নগরায়ণ ও শিল্পায়নের কারণে দেশের খেলার মাঠ ও পার্কগুলো ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। এর নেতিবচাক প্রভাব পড়ছে বর্তমান প্রজন্মের শিশুদের ওপর। খেলার মাঠ না থাকায় শিশুদের শৈশব ম্লান হয়ে যাচ্ছে। খেলাধুলার সুযোগ না থাকায় তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। দেশে খেলার মাঠ উদ্ধার ও তৈরিতে সরকার বেশ কিছু পদক্ষেপ নিলেও, এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সম্পাদন সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। এ জন্য বেসরকারি উদ্যোগও প্রয়োজন।
গত ১৫ জুন গাজীপুর জেলা প্রশাসনের কার্যালয়ে ‘শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে পার্ক ও খেলার মাঠের ভূমিকা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বিশিষ্টজন এসব কথা বলেন। ‘দৈনিক সমকাল’ এবং বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ’ যৌথভাবে এর আয়োজন করে
শিল্পনগরীতে খেলাধুলা ও বিনোদনের জন্য আলাদা জায়গা রাখতে হবে।
সিটি করপোরেশন উন্নয়নের মাস্টারপ্ল্যানে খেলার মাঠ ও পার্কের জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
গ্রামের মাঠগুলোয় শিশুদের জন্য রাইডের ব্যবস্থা এবং শহরের স্কুলের মাঠগুলো শিশুদের জন্য উন্মুক্ত করতে হবে।
বেদখলকৃত সব স্থান, পার্ক এবং খেলার মাঠ দ্রুত দখলমুক্ত করার পর সেগুলো সংস্কার করে সবার জন্য উন্মুক্ত করতে হবে।
পার্ক এবং খেলার মাঠের নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে।
মেয়েদের জন্য পৃথক খেলার মাঠ ও পার্কের ব্যবস্থা করতে হবে।
নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার আগে খেলার মাঠ নিশ্চিত করতে হবে।
সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একজন ক্রীড়াবিষয়ক শিক্ষক নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
বাজেটে খেলার মাঠ ও পার্ক তৈরিতে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ করতে হবে।
জাহিদ আহসান রাসেল
অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং শিল্পায়নের কারণে শিশুরা মাঠে খেলাধুলা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
আমি যদি গাজীপুরকে ধরি; গাজীপুর ঢাকার পাশে হওয়ায় ঢাকার মধ্যকার যেসব ইন্ডাস্ট্রি তার বাইরে নিতে বলা হয়েছে, সবই অপরিকল্পিতভাবে এখানে স্থানান্তর করা হয়। যে যেখানে পেরেছে, এই জেলায় ফ্যাক্টরি নির্মাণ করেছে। এর কারণে খেলার মাঠ কমে গেছে। যেগুলো রয়েছে, তাতে খেলাধুলা করার সুযোগ থাকে না। গ্রামাঞ্চলে ছেলেমেয়েরা বাইরে খেলাধুলা করতে পারলেও, শহরে সে সুযোগ কম।
শিশুরা যাতে খেলাধুলা করতে পারে, সে লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে দেশের প্রতিটি উপজেলায় শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম নির্মাণ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে ১২৫টি স্টেডিয়ামের নির্মাণকাজ সমাপ্ত হয়েছে। চলতি অর্থবছরে এক হাজার ৬৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে আরও ১৮৬টি মিনি স্টেডিয়াম নির্মাণের কাজ চলমান। এ ছাড়া ১২৬টি স্টেডিয়াম নির্মাণে ডিপিপি প্রণয়নের কাজ চলমান। এ ছাড়া সরকারিভাবে ইউনিয়ন পর্যায়েও একটি খেলার মাঠ সংরক্ষণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এ মাঠগুলো হবে উন্মুক্ত। যে যখন ইচ্ছা, এসব মাঠে এসে খেলতে পারবে। সারাদেশে আমরা এ ধরনের এক হাজার মাঠ তৈরি করতে চাই।
যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় ২০১৮ সাল থেকে জাতির পিতার নামে ‘বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট’ অনূর্ধ্ব ১৭ এবং ২০১৯ সাল থেকে ‘বঙ্গমাতা গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট’ অনূর্ধ্ব ১৭ সফলভাবে আয়োজন করে চলেছে, যা কিশোরদের শারীরিক-মানসিক বিকাশে অনন্য ভূমিকা পালন করছে। ২০১০ সাল থেকে প্রতি বছর ‘বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ প্রাথমিক বিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্ট’ এবং ২০১১ সাল থেকে প্রতি বছর ‘বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব গোল্ডকাপ প্রাথমিক বিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্ট’-এর আয়োজন করা হচ্ছে। এ বছর থেকে বঙ্গবন্ধু আন্তঃকলেজ ফুটবল টুর্নামেন্ট চালু করা হয়েছে। ২০১৯ সাল থেকে দেশের সব সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে ‘বঙ্গবন্ধু আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় স্পোর্টস চ্যাম্পিয়নশিপ’-এর আয়োজন করছি। এ ছাড়া যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অধীন বঙ্গবন্ধু ক্রীড়াসেবী ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে প্রথমবারের মতো বঙ্গবন্ধু ক্রীড়া শিক্ষাবৃত্তি প্রবর্তনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
সরকারের একার পক্ষে কোনো কিছু সম্পূর্ণভাবে করা সম্ভব নয়। বেসরকারি সংস্থাগুলোকেও এগিয়ে আসতে হবে। বেসরকারি সংস্থাগুলো যদি বিনোদন পার্কগুলো তৈরি করে; সিটি করপোরেশনগুলো যদি এগিয়ে আসে, তাহলে কাজ অনেক সহজ হবে। সিটি করপোরেশন এলাকাগুলোয় সরকার শুধু বরাদ্দ দেয়। সিটি করপোরেশনই কাজগুলো বাস্তবায়ন করে। এ ছাড়া আমরা দেশের শত শত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ১২ কোটি টাকার ওপরে খেলাধুলার সামগ্রী দিচ্ছি। কেননা, শিশুদের সুন্দরভাবে বেড়ে উঠতে খেলার মাঠের বিকল্প নেই। একই সঙ্গে অভিভাবকদেরও এ বিষয়ে আন্তরিক হতে হবে। সন্তানদের মাঠে গিয়ে খেলাধুলায় উৎসাহিত করতে হবে।
মঞ্জু মারিয়া পালমা
দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে সিটি করপোরেশন এলাকায় শিশুদের জন্য সরকারি বিনোদন
পার্ক ও খেলাধুলার স্থান ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। এদিকটায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজর খুব বেশি আছে বলে মনে হয় না। ফলে সিটি এলাকার বস্তির শিশুরা খেলাধুলা এবং বিনোদনের সব সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত এবং তারা অলস সময় পার করছে। তারা যৌন হয়রানি, বিভিন্ন ডিভাইস ও মোবাইল ফোনে ব্যস্ত থাকছে। তারা শিশুশ্রম, অসামাজিক ও ঝুঁকিপূর্ণ কার্যকলাপে লিপ্ত। যার ফলে তাদের পরিপূর্ণ শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
