারণে প্রতিবছরই তীব্র ভর্তিযুদ্ধ দেখা যায়। কালের কণ্ঠে প্রকাশিত প্রতিবেদন এই বাস্তবতাকেই তুলে ধরেছে, যেখানে বিপুলসংখ্যক জিপিএ ৫ পাওয়া শিক্ষার্থী পছন্দের কলেজে ভর্তির জন্য কঠিন প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হবে।আন্ত শিক্ষা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, দেশে সাধারণ কলেজ, মাদরাসা ও কারিগরি প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে ৯ হাজার ৩১৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ২৭ লাখ ৬৮ হাজার ৩৪২টি আসন রয়েছে।অথচ এবার এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাস করেছে মাত্র ১৩ লাখ তিন হাজার ৪২৬ জন শিক্ষার্থী। এই হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ১৪ লাখ ৬৪ হাজার ৯১৬টি আসন খালি থাকবে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি। কিন্তু সমস্যাটি মোট আসনসংখ্যায় নয়, বরং মানের দিক থেকে। দেশের হাতে গোনা ৩০০টি নামি-দামি কলেজেই জিপিএ ৫ ও ৪ পাওয়া প্রায় ছয় লাখ শিক্ষার্থী ভর্তির চেষ্টা করবে, যা এক প্রবল প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করবে।রাজধানীর শীর্ষস্থানীয় কলেজগুলোতে আসনসংখ্যা সীমিত; যেমন—ঢাকা কলেজে এক হাজার ২০০টি, নটর ডেম কলেজে তিন হাজার ২৭০টি এবং ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে দুই হাজার ৩৭৬টি। এ ছাড়া স্কুল সংযুক্ত কলেজগুলোতেও তাদের নিজস্ব স্কুল থেকে পাস করা শিক্ষার্থীরা অগ্রাধিকার পায়। ফলে বাইরের শিক্ষার্থীদের জন্য সুযোগ আরো কমে আসে। এই পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আঞ্চলিক বণ্টন এবং সংখ্যায় গুরুতর ভারসাম্যহীনতা রয়েছে।শিক্ষা মন্ত্রণালয় অনলাইনে মেধার ভিত্তিতে শিক্ষার্থী ভর্তির কথা বললেও সব শিক্ষার্থী পছন্দের কলেজে ভর্তি হতে পারবে না। এই পরিস্থিতি শুধু শিক্ষার্থীদের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে না, বরং শিক্ষার গুণগত মান নিয়েও প্রশ্ন তুলছে। যদি দেশের বেশির ভাগ কলেজ মানসম্মত শিক্ষা প্রদানে ব্যর্থ হয়, তাহলে শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ উচ্চশিক্ষায় ভালো ফল করতে বা ভবিষ্যতে কর্মজীবনে সফল হতে বাধাগ্রস্ত হবে।এই সমস্যার সমাধানে সারা দেশে মানসম্মত কলেজ তৈরি এবং বিদ্যমান কলেজগুলোর শিক্ষার মানোন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। অঞ্চলভিত্তিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মানোন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে এবং শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও গবেষণার সুযোগ প্রসারিত করতে হবে।শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব আরো স্পষ্ট। শুধু ভর্তি নীতিমালা প্রণয়ন নয়, প্রয়োজন মানসম্পন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিস্তারে পরিকল্পিত বিনিয়োগ ও কার্যকর নজরদারি। জেলার কলেজগুলোকে কেন্দ্র করে মানোন্নয়ন উদ্যোগ গ্রহণ না করলে প্রতিবছরই ভর্তিযুদ্ধ হবে আরো তীব্র আর শিক্ষার সমতা থেকে পিছিয়ে পড়বে বেশির ভাগ শিক্ষার্থী।