সাত বছর আগে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ-অসাংবিধানিক ঘোষণা করে তা বাতিল করেছিলেন আপিল বিভাগ। পরে এই রায় পুনর্বিবেচনা (রিভিউ) করতে আবেদন করেছিল রাষ্ট্রপক্ষ। গত বছর ২০ অক্টোবর সেই আবেদন পর্যবেক্ষণসহ নিষ্পত্তি করে রায় দেন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন ছয় বিচারপতির আপিল বেঞ্চ। এতে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগ তদন্ত ও অপসারণ সংক্রান্ত সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ই বহাল থাকে।
বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী তাঁর পর্যবেক্ষণে বলেছেন, “বিচার বিভাগের স্বাধীনতা হচ্ছে আইনের শাসনের ‘অপরিহার্য শর্ত’, যা গণতান্ত্রিক সমাজের ভিত্তি গড়ে তোলে।
এই বিচারপতির পর্যবেক্ষণে আরো বলা হয়েছে, “বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে সংসদের হাতে ন্যস্ত করতে এটি (ষোড়শ সংশোধনী) ছিল একটি স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী সরকারের প্রচেষ্টা।
বিচারপতি মো. জিয়াউল করিম পর্যবেক্ষণে বলেছেন, ষোড়শ সংশোধনী ছিল একটি ছদ্মবেশী আইন। এটি রাষ্ট্রের তিন অঙ্গের (নির্বাহী বিভাগ, আইনসভা ও বিচার বিভাগ) ক্ষমতা পৃথক্করণ নীতি এবং বিভাগের স্বাধীনতা লঙ্ঘন করে। ফলে ষোড়শ সংশাধনী সংবিধান পরিপন্থী।
বিচারপতি মো. রেজাউল হকের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ‘সংবিধানের অধীনে পরস্পরিক শ্রদ্ধা, মর্যাদা, ক্ষমতা, কর্তৃত্ব ও আস্থা সমুন্নত রেখে রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও ন্যায্যতার নিশ্চয়তা নিশ্চিত করা জরুরি। বিচারকরা যদি নিজেদেরই রক্ষা করতে না পারেন, তাহলে তাঁরা কিভাবে সেই বিচারপ্রার্থীদের স্বার্থ রক্ষা করবেন? যদি সংসদের মাধ্যমে বিচারকদের চাকরি হারানোর ভয় থাকে, তাহলে তাঁরা কিভাবে ন্যায্য ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করবেন? বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বলতে এমনটা বোঝায় না যে একজন বিচারক তাঁর কাজকর্মের দায় থেকে মুক্ত থাকবেন। জবাবদিহি ছাড়া বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিষ্ফল হতে পারে।’
এই বিচারপতির পর্যবেক্ষণে আরো বলা হয়েছে, ‘সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গই সমান গুরুত্বপূর্ণ। এর কোনোটি অন্যটির অধীন নয়। কিন্তু ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে বিচার বিভাগকে অন্যান্য অঙ্গের অধীন করা হয়েছিল, যা কার্যত অসাংবিধানিক ও অগ্রহণযোগ্য।’
বিচারপতি এস এম এমদাদুল হকের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ‘সংবিধান কর্তৃক প্রদত্ত আইনের শাসন সমুন্নত রাখার জন্য বিচার বিভাগীয় স্বাধীনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে জবাবদিহি ছাড়া বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচার সমুন্নত রাখা যায় না।’
সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে ফিরিয়ে নিতে ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদ সংশোধনের প্রস্তাব সংসদে পাস হয়, যা ষোড়শ সংশোধনী হিসেবে পরিচিত। পরে সুপ্রিম কোর্টের ৯ জন আইনজীবীর রিট আবেদনে হাইকোর্ট ২০১৬ সালের ৫ মে এই সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করেন। পরে আপিল বিভাগও এই রায় বহাল রাখেন। সর্বশেষ গত বছর ২০ অক্টোবর এই মামলার রিভিউ আবেদনে রায় দেন সর্বোচ্চ আদালত। এর মধ্য দিয়ে ১০ বছর পর সংবিধানে ফিরে আসে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল সংক্রান্ত ৯৬ অনুচ্ছেদের ছয়টি উপ-অনুচ্ছেদ। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে সক্রিয় হয় সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল। এরপর অসদাচরণের অভিযোগে হাইকোর্টের দুই বিচারককে অপসারণ করা হয়।