২০১৯ সালে করা বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) এক জরিপমতে, ঢাকার দুটি সিটি করপোরেশনের আওতাধীন এলাকায় ২৩৫টি খেলার মাঠ রয়েছে (যেখানে প্রয়োজন ২,৪০০)। এর মধ্যে ১৪১টিই প্রাতিষ্ঠানিক। মাত্র ৪২টি খেলার মাঠ জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত। এর মধ্যে দখলে আছে ১৬টি; ১৭টি সরকারি মাঠ, ২৪টি আবাসিক কলোনি মাঠ এবং ১২টিতে ঈদ জামাত ও অন্যান্য ধর্মীয় অনুষ্ঠান হয়। বর্তমানে এ সংখ্যা আরও কমেছে; বলছে সংগঠনটি। সবচেয়ে উদ্বেগজনক, মেয়েদের জন্য পৃথক কোনো খেলার মাঠ নেই। তারা মাত্র ৭ শতাংশ মাঠে খেলতে পারে। রাজধানীতে উন্মুক্ত ২৪টি মাঠ রয়েছে। যার মধ্যে সিটি করপোরেশনের ১৮টি মাঠ (উত্তর সিটিতে ৬টি এবং দক্ষিণ সিটিতে ১২টি)। এর মধ্যেও কিছু খেলার মাঠ আবার সংস্কার করা হয়েছে। ফলে মাঠের সৌন্দর্য বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু সেসব মাঠে প্রবেশে সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। এদিকে ২০০০ সালের এক জরিপে দেখা যায়, তখন ঢাকা শহরে খেলার মাঠ ছিল ১৫০টি (যদিও ঢাকার মাঠ নিয়ে সরকারি কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি)। সংশোধিত ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) প্রণয়নের অংশ হিসেবে রাজউকের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ১২৯টি ওয়ার্ডের ৩৭টিতে কোনো খেলার মাঠ অথবা পার্ক নেই।
রাজধানীর মানুষকে স্বস্তি দিতে এবং জলবায়ুর অভিঘাত রুখতে উন্মুক্ত স্থান বাড়ানোর বিকল্প নেই। শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ তৈরি এবং সেখানে শিশুদের খেলার সুযোগ করে দিতে না পারলে তাদের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হবে। আরও বলা হচ্ছে, সব বয়সী মানুষের জন্যই দরকার পর্যাপ্ত খালি ও সবুজ স্থান। তাই গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রতিটি ওয়ার্ডে অন্তত একটি খেলার মাঠ তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া দরকার বলে আমরা মনে করি। যেখানেই সরকারি ফাঁকা স্থান পাওয়া যাবে, সেখানেই পার্ক বা খেলার মাঠ তৈরি করা খুবই প্রয়োজন।
সরকার ব্যাপক কার্যক্রম বাসস্তবায়ন করেছে। অনেক পার্ক করেছে; সারাদেশে মিনি স্টেডিয়াম করছে। বেসরকারি সামাজিক সংগঠনগুলো কি এ ক্ষেত্রে এগিয়ে আসছে? আর এলে তা কতটুকু? কতটি ফুটবল কিংবা ক্রিকেট ইভেন্ট হচ্ছে এলাকাভিত্তিক? সেখানে কতগুলো সংগঠন আছে; তাদের দাবিগুলা কতটা যৌক্তিক– এটা আমাদের ভেবে দেখার সুযোগ রয়েছে। এ ছাড়া পার্কগুলো বেসরকারিভাবে ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যেও গড়ে উঠতে পারে। সেখানে ৩০ বা ৫০ টাকা টিকিটের বিনিময়ে দর্শনার্থীদের প্রবেশের ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে।আবদুল হান্নান
ও মানসিক বিকাশে খেলার মাঠের বিকল্প নেই। বর্তমান সরকার প্রতিটি উপজেলায় মিনি স্টেডিয়াম তৈরি করে দিচ্ছে। সিটি করপোরেশনের প্রতিটি ওয়ার্ডেও খেলার মাঠের ব্যবস্থা সরকার করতে পারে। খেলার মাঠ তৈরির পাশাপাশি সেগুলোতে সবার প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে হবে।জামাল হোসেন
এর অংশ হিসেবে গাজীপুরেও খেলার মাঠ তৈরি হচ্ছে। আমি আশা করব, এই স্টেডিয়ামে পথশিশুরাও যেন খেলার সুযোগ পায়। ৫৬টি ওয়ার্ড নিয়ে গাজীপুর একটা বৃহৎ সিটি করপোরেশন। এ সিটি করপোরেশনের প্রতিটি ওয়ার্ডে যেন একটা খেলার মাঠ থাকে। এতে আমরা ভবিষ্যতে অনেক খেলোয়াড় পাব। পাশাপাশি মাদকমুক্ত পরিবেশও তৈরি হবে। সিটি করপোরেশন উদ্যোগ নিলে এটা করা সহজ হবে।