সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০৫:১১ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলের পরিকল্পিত ধর্ষণ

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: শনিবার, ৬ জুন, ২০২৬
  • ৩৩ বার পড়া হয়েছে
সম্প্রতি নিউইয়র্ক টাইমসে পুলিৎজারজয়ী সাংবাদিক নিকোলাস ক্রিস্টফের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে গাজার কুখ্যাত সামরিক বন্দিশিবির স্দে তেইমানে (Sde Teiman) আটক ফিলিস্তিনি নারী-পুরুষদের ওপর ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) সদস্যদের পরিকল্পিত যৌন নির্যাতনের অভিযোগ তুলে ধরা হয়।

প্রতিবেদনটি ১৪ জন ভুক্তভোগী বা প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এছাড়া ভুক্তভোগীদের প্রতিনিধিত্বকারী একজন ইসরায়েলি মানবাধিকার আইনজীবীও গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে কাজ করেছেন।
 

ক্রিস্টফ ইসরায়েলের শীর্ষ মানবাধিকার সংস্থা বেতসেলেমের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনও ব্যবহার করেছেন। সেই প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল ‘নরকে স্বাগতম’।

 

তবে লেখকের মতে, ক্রিস্টফের প্রকাশিত তথ্য নতুন কিছু নয়। এসব ঘটনার সূত্রপাত ২০২৩ সালে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের পরপরই।

২০২৩ সালের ডিসেম্বরে হারেৎজ প্রথম সেখানে নির্যাতনের অভিযোগ প্রকাশ করে। এরপর ২০২৪ সালের মে মাসে সিএনএন প্রথম পশ্চিমা গণমাধ্যম হিসেবে বিষয়টি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। একই বছরের আগস্টে বেতসেলেম বিস্তারিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে। হারেৎজও পরবর্তী সময়ে এ বিষয়ে ধারাবাহিকভাবে বহু প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। 

লেখকের দাবি, বিশ্ব এ তথ্য জানত, অথবা জানার কথা ছিল। গণমাধ্যমও জানত। কিন্তু অধিকাংশই এসব ভয়াবহ অভিযোগকে উপেক্ষা করেছে। সিএনএন ও বেতসেলেম যেসব সূত্রের সঙ্গে কথা বলেছিল, অন্যান্য সংবাদমাধ্যম চাইলে সহজেই তাদের কাছে পৌঁছাতে পারত। কিন্তু তারা তা করেনি। ফলে ইসরায়েলি অপরাধগুলো আবারও কার্যত উপেক্ষিত হয়েছে।

জায়নবাদ ও যৌন সহিংসতা
লেখকের মতে, জায়নবাদী যৌন সহিংসতার ইতিহাস ৭ অক্টোবর ২০২৩ থেকে শুরু হয়নি। এর শিকড় ১৯৪৮ সালের নাকবারও আগে পর্যন্ত বিস্তৃত।

তিনি একটি ঘটনার উল্লেখ করেন, যেখানে ১৯৪০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে এক ফিলিস্তিনি ব্যক্তি নিকটবর্তী একটি কিবুত্সের এক নারীকে ধর্ষণের চেষ্টা করেছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে। প্রতিশোধ নিতে ভবিষ্যতের এক আইডিএফ জেনারেলের নেতৃত্বাধীন জায়নবাদী মিলিশিয়া ওই ব্যক্তিকে ধরে নিয়ে গিয়ে খোজা করে। এমনকি এ ঘটনাকে মহিমান্বিত করে একটি জনপ্রিয় জায়নবাদী গানও রচিত হয়েছিল। পরে ওই অভিযানে জড়িত হাগানাহ ইউনিটের কমান্ডার আইডিএফে দায়িত্ব পালনের পর টেকনিয়নের প্রেসিডেন্ট হন।

নাকবার সময় হাগানাহর সদস্যরা প্রায় ৪০০ ফিলিস্তিনি গ্রাম থেকে বাসিন্দাদের উচ্ছেদ করে। সে সময় ধর্ষণের বহু ঘটনার নথি ইসরায়েলি ইতিহাসবিদ ও গণমাধ্যমে উঠে এসেছে বলে লেখক দাবি করেন।

১৯৪৮ সালের মে মাসে তানতুরা নামের এক উপকূলীয় ফিলিস্তিনি গ্রামে হামলার সময় একাধিক নারী ধর্ষণের শিকার হন বলে ভুক্তভোগী ও অংশগ্রহণকারী ইসরায়েলি সেনাদের বক্তব্যে উঠে এসেছে। বর্তমানে সেই স্থানটি একটি সমুদ্রতীরবর্তী পার্কিং এলাকায় পরিণত হয়েছে।

১৯৪৯ সালে নেগেভ অঞ্চলে এক বেদুইন নারী টানা তিন দিন বিভিন্ন সামরিক ইউনিটের সদস্যদের ধর্ষণের শিকার হন। পরে ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে তাকে ও তার এক পুরুষ আত্মীয়কে হত্যা করা হয় বলে লেখক উল্লেখ করেন।

লেখকের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালে আইডিএফের প্রধান রাব্বি ফিলিস্তিনি নারীদের ধর্ষণকে অনুমোদনযোগ্য বলে মন্তব্য করেছিলেন।

