২০২৫ সালে বাংলাদেশ ও চীন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তি উদযাপন করেছে। বর্তমানে দুই দেশের সম্পর্ক অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সাংস্কৃতিক বিনিময়, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, স্বাস্থ্যসেবা এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের ওপর ভিত্তি করে সুদৃঢ় অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে।
প্রচলিত সহায়তা কাঠামোর তুলনায় চীনের বিনিয়োগ অবকাঠামো উন্নয়নকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। চীনের অবকাঠামোগত পদচিহ্নের মধ্যে রয়েছে বন্দর, মহাসড়ক, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের (এসইজেড) মতো মেগাপ্রকল্প। এসব প্রকল্প শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়নই নয়, সাংস্কৃতিক বিনিময়, কর্মপরিবেশের সংস্কৃতি এবং ব্যাবসায়িক ঝুঁকি ও সম্ভাবনা সম্পর্কে নতুন ধারণারও জন্ম দিয়েছে।
শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের ক্ষেত্রেও দুই দেশের সম্পর্ক ক্রমেই গভীর হচ্ছে। এরই মধ্যে ২০ হাজারের বেশি বাংলাদেশি শিক্ষার্থী চীনের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছে।
বাংলাদেশ ও চীন ২০০২ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা শুরু করে। এই সহযোগিতার আওতায় দুই দেশের সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ও সামরিক সরঞ্জাম বিনিময়ের পাশাপাশি পারস্পরিক নৌ সফর এবং জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনে অংশগ্রহণের বিষয়ে সমঝোতা গড়ে ওঠে। বর্তমানে বাংলাদেশ চীনের অন্যতম প্রধান প্রতিরক্ষা অংশীদার। ২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশের মোট অস্ত্র আমদানির প্রায় ৭২ শতাংশ এসেছে চীন থেকে, যা বাংলাদেশকে বিশ্বের ২৬তম বৃহত্তম অস্ত্র ক্রেতার অবস্থানে নিয়ে গেছে।
চীন থেকে আমদানীকৃত সামরিক সরঞ্জামের মধ্যে রয়েছে ট্যাংক, করভেট, টহল জাহাজ, ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র এবং যুদ্ধবিমান। এসব ক্রয় দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ধারাবাহিকতাকে প্রতিফলিত করে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশ-চীন প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরো বিস্তৃত হতে পারে। বিশেষ করে লালমনিরহাটে বিমানঘাঁটির প্রতিরক্ষা ও রাডার উন্নয়নে চীনের সম্পৃক্ততা বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা এবং দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে আরো শক্তিশালী করতে পারে।
ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ-চীন স্বাস্থ্যসেবা সহযোগিতাও নতুন মাত্রা পেয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা মূলত বিশ্বাস, সামাজিক মূল্যবোধ ও দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার ওপর নির্ভরশীল। চীনের রাষ্ট্রদূত জানিয়েছেন, বাংলাদেশি রোগীদের জন্য বিশেষভাবে তিনটি হাসপাতাল নির্ধারণ করা হয়েছে এবং চিকিৎসা ভিসা প্রক্রিয়াও সহজ করা হচ্ছে। ২০২৫ সালে ঢাকায় বাংলাদেশ-চীন স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা উন্নয়ন এক্সপো অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। চিকিৎসা সরঞ্জাম ও খুচরা যন্ত্রাংশের বাজারে চীনের শক্তিশালী অবস্থান বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে।
বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা ক্রমেই মেরুকৃত ও অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে। এই প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক প্রবেশদ্বারে বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান একটি বড় কৌশলগত সুবিধা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে পশ্চিমা শক্তিগুলোর সক্রিয় উপস্থিতি বাড়ছে। একই সঙ্গে সীমান্ত হত্যা ও চোরাচালানের ঘটনাও বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা বাংলাদেশ-চীন দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনো ব্যাপকভাবে তৈরি পোশাক (আরএমজি) শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। এই শিল্পের বেশির ভাগ কাঁচামাল ও সরঞ্জাম চীনা সরবরাহকারীদের কাছ থেকে আসে এবং পুরো সরবরাহ শৃঙ্খল অনেকাংশে চীনের ওপর নির্ভরশীল। সীমিত রপ্তানি বৈচিত্র্যের কারণে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হচ্ছে, যদিও চীন বাংলাদেশি পণ্যের জন্য ৯৯ শতাংশ শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার প্রদান করেছে। দীর্ঘ মেয়াদে এই বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা কমাতে বাংলাদেশের উচিত আরএমজি শিল্পের কাঁচামাল ও সরঞ্জামের নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলা।
বাংলাদেশ একটি উচ্চ জনঘনত্বপূর্ণ দেশ এবং এর বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী দেশের জন্য বড় সম্ভাবনা তৈরি করেছে। সঠিক পরিকল্পনা ও নীতিনির্ধারণের মাধ্যমে মানবসম্পদ উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব। প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জাতীয় নিরাপত্তা জোরদার করে, আর টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন সামাজিক নিরাপত্তা, মানবসম্পদ গঠন, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি তৈরি করে। শুধু ব্যাপক অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমেই বাংলাদেশের আঞ্চলিক নিরাপত্তা উদ্বেগ কমানো সম্ভব, যেখানে চীনের বিআরআই প্রকল্পগুলো গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ভূমিকা পালন করতে পারে।
বাংলাদেশ চাইলে চীনের অর্থনৈতিক উন্নয়ন কৌশল, উন্মুক্তকরণ নীতি এবং গবেষকদের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজস্ব উন্নয়নের পথ আরো সুদৃঢ় করতে পারে।
লেখকদ্বয় : মো. সৈকত হোসেন, চিয়াংশি ইউনিভার্সিটি অব ফিন্যান্স অ্যান্ড ইকোনমিকসের স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিকস অ্যান্ড পলিটিকসের পিএইচডি শিক্ষার্থী ও গবেষক মোহাম্মদ ছাইয়েদুল ইসলাম, পিএইচডি, চীনের ফুজিয়ান প্রদেশের সানমিং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ওভারসিজ এডুকেশনের (স্কুল অব ফরেন ল্যাঙ্গুয়েজেস) সিনিয়র প্রভাষক ও গবেষক