একদিকে সুনীল সাগর, অন্যদিকে বালিয়াড়ি। নিয়ম করে কখনও বড়, কখনও ছোট ঢেউ এসে ভিজিয়ে দিচ্ছে সাগরপারের বালুর বিছানা। সে দৃশ্য দেখতে দেখতেই যেন জলের সঙ্গে মিতালি গড়েছে নীল আকাশ। জনমানবহীন ফাঁকা সৈকতে কোথাও ফুটেছে সাগরলতার ফুল, কোথাও আবার দলে দলে চরে বেড়াচ্ছে রাজ্যের লাল কাঁকড়া। অন্য কারও সামান্য সাড়া পেলেই টুপ করে ঢুকে পড়ছে গর্তে। জনপদের হই-হল্লা নয়, বরং পরিবেশ এখানে মুখরিত গাঙচিল, চ্যাগা, বালিহাঁসসহ পরিযায়ী পাখির কোলাহলে। শীতের এই সময়ে শান্ত সমুদ্রের ধারে প্রকৃতি এমনই সুন্দর চর বিজয়ে।
পটুয়াখালীর কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত ঘুরতে যাওয়া পর্যটকের জন্য এতদিন বাড়তি আকর্ষণ ছিল পূর্ব-পশ্চিমের ঝাউবন, তিন নদীর মোহনা, লেবুর চর, গঙ্গামতির চরের মতো সুন্দর জায়গা। এর সঙ্গে এখন নতুন আকর্ষণ হিসেবে যুক্ত হয়েছে ‘চর বিজয়’। কুয়াকাটা সৈকত থেকে ৪০ কিলোমিটার পূর্বে গঙ্গামতি জঙ্গলের দক্ষিণ কোণে অবস্থিত এই চর ঘিরে তৈরি হয়েছে পর্যটনের নতুন সম্ভাবনা। ইতোমধ্যে কুয়াকাটা ঘুরতে আসা অনেক পর্যটক চর বিজয়ে গিয়ে সৌন্দর্য উপভোগ করছেন।
২০১৭ সালের ডিসেম্বরে একদল ভ্রমণপিপাসু অভিযাত্রী বঙ্গোপসাগরের তীরে জেগে ওঠা এই চরের কথা সবার নজরে আনেন। স্থানীয় জেলেদের কাছে যা ‘হাইরের চর’ নামে পরিচিত ছিল। ওই বছরই পটুয়াখালীর তৎকালীন জেলা প্রশাসক দ্বীপটির মালিকানা ঘোষণা করেন এবং সরকারের নির্দেশে উন্নয়নের কাজ শুরু হয়। যেহেতু বিজয়ের মাসে দ্বীপটি সবার নজরে এসেছে, তাই এর নামকরণ করা হয় ‘চর বিজয়’।
জানা গেছে, বর্ষার ছয় মাস পানিতে ডুবে থাকলেও শুষ্ক মৌসুমে এই দ্বীপ জেগে থাকে। তবে চলতি বছর বর্ষার সময়েও এই চরের কিছু অংশ জেগে ছিল। বর্তমানে বন বিভাগ এ দ্বীপের প্রায় ১০০ হেক্টর এলাকায় বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ নিয়েছে। এই চরে প্রথম পা রাখা ১৩ অভিযাত্রীর মধ্যে অন্যতম জল তরণী ট্যুরিজমের এমডি ও সাংবাদিক আরিফুর রহমান। তিনি জানান, ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে তারা এই চরে পা রাখেন। যদিও প্রথম এই চরের সন্ধান দেন জেলেরা।
আন্ধারমানিক ট্যুরিজমের এমডি কে এম বাচ্চু জানান, কুয়াকাটায় দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম চর বিজয়। আমরা পর্যটকদের বোটের মাধ্যমে এই চরে ট্যুর করিয়ে থাকি। তবে সবার আগে চরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য রক্ষায় তৎপর। বর্তমানে বর্ষায়ও এই চর জেগে থাকায় আমরা বেশি সাড়া পাচ্ছি।
ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব কুয়াকাটার প্রেসিডেন্ট রুমান ইমতিয়াজ তুষার বলেন, ‘চর বিজয় একটি অপার সম্ভাবনা। এখানে যদি আমরা আধুনিক মানের একটি পর্যটন কেন্দ্র করতে চাই, তাহলে একে আমাদের রক্ষা করতে হবে। সে জন্য সবার আগে দরকার চরের পরিবেশ রক্ষা। চর বিজয়কে পরিযায়ী পাখি, লাল কাঁকড়া ও কচ্ছপের অভয়াশ্রম হিসেবে তৈরি করতে আমরা পর্যটকদের সচেতন করছি।
পটুয়াখালী বন বিভাগের মহিপুর রেঞ্জ কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ বলেন, প্রতিবছর চর বিজয় বর্ষায় পানির নিচে তলিয়ে থাকার কারণে বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ নিয়েও সফল হতে পারিনি। তবে এ বছর চর জেগে থাকায় আমরা ইতোমধ্যে ৮০ হেক্টর জমিতে দুই লাখ ঝাউ ও ২০ হেক্টর জমিতে ৮০ হাজার কেওড়া গাছ লাগানোর উদ্যোগ নিয়েছি। এরই মধ্যে বেশ কিছু গাছ লাগানো হয়েছে। এটি আমাদের প্রাথমিক চেষ্টা। সফলতা পেলে আরও বড় পরিকল্পনা হাতে নেব।