নেতানিয়াহুর ‘রক্ত অপবাদ’
স্দে তেইমান নিয়ে বহু প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পরও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিকোলাস ক্রিস্টফের প্রতিবেদনকে ‘রক্ত অপবাদ’ বলে অভিহিত করেন।

‘রক্ত অপবাদ’ শব্দটির ঐতিহাসিক অর্থ হলো ইউরোপে ইহুদিদের বিরুদ্ধে প্রচলিত সেই মিথ্যা অভিযোগ, যেখানে বলা হতো তারা শিশু হত্যা করে তাদের রক্ত ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে ব্যবহার করে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এ ধরনের অভিযোগ ইউরোপে ইহুদিবিরোধী নিপীড়নকে উসকে দিয়েছে।

লেখকের দাবি, বর্তমানে জায়নবাদীরা প্রায়ই এ শব্দটি ব্যবহার করেন ইসরায়েলের বিরুদ্ধে উত্থাপিত বৈধ সমালোচনাকে খারিজ করার জন্য। ফলে ইসরায়েলি অপরাধের অভিযোগকে ‘ইহুদিবিদ্বেষী অপবাদ’ হিসেবে চিত্রিত করা হয়।

নেতানিয়াহু নিউইয়র্ক টাইমসের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করার জন্য তার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছেন বলেও লেখক উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে আইনভিত্তিক প্রচারণা পরিচালনাকারী ইসরায়েলি সংগঠন শুরাত হাদিনও এমন পদক্ষেপের আহ্বান জানায়।

লেখকের মতে, এসব পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় নির্যাতনের অভিযোগ খণ্ডনের মতো কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি। বরং যুক্তি ছিল—প্রতিবেদনটি ইসরায়েলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছে, তাই এটি মানহানিকর।

হামাসের যৌন সহিংসতা নিয়ে বিতর্কিত দাবি
লেখক বলেন, নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন থেকে দৃষ্টি সরাতে ইসরায়েল আরেকটি কৌশল ব্যবহার করেছে। ৭ অক্টোবর হামাসের ব্যাপক যৌন সহিংসতার অভিযোগ প্রথম যিনি উত্থাপন করেন, তিনি একজন ইসরায়েলি নারী। তবে তার অনেক দাবির পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ ছিল না। দ্য ইলেকট্রনিক ইনতিফাদা (The Electronic Intifada) তার প্রচারণাকে ‘ধর্ষণ প্রতারণা’ বলে আখ্যা দিয়েছে। লেখকের দাবি, তার উত্থাপিত বহু বক্তব্য পরে অসঙ্গতিপূর্ণ, অবিশ্বস্ত বা মনগড়া বলে প্রশ্নের মুখে পড়ে।

লেখকের মতে, হামাসের বিরুদ্ধে অভিযোগ সত্য হলেও তা স্দে তেইমানে সংঘটিত নির্যাতনের অভিযোগকে খণ্ডন করে না। একদিকে ইসরায়েলি অভিযোগকে বিশ্বাস করা এবং অন্যদিকে ফিলিস্তিনি নির্যাতনের অভিযোগকে অস্বীকার করা দ্বিমুখী আচরণ।

‘তাকে বিশ্বাস করুন, তাদের নয়’
লেখক যুক্তরাষ্ট্রে যৌন সহিংসতার বিরুদ্ধে ‘বিলিভ হার’ আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, তখন ভুক্তভোগীদের বক্তব্যকে গুরুত্ব দেওয়ার দাবি উঠেছিল। কিন্তু ফিলিস্তিনি ভুক্তভোগীদের ক্ষেত্রে সেই নীতি প্রয়োগ করা হয় না।

তার দাবি, ইসরায়েলে এখন অনেকেই গণহত্যা ও নির্যাতনের পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নেন। স্দে তেইমানে কী ঘটেছে, তা নিয়ে টেলিভিশন বিতর্কেও নির্যাতনকে সমর্থন করার ঘটনা দেখা গেছে।

তিনি উল্লেখ করেন, আইডিএফের প্রধান সামরিক কৌঁসুলি মেজর জেনারেল ইয়িফাত তোমের-ইয়েরুশালমি পাঁচজন কারারক্ষীর বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও নির্যাতনের অভিযোগ এনেছিলেন। পরে ব্যাপক জনচাপ, হুমকি ও বিতর্কের মুখে তাকে পদত্যাগ করতে হয়। অভিযুক্তদের অনেকেই জনসমক্ষে ‘জাতীয় বীর’ হিসেবে প্রশংসা পেয়েছেন।

নিবন্ধের শেষাংশে লেখক দাবি করেন, ইসরায়েল এক গভীর নৈতিক সংকটে নিমজ্জিত রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক আইনের কার্যকারিতা ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

 রিচার্ড সিলভারস্টেইন ‘টিকুন ওলাম’ ব্লগের লেখক এবং একজন ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক। তিনি ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামো ও সামরিক সেন্সরশিপ সম্পর্কিত গোপন তথ্য উন্মোচনের জন্য পরিচিত। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার পক্ষে তিনি দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছেন।

সূত্র: দ্য নিউ আরব

এমজেএফ

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com