সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১০:২২ পূর্বাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তার লাশ উদ্ধার, মৃত্যু ঘিরে প্রশ্ন

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৫ বার পড়া হয়েছে

ঢাকার তুরাগ নদ থেকে বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির (২৮) লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। গত বুধবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে টঙ্গী নৌ পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা তুরাগ নদের রাজাবাড়ি ঘাটসংলগ্ন নদ থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করেন।

তাহসিফের মরদেহ উদ্ধারের খবর গতকাল বৃহস্পতিবার সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচিত ছিল। গত জুলাইয়ে এক পডকাস্টে দেওয়া তাঁর বক্তব্যের ভিডিও অনেকে শেয়ার করেন। তাতে তিনি ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কুর্মিটোলা বিমানবন্দর থেকে উড়োজাহাজে করে দেশত্যাগের ভিডিওসহ নানা বিষয়ে প্রশ্নের জবাব দেন।

এর আগে একটি পত্রিকায় এক প্রতিবেদনে তাহসিফের প্রসঙ্গ আসে। তাতে বলা হয়েছে, তিনি শেখ হাসিনার দেশ ত্যাগের ভিডিওটি প্রচার করেছেন। বিদেশি একটি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যারা সংশ্লিষ্ট ছিল, সেখানেও তাঁর (তাহসিফ) নাম আছে।

ওই সময় আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) এক প্রতিবাদলিপিতে বলেছিল, প্রতিবেদনে তাহসিফসহ দুই কর্মকর্তাকে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর কথা বলা হয়েছে। বাস্তবে এ দুই কর্মকর্তাকে ভিন্ন প্রেক্ষাপটে বিমানবাহিনীর প্রচলিত আইন ও বিধিমালার আওতায় যথাযথ প্রক্রিয়ায় অবসরে পাঠানো হয়েছে। যার সঙ্গে ওই অভিযোগের কোনো সম্পর্ক নেই।

তাহসিফকে ২০২৪ সালে বিমানবাহিনী থেকে অবসরে পাঠানো হয়। পডকাস্টে তাহসিফ তাঁর অবসর, শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিওসহ বিভিন্ন বিষয়ে খোলামেলা কথা বলেন।

তাহসিফের বাবা এনায়েতুল করিম গতকাল মর্গের সামনে সাংবাদিকদের বলেন, “আমার ছেলের আত্মহত্যার তো প্রশ্নই আসে না। সে অত্যন্ত ‘প্লেজেন্ট পার্সোনালিটি’র একজন মানুষ। একজন কমিশন্ড অফিসারকে তো অনেক কষ্ট করে এটা অর্জন করতে হয়। তাকে হত্যা করা হয়েছে। তাকে নিয়ে নদীতে ফেলে দিয়েছে বলে আমি সাসপেক্ট (সন্দেহ) করি।”

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ মর্গে লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। এরপর মরদেহ তাঁর বাবার কাছে দেওয়া হয়।

নৌ পুলিশের প্রাথমিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাহসিফের হাতে হাতঘড়ি ও পকেটে একটি আইফোন পাওয়া গেছে। সেই ফোনের মাধ্যমেই তাঁর পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে।

সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ময়নাতদন্তের পর গতকাল বিকেল ৪টার দিকে তাহসিফের লাশ উত্তরায় তাঁর বাসায় নেওয়া হয়। এ সময় স্বজনরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। স্থানীয় মসজিদে জানাজা শেষে সন্ধ্যায় উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টরের কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।

দুই হাত মাথার সামনে বাঁকানো, মুষ্টিবদ্ধ

তাহসিফের লাশ উদ্ধারের পর পুলিশ সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে। এতে বলা হয়, তাঁর দুই হাত মাথার সামনে বাঁকানো ও মুষ্টিবদ্ধ অবস্থায় ছিল। নাক দিয়ে রক্ত বের হয়েছে। পেট ফোলা ছিল। শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। উদ্ধারের সময় তাঁর পরনে কালো রঙের ফুলহাতা কাবলি শার্ট ও সাদা রঙের ট্রাউজার ছিল।

