ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে পুরোদমে প্রস্তুতি চলছে। তবে বর্জ্য শোধনের সীমাবদ্ধতা, লবণ ও রাসায়নিকের বাড়তি দাম এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দরপতনের কারণে চামড়া শিল্পে উদ্বেগ কাটেনি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, দেশে এবার কোরবানিযোগ্য পশুর সংখ্যা ১ কোটি ২৩ লাখের বেশি। এর মধ্যে গরু ও মহিষ প্রায় ৫৭ লাখ, ছাগল ও ভেড়া ৬৬ লাখের বেশি। সম্ভাব্য কোরবানির সংখ্যা ১ কোটির বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এসব পশুর চামড়ার বড় অংশই আসবে সাভারের হেমায়েতপুরের হরিণধরা এলাকায় অবস্থিত বিসিক চামড়া শিল্পনগরীতে। ঈদ সামনে রেখে সেখানে এখন চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি।
মঙ্গলবার (২৬ মে) সরেজমিনে দেখা যায়, অতিরিক্ত বর্জ্যের চাপ সামলাতে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) সংস্কারের কাজ চলছে। পাশাপাশি শিল্পনগরীর বিভিন্ন স্থানের আবর্জনা অপসারণ, পানি নিষ্কাশনের নালা পরিষ্কার এবং কারখানাগুলো পরিচ্ছন্ন করার কাজও চলছে। বর্জ্য ফেলার জন্য খনন করা হয়েছে দুটি পুকুর।
ট্যানারি মালিকেরা জানান, ঈদ সামনে রেখে রাসায়নিক সংগ্রহ, লবণ মজুত, শ্রমিক নিয়োগ এবং মাঠপর্যায়ে চামড়া সংগ্রহের প্রস্তুতি প্রায় শেষ। সোডিয়াম সালফাইড, হাইড্রেটেড লাইম ও বেসিক ক্রোমিয়াম সালফেটসহ প্রয়োজনীয় রাসায়নিক সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে লবণের দাম বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এ বছর চামড়া শিল্পে ৮০ থেকে ৮৫ হাজার মেট্রিক টন লবণের চাহিদা রয়েছে। সরকার মাদ্রাসা, এতিমখানা ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানে বিনা মূল্যে প্রায় ১১ হাজার ৫০০ টন লবণ বিতরণ করছে। বর্তমানে ৭৪ কেজির প্রতি বস্তা লবণ ৯৩০ থেকে ৯৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা আগের তুলনায় প্রায় ২৫০ টাকা বেশি।
সাভারের একটি ট্যানারির কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলম বলেন, ‘‘সরকার চামড়া শিল্পের প্রতি আন্তরিক। সিইটিপির কাজেও অগ্রগতি হয়েছে। পাশাপাশি প্রান্তিক পর্যায়ে চামড়া সংরক্ষণ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। তবে বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে রাসায়নিকের দাম প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে।’’
চামড়ার বাজার নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন ট্যানারি কর্মকর্তা মাহফুজ ইসলাম। তিনি বলেন, ‘‘চীনের বাজারে ৪০ সেন্টের বেশি দামে চামড়া বিক্রি করা যায় না। অথচ কেমিক্যাল, শ্রমিক ও বিদ্যুতের খরচ বেড়েছে। সরকার যে দাম নির্ধারণ করেছে, বাস্তবে সে দামে ব্যবসা করা কঠিন।’’
ট্যানারি মালিক রিপন চৌধুরীও একই অভিযোগ করে বলেন, ‘‘আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কম থাকায় সরকার নির্ধারিত দামে চামড়া কেনা সম্ভব হচ্ছে না। আমরা ৩৫ থেকে ৪০ টাকার বেশি দামে চামড়া বিক্রি করতে পারি না।”
এনজেলা ট্যানারির কর্মকর্তা জাকির হোসেন বলেন, বাংলাদেশের চামড়া শিল্প এখন পুরোপুরি চীনের বাজারনির্ভর। ইউরোপের বাজারে প্রবেশ করতে না পারলে শিল্পটি ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হবে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী এলডব্লিউজির (এলডব্লিউজি) মতো সনদ পেলে ইউরোপীয় বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করেন তিনি।

