ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানে জোর ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে লাগাম টানাকেই এবারের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নিত্যপণ্যের উৎস কর, কৃষি খাতের সার-কীটনাশক ও বালাইনাশক, চিকিৎসা ও ওষুধ, শিশুখাদ্য, মসলা, মোবাইল ফোন, সিম কার্ড, ফ্রিজ-রেফ্রিজারেটর, কম্পিউটার, স্বর্ণালংকার, সৌরবিদ্যুৎ, বৈদ্যুতিক গাড়ি থেকে শুরু করে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া হয়েছে।
তবে ছাড়ের পাশাপাশি ব্যাপকভাবে বাড়ানো হয়েছে কর ও ভ্যাটের আওতা।
জীবনযাত্রার ব্যয়ে লাগাম টানার চেষ্টা করা হয়েছে বাজেটে। সাধারণ জনগণকে স্বস্তি দিতে ধান, চাল, গম, আলু, গবাদি পশু, হাঁস-মুরগি, মাছ, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনির মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে করছাড় দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসা খরচ কমাতে ওষুধের কাঁচামাল আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা, হার্টের রিং-চোখের ইন্ট্রাওকুলার লেন্স আমদানিতে ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
সাধারণত প্রতিবছর বাজেটে রাজস্ব আদায় বাড়াতে পণ্য ও সেবার করহার বাড়ানো হয়। এবারই তার ব্যতিক্রম। নতুন সরকার চায় করহার না বাড়িয়ে করজাল বাড়াতে। একই সঙ্গে জনগণকে স্বস্তি দিয়ে কর আদায় করতে।
কৃষিকাজে ব্যবহৃত জিংক সালফেট, ম্যাগনেসিয়াম সালফেটসহ পাঁচটি সারের ব্যবসা পর্যায়ে ভ্যাট সাড়ে সাত শতাংশ থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। কীটনাশক-বালাইনাশকের শুল্ক-কর প্রত্যাহার করা হচ্ছে। মূল্যস্ফীতি কমাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় ৬০টি পণ্যে করছাড় দেওয়া হয়েছে। যেমন—ধান, চাল, গম, আলু, গবাদি পশু, হাঁস-মুরগি, মাছ, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি, ভোজ্য তেল, বীজসহ বিভিন্ন পণ্যের ওপর উৎস করের হার পাঁচ, দুই ও এক শতাংশ থেকে কমিয়ে ০.৫০ শতাংশ করা হচ্ছে। ফলে দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতিতে নাভিশ্বাস থেকে স্বস্তি মিলবে।
স্বাস্থ্যসেবা খরচ কমাতে ওষুধ আমদানির উপকরণ, হার্টের রিং, কিডনি ডায়ালিসিসের উপকরণ আমদানিতে শুল্ক-কর ছাড় দেওয়া হয়েছে। হার্টের রিং-চোখের ইন্ট্রাওকুলার লেন্স সরবরাহে ১০ শতাংশ ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। কিডনি রোগীদের চিকিৎসার ব্লাড টিউব সেট আমদানিতে আগাম কর প্রত্যাহার, ক্যান্সারের ওষুধ তৈরির ৯টি উপকরণ আমদানিতে শুল্ক ও ভ্যাট প্রত্যাহারের পাশাপাশি ওষুধ তৈরির ৬৮টি মৌলিক কাঁচামাল আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়েছে।
এ ছাড়া শিশুখাদ্য, মসলা, সিমকার্ড ও ই-সিমকার্ড সেবার বিপরীতে ৩০০ টাকা সুনির্দিষ্ট কর প্রত্যাহার, স্থানীয়ভাবে মোবাইল ফোন উৎপাদনে ২২টি উপকরণের অগ্রিম আয়কর কমিয়ে এক শতাংশ, স্বর্ণালংকারে ভরিপ্রতি আড়াই হাজার টাকা ও উৎস কর কমিয়ে ০.৫০ শতাংশ নির্ধারণ, দেশে উৎপাদিত ফ্রিজ-রেফ্রিজারেটর উৎপাদনে ভ্যাট কমিয়ে সাড়ে সাত শতাংশ, কম্পিউটার প্রিন্টার আমদানিতে ১৫ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহার ও অগ্রিম আয়কর দুই শতাংশ নির্ধারণ করায় পণ্যগুলোর দাম কমতে পারে।
এ ছাড়া পরিবেশ সুরক্ষার দিকেও নজর আছে বাজেটে। সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে উৎসাহিত করতে করছাড় দেওয়া হয়েছে। সোলার প্যানেল ও ব্যাটারি উৎপাদনে ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হচ্ছে। পরিবেশবান্ধব বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইভি) আমদানিতে বর্তমানে ৯৩ শতাংশ শুল্ককর রয়েছে। এটি কমিয়ে ২৫ হাজার ডলার মূল্যের গাড়ির জন্য ৬৪ শতাংশ ও ৫০ হাজার ডলার মূল্য পর্যন্ত গাড়ির শুল্ক-কর ৮০ শতাংশ নির্ধারণ করা হচ্ছে। এতে বাজারে ইলেকট্রিক গাড়ির দাম কমতে পারে। এ ছাড়া এক হাজার ৮০০ সিসি প্লাগ ইন হাইব্রিড গাড়ির শুল্ক ৯৩.১৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৭৩.৪৩ শতাংশ ও দুই হাজার সিসির গাড়ির করভার কমিয়ে ৯৬.১০ শতাংশ করা হয়েছে।
তবে ছাড় থাকলেও ভ্যাটের জাল বাড়াতে ব্যবসায়ীদের সাতটি সেবা নিতে ভ্যাট নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সেগুলো হলো—কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ব্যাংক, এনবিএফআই বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে চলতি হিসাব বা এসটিডি হিসাব খোলা ও পরিচালনা, ঋণ নেওয়া, ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন, মোবাইল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিসেসে মার্চেন্ট হিসাব খোলা, ট্রেড বডির সদস্য পদ গ্রহণ-নবায়ন, প্রতিষ্ঠানের নামে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ নেওয়া ও বিআরটিএ থেকে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নামে যানবাহনের নিবন্ধন নিতে।