বর্তমানে ৪৫ হাজার বন্দির ধারণক্ষমতার বিপরীতে কারাগারগুলোতে প্রায় ৯৮ হাজার বন্দি রয়েছেন। অতিরিক্ত বন্দির চাপে দুর্ধর্ষ আসামিদের আলাদা করে রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
এক প্রশ্নের জবাবে আইজি প্রিজনস বলেন, বর্তমানে ১২২ জন বন্দি কারাগারের বাইরে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ২০২৫ সালে কারাগারে ১৮৭ জন বন্দির মৃত্যু হয়েছে।চলতি বছর এখন পর্যন্ত ১২২ জন বন্দির মৃত্যু হয়েছে। একই সঙ্গে কারাগারগুলোতে চিকিৎসকের ঘাটতি রয়েছে বলেও জানান তিনি।
কারাগারে বন্দিরা মোবাইল ফোনে কথা বলছেন কি না জানতে চাইলে কারা মহাপরিদর্শক বলেন, বন্দিরা মোবাইলে কথা বলছেন না এমন শতভাগ নিশ্চয়তা দেওয়া সম্ভব নয়। তবে এ বিষয়ে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। তিনি বলেন, গত এক বছরে তিন হাজারের বেশি মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়েছে।সময়ের সঙ্গে কারাগারে মোবাইল ব্যবহারের ঘটনা কমে আসছে। আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, বর্তমানে দেশের কারাগারে ৩৭৯ জন বিদেশি বন্দি রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ১৭০ জনের সাজা শেষ হয়েছে। তবে নিজ দেশে ফেরার অপেক্ষায় থাকায় তাঁরা এখনো কারাগারে রয়েছেন। দূতাবাস ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে তাঁদের নিজ নিজ দেশে পাঠানোর বিষয়ে যোগাযোগ চলছে।
তিনি আরো জানান, বিদেশি বন্দি মারা গেলে তাঁদের মরদেহ সর্বোচ্চ তিন মাস পর্যন্ত সংরক্ষণ করা হয়। বর্তমানে তিনটি মরদেহ হিমাগারে সংরক্ষিত রয়েছে। কোনো পরিবার বা বিদেশি প্রতিনিধি মরদেহ নিতে না এলে ডিএনএ সংরক্ষণ করে বিধি অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হয়। গত দুই বছরে বিদেশি বন্দিদের প্রায় ১৭টি মরদেহের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে দুটি মরদেহ ভারতে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়েছে।
কারা মহাপরিদর্শক জানান, তিনি ২০২৪ সালের আগস্টে কারা বিভাগের দায়িত্ব নেন। এর পর কারাগারকে জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের লক্ষ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছেন। এর অংশ হিসেবে কারাগারের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হয়েছে। তিনি বলেন, দেশব্যাপী কারাগারগুলোকে কারা অধিদপ্তরের নিজস্ব ফাইবার নেটওয়ার্কের আওতায় আনা হয়েছে। ডিজিটাল অ্যাটেন্ডেন্স সিস্টেম ও টিম ট্র্যাকার চালুর ফলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতি ও কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ আরো কার্যকর হয়েছে।
তিনি বলেন, বন্দি ব্যবস্থাপনাকেও ডিজিটাইজেশনের আওতায় আনা হয়েছে। তথ্য-উপাত্তভিত্তিক বন্দি ব্যবস্থাপনার জন্য কম্প্রেহেনসিভ প্রিজনার ডেটা বেইস সমৃদ্ধ করা হয়েছে। বন্দিদের টেলিফোন কল ও সাক্ষাৎ ব্যবস্থাকে ডিজিটাইজেশনের আওতায় আনা হয়েছে। কারাগার থেকেই ভার্চুয়াল কোর্টের মাধ্যমে বন্দিদের বিচার কার্যক্রমে অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। এতে বন্দি ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার আরো বিস্তৃত হয়েছে। তিনি বলেন, কারা বিভাগের সংস্কার উদ্যোগের অংশ হিসেবে কারাগারের নিরাপত্তার পাশাপাশি বন্দিদের সংশোধন ও পুনর্বাসনের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন কারাগারে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ধর্মীয় শিক্ষা, কাউন্সেলিং ও অন্যান্য মানসিক উন্নয়নমূলক কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ সহজ করতে ভিডিও কলের ব্যবস্থাও চালু করা হয়েছে।
কারাগারে মাদকের ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স নীতির কথা জানিয়ে তিনি বলেন, মাদকের ক্ষেত্রে বন্দি কিংবা কর্মকর্তা-কর্মচারী কাউকেই ছাড় নয়। কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নন। মাদক সংশ্লিষ্টতার ক্ষেত্রে আইন ও বিধিবিধান অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। কারা সদর দপ্তরে মাদক টেস্টিং মেশিন সংগ্রহ করা হয়েছে, যা মাদকবিরোধী কার্যক্রমকে আরো কার্যকর করবে।
তিনি বলেন, বন্দিদের মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কেরানীগঞ্জে কেন্দ্রীয় কারা হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কারা সদর দপ্তরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মেডিক্যাল চেকআপের জন্য প্যাথলজি ল্যাব চালু করা হয়েছে। এ ছাড়া ৫৫ জন ডিপ্লোমা নার্সের সুপারিশ পাওয়া গেছে এবং তাঁদের পদায়নের মাধ্যমে কারাগারের স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা আরো বাড়বে। সম্প্রতি ৭৭টি অ্যাম্বুলেন্স টিঅ্যান্ডইভুক্ত করা হয়েছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন অ্যাম্বুলেন্স সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি আরো বলেন, কারাগারের মূল দর্শনকে আরো সংশোধন ও পুনর্বাসনমুখী করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ জেলের নাম পরিবর্তন করে ‘কাস্টডিয়াল অ্যান্ড কারেকশন সার্ভিস বাংলাদেশ’ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।