আইয়ুব ব্রাদার্স ট্যানারির দায়িত্বে থাকা মো. আইয়ুব বলেন, ‘‘চামড়া সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত লবণ ও রাসায়নিক মজুত করা হয়েছে। তবে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ না পেলে বিপুল পরিমাণ চামড়া নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’’
এবার এক কোটি চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে উল্লেখ করে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি শাখাওয়াত উল্লাহ দ্রুত লবণ দিয়ে চামড়া সংরক্ষণের আহ্বান জানান।
শ্রমিকদের অভিযোগ
ট্যানারিতে এখন পুরোনো চামড়া প্রক্রিয়াজাতের পাশাপাশি নতুন চামড়া সংরক্ষণের প্রস্তুতি চলছে। শ্রমিক সালাউদ্দিন বলেন, কোরবানির আগে জায়গা খালি করে নতুন চামড়া সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তবে শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে। শ্রমিক মোহাম্মদ মানিক বলেন, ২০১৭ সালে সাভারে স্থানান্তরের পরও শ্রমিকদের জন্য পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা, স্কুল কিংবা খেলার মাঠ গড়ে ওঠেনি।
সিইটিপি নিয়ে শঙ্কা
প্রায় ২০০ একর জায়গাজুড়ে গড়ে ওঠা সাভার চামড়া শিল্পনগরীতে বর্তমানে ১৩৭ থেকে ১৫৫টি ট্যানারি চালু রয়েছে। তবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। সম্প্রতি শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির শিল্পনগরী পরিদর্শন করে বলেন, সিইটিপির ঘোষিত সক্ষমতা ২৫ হাজার কিউবিক মিটার হলেও বাস্তবে তা ১৪ থেকে ১৮ হাজার কিউবিক মিটারের বেশি নয়। ফলে পর্যাপ্ত বর্জ্য শোধন না হওয়ায় ধলেশ্বরী নদী দূষিত হচ্ছে।
সিইটিপির দায়িত্বে থাকা ঢাকা ট্যানারি ইন্ডাস্ট্রিয়াল এস্টেট ওয়েস্টেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. গোলাম শাহনেওয়াজ বলেন, ‘‘কোরবানিকে সামনে রেখে সিইটিপির ওভারহলিংয়ের কাজ প্রায় শেষ। কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য দুটি পুকুর সংস্কার করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রায় ৩০টি ট্যানারিকে নিজস্ব সলিড ওয়েস্ট প্রসেসিংয়ের অনুমোদন দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’’
বিসিক চামড়া শিল্পনগরীর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মেহরাজুল মাঈয়ান বলেন, ‘‘ঈদের পর টানা তিন মাস নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। চামড়াবাহী ট্রাকের যানজট এড়াতে বিশেষ ট্রাফিক ব্যবস্থাও থাকবে।’’ তিনি জানান, এবার ৫৫ থেকে ৬৫ লাখ চামড়া ট্যানারিতে প্রবেশ করতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ৪৫ থেকে ৫০ লাখ।
বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. শাহীন আহমেদ বলেন, ‘‘ঈদের সময় সঠিকভাবে লবণ ব্যবহার ও সংরক্ষণ নিশ্চিত করা না গেলে চামড়ার মান নষ্ট হয়, যা সরাসরি বাজারদরে প্রভাব ফেলে।’’
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের চামড়া খাত থেকে রপ্তানি আয় হয়েছে ১ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি। অন্যদিকে ফরচুন বিজনেস ইনসাইটসের তথ্য বলছে, ২০২২ সালে বৈশ্বিক চামড়াজাত পণ্যের বাজার ছিল ৪৪০ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলার, যা ২০৩০ সালের মধ্যে ৭৩৮ দশমিক ৬১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।