ছয় দফা দাবিতে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের ঘোষিত লংমার্চ আগামীকাল। লংমার্চের ছয় দফা দাবির মধ্যে রয়েছেÑ গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ-তেল-গ্যাস ও সার সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধ করা।
এ লংমার্চ সফল করার লক্ষ্যে ১১ দলীয় ঐক্য ইতোমধ্যে যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। জামায়াত, এনসিপিসহ অন্যান্য দলগুলো নিজ নিজ অবস্থান থেকে লংমার্চ সফল করার লক্ষ্যে প্রচার প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে তারা মিটিং করেছে, প্রচার পত্র বিলি করে জনগণকে লংমার্চে অংশগ্রহণের আহবান জানিয়েছে।
আগামীকাল সকাল ৭টায় ঢাকার মতিঝিল শাপলা চত্বর থেকে চট্টগ্রাম লাল দিঘির ময়দান অভিমুখে ঘোষিত লংমার্র্চে পাঁচ থেকে ছয় হাজার গাড়ি থাকার কথা ছিল। তবে জ্বালানির সংকট ও মূল্যবৃদ্ধি এবং জনভোগান্তির বিষয়টি বিবেচনা করে তারা এখন গাড়ির সংখ্যা কমিয়ে এক হাজার করেছেন। জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, এই লংমার্চ কোনো দলের লংমার্চ নয়। এই লংমার্চ দেশের মানুষের দেয়া গণরায় বাস্তবায়নের দাবিতে। এই লংমার্চ দেশের মানুষের যে দুর্বিষহ জীবন তার অবসানের দাবিতে। মানুষ গ্যাস পাচ্ছে না, বিদ্যুৎ পাচ্ছে না, দ্রব্যমূল্যের কারণে মানুষের নাভিশ্বাস অবস্থা। মানুষের এসব দাবি আদায়ের লক্ষ্যে আমরা তাদের কাছে যাচ্ছি। আমরা আশা করি জনগণ এ লংমার্চে অংশগ্রহণ করবে তাদের দাবির কথা বলার জন্য।
লংমার্চ সফল করতে রাজধানীর কারওয়ানবাজার, তেজগাঁও ট্রাক স্ট্যান্ড ও সাতরাস্তা এলাকায় গতকাল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী উত্তর হাতিরঝিল অঞ্চল প্রচারপত্র বিতরণ করেছে। সকাল সাড়ে ১১টায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের সেক্রেটারি ড. মুহাম্মদ রেজাউল করিমের নেতৃত্বে এ প্রচারপত্র বিতরণ করা হয়। এসময় নেতৃবৃন্দ ব্যবসায়ী, শ্রমিক, পথচারীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মাঝে লংমার্চের কর্মসূচি ও ছয় দফা দাবির বিষয়ে প্রচারপত্র বিতরণ করেন।
এ সময় ঢাকা মহানগর উত্তর জামায়াতের সেক্রেটারি ড. মুহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন, সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর জনগণের সামনে কয়েকটি অগ্রাধিকারমূলক কর্মসূচির কথা বলেছিল। এর মধ্যে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী করা, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির প্রতিশ্রুতি ছিল। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে সরকার কাক্সিক্ষত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। তিনি বলেন, এই লংমার্চ কোনো দলের লংমার্চ নয়। এই লংমার্চ দেশের মানুষের গণরায় বাস্তবায়নের দাবিতে। সেই লক্ষ্যেই আমরা জনগণের কাছে যাচ্ছি এবং আমাদের প্রচারপত্র বিতরণ করছি।