যেভাবে বাসা থেকে বের হলেন

পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তাহসিফ উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের একটি ফ্ল্যাটে থাকতেন। স্বজনরা জানান, মঙ্গলবার সন্ধ্যার পর বয়সে তাঁর চেয়ে ছোট তবে বন্ধুস্থানীয় আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপ নামে একজন বাসার নিচে এসে তাহসিফকে ডাকেন। তাহসিফ তাঁর মাকে জানান, দীপের সঙ্গে কথা বলে বাসায় ফিরে আসবেন। তবে বাসার সিসিটিভির ফুটেজে দেখা গেছে, তাহসিফ মোটরসাইকেল নিয়ে বাসা থেকে বের হচ্ছেন। দীপ ছিলেন আলাদা মোটরসাইকেলে।

রাতে ছেলের বাসায় ফিরতে দেরি হওয়ায় মা একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। কিন্তু তাঁকে পাননি। রাত ১টা ৩৫ মিনিটের দিকে মায়ের মোবাইল ফোনে একটি বার্তা আসে। তাতে বলা হয়, ‘মা, আসছি’। কিন্তু তিনি আর ফেরেননি।

তবে তাহসিফের এক নিকটাত্মীয় সমকালকে বলেন, সবশেষ পাঠানো ভয়েজ মেসেজটি তাঁর কাছে তাহসিফের বলে মনে হয়নি। তাহসিফের বাবা বলেছেন, ভয়েজ মেসেজটি শুনে ছেলেকে ব্যস্ত মনে হয়েছিল তাঁর।

রাতে রেস্তোরাঁয় খেয়েছেন 

যার ডাকে বাসা থেকে বের হয়েছেন, তাহসিফের বন্ধুস্থানীয় সেই আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপ বলেন, বাসা থেকে বের হওয়ার পর তাহসিফের মোটরসাইকেল মেরামতের জন্য গ্যারেজে যান তারা। সেখান থেকে উত্তরার একটি রেস্তোরাঁয় রাতের খাবার খান। এরপর দুজন নিজ নিজ মোটরসাইকেলে ফিরছিলেন। উত্তরা হাউস বিল্ডিং এলাকা পর্যন্ত একসঙ্গে ছিলেন। তিনি জানান, রাত আনুমানিক ১২টার দিকে দুজন আলাদা হয়ে যান। এরপর তিনি (দীপ) নিজ বাসায় ফেরেন। তাহসিফের বিষয়ে আর কিছু জানেন না।

দীপ একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য স্নাতক সম্পন্ন করেছেন। তাঁর বাসা রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল এলাকায়।

নদে ভাসছিল মরদেহ

টঙ্গী নৌ পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন সমকালকে জানান, ৯৯৯-এ খবর পেয়ে আনুমানিক ২৮ বছর বয়সী একজনের মরদেহ উদ্ধার করেন তারা। পরে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। এরপর তাঁর পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে।

টঙ্গীর তুরাগ নদের রাজাবাড়ি খেয়াঘাটে কাজ করেন খোকন মিয়া। মরদেহটি উদ্ধারের সময়ের বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, ‘মঙ্গলবার দুপুরে হঠাৎ দেখি, একটা মানুষ ভেসে আসছে। কিছু সময়ের মাঝেই লাশটি আমার সামনে দিয়ে যায়। খেয়াঘাটের পূর্ব পাশে চারটি স্পিডবোট ও একটি নৌকা বাঁধা ছিল। ঠিক সেখানে প্রথম যে সাদা স্পিডবোট ছিল, সেটাতে লাশটি আাটকে যায়। তখন দুপুর ২টা। কয়েক ঘণ্টা আটকে ছিল। পরে খবর পেয়ে পুলিশ এসে লাশটি উদ্ধার করে।’

নৌ পুলিশপ্রধান অতিরিক্ত আইজিপি রেজাউল করিম সমকালকে বলেন, ‘লাশ উদ্ধারের পরপরই আমরা তদন্ত শুরু করেছি। তাঁর মোটরসাইকেলটি কোথায় আছে, সেটি উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। মোবাইল ফোনের সূত্র ধরে নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে অবস্থান জানারও কাজ চলছে।’ তিনি জানান, পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করা হবে।

গতকাল রাজশাহীতে এক অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, ‘বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা তাহসিফের লাশের ময়নাতদন্ত ছাড়া মন্তব্য করা যাবে না। আমরা সব বিষয়ে জেনে তারপর মন্তব্য করব।’
ঢাকা মহানগর অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম সমকালকে বলেন, এ ঘটনার মূল তদন্ত নৌ পুলিশ করবে।

