সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১০:৪১ পূর্বাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

জ্ঞান ও কর্মের মাওলানা ফজলুর রহিম আশরাফী (রহ.)

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: শনিবার, ২২ আগস্ট, ২০২৬
  • ১২ বার পড়া হয়েছে

উপমহাদেশের জ্ঞানচর্চা ও দ্বিনি ঐতিহ্য এমন সব মহৎ ব্যক্তিত্বে ভরপুর, যাঁরা তাঁদের নিষ্ঠা, প্রজ্ঞা ও নিরলস সাধনার মাধ্যমে সমাজের চিন্তা ও নৈতিক কাঠামো নির্মাণে অনন্য ভূমিকা রেখেছেন। মাওলানা ফজলুর রহিম আশরাফী (রহ.) তেমনই এক আলোকিত ব্যক্তিত্ব, যাঁর জীবন জ্ঞান ও কর্ম, দাওয়াত ও সংস্কার, শিক্ষা ও চরিত্র গঠনের এক অপূর্ব সমন্বয়।সময়ের স্রোত বয়ে যায়, মানুষ আসে-যায়; কিন্তু কিছু মানুষ তাঁদের কর্ম, চিন্তা ও অবদানের মাধ্যমে সময়কে অতিক্রম করে ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠেন। মাওলানা ফজলুর রহিম আশরাফী (রহ.) ছিলেন তেমনই এক বিরল ব্যক্তিত্ব, যিনি কেবল একজন আলেম নন, বরং একটি ধারার প্রতিনিধিত্বকারী, একটি ঐতিহ্যের ধারক এবং একটি আদর্শের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।

 

১৯৪৪ সালে অমৃতসরে জন্ম নেওয়া এই প্রখ্যাত আলিম এমন এক পারিবারিক পরিবেশে বেড়ে ওঠেন, যেখানে জ্ঞান, তাকওয়া ও দ্বিনি মূল্যবোধ ছিল জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁর পিতা মাওলানা মুফতি মুহাম্মদ হাসান অমৃতসরি (রহ.) ছিলেন একটি স্বনামধন্য দ্বিনি প্রতিষ্ঠান জামিয়া আশরাফিয়া, লাহোরের প্রতিষ্ঠাতা, যার প্রভাব তাঁর চিন্তা ও চরিত্র গঠনে গভীর ছাপ ফেলে।ফলে খুব অল্প বয়স থেকেই তিনি জ্ঞানার্জন ও আত্মগঠনের পথে অগ্রসর হন। মাওলানা আহমদ হাসান অমৃতসরি (রহ.) ছিলেন হাকিমুল উম্মত আল্লামা আশরাফ আলী থানভী (রহ.)-এর খলিফা।

 

মাওলানা আশরাফী প্রথাগত দারস-এ-নিজামী শিক্ষা সম্পন্ন করে হাদিস, তাফসির, ফিকহ ও ইসলামী দর্শনে উচ্চতর দক্ষতা অর্জন করেন। মাওলানা ফজলুর রহিমের জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল দিক ছিল তাঁর ইলমি গভীরতা।তিনি দীর্ঘদিন জামিয়া আশরাফিয়ার শায়খুল হাদিস হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। হাদিসশাস্ত্রে তাঁর পাণ্ডিত্য তাঁকে সমকালীন আলেমদের কাতারে একটি বিশেষ মর্যাদা এনে দেয়। কিন্তু তিনি শুধু একজন গবেষক বা মুহাদ্দিস হিসেবেই থেমে থাকেননি; বরং শিক্ষা, পরিচালনা ও নীতিনির্ধারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেও তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়। তিনি তাঁর সময়ের সমস্যাগুলো গভীরভাবে অনুধাবন করেছিলেন এবং প্রজ্ঞা ও ভারসাম্যের সঙ্গে সেগুলোর সমাধানও তুলে ধরেছিলেন।

 

তিনি দীর্ঘদিন প্রিন্সিপাল হিসেবে জমিয়া আশরাফিয়ার খিদমত আঞ্জাম দেন, যেখানে তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্বে শিক্ষাব্যবস্থা আরো সুসংগঠিত ও কার্যকর হয়ে ওঠে।পাশাপাশি পাকিস্তানের বৃহত্তম মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে তিনি হাজারো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। তাঁর এই ভূমিকা শুধু প্রশাসনিক ছিল না; বরং ছিল একটি বৃহৎ শিক্ষাব্যবস্থাকে সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়ার এক অবিরাম প্রচেষ্টা।

 

২০০১ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত তিনি পাঞ্জাব কোরআন শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কোরআনের নির্ভুল মুদ্রণ ও সংরক্ষণেও তাঁর অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়।

তবে তাঁর প্রকৃত শক্তি ছিল তাঁর ব্যক্তিত্ব, যেখানে ছিল সাদামাটা জীবনযাপন, গভীর চিন্তাশীলতা এবং মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা। তাঁর বক্তব্য ছিল সংযত, যুক্তিনির্ভর ও হৃদয়গ্রাহী। তিনি বিভাজন নয়, সংলাপকে প্রাধান্য দিতেন; কঠোরতা নয়, প্রজ্ঞা ও সহনশীলতাকে বেছে নিতেন।

দাওয়াত ও সমাজ সংস্কারের ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান ছিল অনন্য। তাঁর বক্তব্যে ছিল না কোনো কঠোরতা বা উগ্রতা; বরং ছিল কোমলতা, প্রজ্ঞা ও হৃদয়গ্রাহী আবেদন।

২০২৬ সালের ৪ জানুয়ারি তাঁর ইন্তেকাল শুধু একটি ব্যক্তির বিদায় নয়; বরং একটি যুগের অবসানের মতো। তবে তাঁর রেখে যাওয়া শিক্ষাধারা, চিন্তা ও মূল্যবোধ আজও আমাদের পথ দেখাতে সক্ষম। তাঁর জানাজা জামিয়া আশরাফিয়া প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে হাজারো আলেম, রাজনৈতিক নেতা ও সাধারণ মানুষ অংশগ্রহণ করেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফসহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি তাঁর ইলমি ও দ্বিনি অবদানের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

তাঁর সঙ্গে আমার কয়েকবার সাক্ষাতের সৌভাগ্য লাভ হয়। সর্বশেষ ২০২৫ সালে, আমার রাষ্ট্রীয় সফরে লাহোর গমনের সময়। জামিয়া আশরাফিয়া প্রাঙ্গণে তাঁর বাসভবনে গিয়ে তাঁকে দেখি বার্ধক্যের ভারে ন্যুব্জ। তিনি তখন আর কথা বলতে পারছিলেন না। কিন্তু তাঁর চোখ, ইশারা—সবই যেন ভাষার সীমা অতিক্রম করে কথা বলছিল। তিনি ইশারায় শুভেচ্ছা জানালেন, দোয়া করলেন এবং লিখিতভাবে আমাকে হাদিসের ইজাজত প্রদান করলেন। সেই মুহূর্তটি ছিল একই সঙ্গে আবেগময় ও গৌরবের, যেন একটি আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার নীরবে হস্তান্তরিত হলো।

মাওলানা ফজলুর রহিম আশরাফীর জীবন আমাদের শেখায় সত্যিকারের জ্ঞান শুধু অর্জনের বিষয় নয়; তা সমাজে প্রয়োগ ও মানবকল্যাণে নিবেদনের মধ্যেই তার পূর্ণতা। তাঁর ইলমি ঐতিহ্য ও খিদমত যুগ যুগ ধরে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com