৫ সেপ্টেম্বরের এ লংমার্চ সামনে রেখে গতকাল রাজধানীর বাংলামোটরে দলীয় অস্থায়ী কার্যালয়ে সমন্বয় সভা করে ১১ দলীয় ঐক্যের শরিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। সভা শেষে সংবাদ সম্মেলন করে লংমার্চ বিষয়ক বিভিন্ন সিদ্ধান্তের বিস্তারিত তুলে ধরেন দলটির শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা। সংবাদ সম্মেলনে গাড়ির সংখ্যা কমিয়ে আনার তথ্য জানানো হয়। একই সঙ্গে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বর থেকে চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দান পর্যন্ত অনুষ্ঠেয় এ লংমার্চে সরকার প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে এনসিপি। দলটির নেতারা বলেছেন, লংমার্চে কেউ বাধা দিলে যা পদক্ষেপ নেয়ার, তা জনগণই নেবে।
এনসিপির সদস্যসচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, জনভোগান্তি নিরসন ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের লক্ষ্য নিয়ে আমরা লংমার্চ করতে যাচ্ছি। ছয় মাসে সরকার না গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করেছে, না আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো আছে। এই সময়ে না বিদ্যুৎ-তেল-গ্যাস-সারের সরবরাহ ঠিক আছে, না জনগণের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসগুলোর দাম সরকার নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছে। তা ছাড়া সরকার অতীতের জুলুম-নির্যাতনের বিচারকে একটা ফলপ্রসূ জায়গায়ও নিতে পারেনি। সামগ্রিকভাবে সরকার জনবিচ্ছিন্ন একটা অবস্থায় পৌঁছে গেছে। জনগণের দাবি দাওয়া নিয়ে তাঁরা সংসদে কথা বললেও সরকারের পক্ষ থেকে সেগুলোকে গ্রাহ্য করার মতো মানসিকতা প্রদর্শন করা হয়নি। সব মিলিয়ে আমরা জনগণের এসব দাবি নিয়ে লংমার্চ করতে যাচ্ছি। আশা করি জনগণ আমাদের সাথে থাকবে।
যে পথে যাবে লংমার্চ, যেখানে যেখানে পথসভা
ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত লংমার্চ কোন পথে যাবে, কোথায় কোথায় পথসভা হবেÑ তার বিস্তারিত সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরেন এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। তিনি বলেন, এই লংমার্চ ৫ সেপ্টেম্বর সকাল সাতটায় শাপলা চত্বর থেকে শুরু হবে। এরই মধ্যে ১১ দলীয় ঐক্য পুলিশের মহাপরিদর্শককে (আইজিপি) চিঠি দিয়েছে, আলোচনা করেছে। আলোচনার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাঁরা সড়কের এক পাশ দিয়ে সারিবদ্ধভাবে যাবে। পুলিশ তাঁদের কিছু পরামর্শ দিয়েছে। সে অনুযায়ী কর্মসূচির ক্ষেত্রে কিছু সংযোজন-বিয়োজন করা হয়েছে। লংমার্চে পাঁচ-ছয় হাজার গাড়ি যাওয়ার প্রস্তুতি ছিল। তবে সেটা কমিয়ে এক হাজার করা হয়েছে।
সকাল সাতটায় ১১-দলীয় ঐক্যের সবাই বিশাল মিছিল নিয়ে শাপলা চত্বরে উপস্থিত হবেন। সাতটা থেকে আটটা পর্যন্ত শাপলা চত্বরে একটি পথসভা হবে। এখানে উদ্বোধনী বক্তব্য হবে। পাশাপাশি ১১ দলের শীর্ষ নেতারা বক্তব্য দেবেন। এরপর তাঁরা রওনা দেবেন। সকাল নয়টার দিকে চট্টগ্রাম রোডের সিদ্ধিরগঞ্জ ট্রাকস্ট্যান্ডে উপস্থিত হবেন। সেখানে পথসভা হবে, যেটা ঢাকা থেকে বের হওয়ার পর প্রথম পথসভা। কুমিল্লায় পৌঁছাবে দুপুর ১২টায়। কুমিল্লার নূরজাহান হোটেলের বিপরীতে থাকা খালি জায়গায় পথসভা করা হবে। সেখানে শীর্ষ নেতারা বক্তব্য দেবেন। সেখানে দুপুরের খাবারের বিরতিও হবে। কুমিল্লার পর বেলা তিনটায় পথসভা হবে ফেনীর মহিপালে। এরপর বিকেল পাঁচটায় পথসভা হবে মিরসরাইয়ে। সেখান থেকে লং মার্চ যাবে চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক লালদীঘি ময়দানে।
বিভাগ : জাতীয়