বাসায় গিয়ে যা দেখা গেল 

রাজধানীর উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরের ‘এ’ ব্লকের একটি ভবনে পরিবারের সঙ্গে থাকতেন তাহসিফ। চার বছর ধরে মা-বাবাসহ তিন ভাইবোন বাসাটিতে ভাড়া থাকেন। তাদের গ্রামের বাড়ি খুলনার সোনাডাঙ্গায়। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে সবার বড় তিনি। তিনি অবিবাহিত ছিলেন। ছোট বোন বেসরকারি একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ শেষ করেছেন। ছোট ভাই পড়েন একাদশ শ্রেণিতে।‎

গতকাল দুপুরে সরেজমিন দেখা যায়, ১৪ তলা ভবনের সিঁড়ি দিয়ে তৃতীয় তলায় উঠতে বাঁ পাশে তাহসিফদের ফ্ল্যাট। বাসার ভেতরে স্বজনের ভিড়। তাহসিফের বাবা ছেলের লাশ নিতে হাসপাতালে ছিলেন।

তিন কক্ষের বাসার ভেতরের কক্ষে নারীরা নিহত তাহসিফের মা হোসনে আরা বীথিসহ পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দিচ্ছেন। তাহসিফের ফুফা এজাজ হোসেন সমকালকে বলেন, তাহসিফ একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি নিয়েছে। সেখানকার নিরাপত্তা-বিষয়ক কর্মকর্তা ছিল। তার সঙ্গে কারও কোনো বিরোধ ছিল না। কিন্তু কীভাবে নিহত হলো– এটাই রহস্য।

‘শঙ্কিত’ ছিলেন তাহসিফ 

তাহসিফ কিছু একটা নিয়ে শঙ্কিত ছিলেন বলে জানিয়েছেন তাঁর বাবা এনায়েতুল করিম। তাহসিফ কখনও কোনো হুমকি পেয়েছিলেন কিনা– সাংবাদিকরা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ওই রকম কিছু বলে নাই। তবে মাঝেমধ্যে আমাকে বলত, সে শঙ্কিত।’

এনায়েতুল করিম জানান, মঙ্গলবার দিনে মায়ের সঙ্গে কেনাকাটা করেছেন তাহসিফ। রাতে বাসায় না ফেরায় তাঁর (তাহসিফ) খোঁজ করতে থাকে পরিবার। বুধবার দুপুরে তুরাগ থানায় যান তিনি। তখন ছেলের বিষয়ে তাঁকে কিছু জানাতে পারেনি পুলিশ। বিকেল সোয়া ৫টার দিকে উত্তরখান থানা থেকে ফোন আসে। তাঁকে জানানো হয়, ছেলের লাশ পাওয়া গেছে।

এনায়েতুল করিম জানান, তুরাগের যেখান থেকে ছেলের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে, সেদিকে তাহসিফ কখনও যেতেন বলে তাদের ধারণা নেই।

তাহসিফের পরিবারের সদস্যরা সমকালকে জানান, বিমানবাহিনী থেকে চাকরি যাওয়ার পর তিনি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) ও নেত্র নিউজের সঙ্গে যুক্ত হন। সর্বশেষ একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা বিভাগে কাজ করছিলেন।
ছেলে সম্পর্কে এনায়েতুল করিম বলেন, ‘সে ছিল অত্যন্ত জেন্টেল প্রকৃতির ও সামাজিক। সিনিয়র-জুনিয়র সবার সঙ্গে তার ভালো সম্পর্ক ছিল।’ তিনি বলেন, ‘তদন্তের মাধ্যমে সরকার সত্য উদ্ঘাটন করে দোষীদের চিহ্নিত করতে পারবে– এটা আমি বিশ্বাস করি।’

মোটরসাইকেলের খোঁজে পুলিশ

দেড় মাস আগে মিরপুর ডিওএইচএস এলাকার পাশে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার শিকার হন তাহসিফ। এতে আহত হয়ে বেশ কয়েক দিন বাসায় ছিলেন। তখন বাসায় তিনি জানিয়েছিলেন, একটি গাড়ি তাঁর মোটরসাইকেলকে চাপা দিতে চেয়েছিল। বিষয়টিকে তখন গুরুত্ব না দিলেও তাঁর মৃত্যুর পর ঘটনাটি সন্দেহজনক মনে করছেন স্বজনরা। দুর্ঘটনার পর তাঁকে মোটরসাইকেল চালাতেও পরিবারের পক্ষ থেকে নিষেধ করা হয়।

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com