ফ্যাসিস্ট আমলের সার ডিলারদের বাদ দিয়ে নতুন ডিলার নিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল বুধবার অনির্ধারিত আলোচনায় সংসদের প্রধান হুইপ নূরুল ইসলামের এ-সংক্রান্ত একটি দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তিনি এই প্রতিশ্রুতি দেন। এর আগে বিকেল ৩টার দিকে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠক শুরু হয়।
প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষ হওয়ার পরপরই প্রধান হুইপ নূরুল ইসলাম বলেন, ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে সার সরবরাহের যে ডিলার নিয়োগ করা হয়েছে, তারা এখনও বহাল তবিয়তে আছেন। ওই ডিলাররা সার উত্তোলন করছেন না। তারা কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করছেন। এ জন্য তিনি সংসদের পক্ষ থেকে পুরোনো ডিলার বাতিল করে নতুন ডিলার নিয়োগের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ জানান। প্রধান হুইপের এই বক্তব্যের সময় সব সংসদ সদস্য টেবিলে চাপড়িয়ে সমর্থন জানান।
জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পুরো সংসদ বিষয়টিতে স্বাগত জানিয়েছে। এ ব্যাপারে পুরো সংসদের সম্মতি থাকলে সরকার শিগগিরই এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেবে।
আওয়ামী লীগ আমলে সংঘটিত অর্থ পাচার ও দুর্নীতির অনুসন্ধান করে একটি পূর্ণাঙ্গ শ্বেতপত্র প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সংসদ সদস্য কামরুজ্জামানের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, অর্থ পাচারের গন্তব্য দেশগুলো থেকে প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ১০ দেশের মধ্যে তিনটির সঙ্গে চুক্তি সইয়ের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সম্মতি দিয়েছে। অন্য সাতটি দেশের সঙ্গে চুক্তি সইয়ের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন।
প্রধানমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সভাপতিত্বে গঠিত আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্সের চিহ্নিত ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ১১টি মামলায় পাচার হওয়া অর্থ পুনরুদ্ধারের জন্য আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর উপস্থাপিত ১১টি অগ্রাধিকারভুক্ত মামলা হচ্ছে– সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তাঁর পরিবার ও তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান; সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও তাঁর স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান; এস আলম গ্রুপ ও এর স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান; বেক্সিমকো গ্রুপ ও এর স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান; সিকদার গ্রুপ ও এর স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান; বসুন্ধরা গ্রুপ ও এর স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান; নাসা গ্রুপ ও এর স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান; ওরিয়ন গ্রুপ ও এর স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান; নাবিল গ্রুপ ও এর স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান; এইচ বি এম ইকবাল, তাঁর পরিবার ও তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এবং সামিট গ্রুপ ও এর স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান।
তারেক রহমান বলেন, বর্তমান সরকার দুর্নীতি, মানিলন্ডারিং এবং আর্থিক অপরাধ দমনের কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে পাচার করা সম্পদ পুনরুদ্ধার কার্যক্রমকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে ওই প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অর্থ প্রবাহের পরিমাণ আনুমানিক ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা প্রতি বছর গড়ে ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ১ দশমিক ৮ লাখ কোটি টাকা)। পাচার করা অর্থ একাধিক দেশে স্থানান্তরিত হওয়ার অভিযোগ থাকায় তা উদ্ধারে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে তথ্য বিনিময়, সম্পদ শনাক্তকরণ এবং পারস্পরিক আইনি সহায়তা জোরদার করা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে ‘পারস্পরিক আইনি সহায়তা চুক্তি’ সম্পাদন ও বিনিময় প্রক্রিয়ার জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ চলছে।
হামের টিকা আমদানি করা হয়নি
এর আগে জামায়াতে ইসলামীর সদস্য সালাহ উদ্দিনের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, হাম শনাক্তকরণের কীটের স্বল্পতা রয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকার কাজ করছে। বিগত স্বৈরাচারের সময় এবং অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে শিশুদের হামের টিকা কয়েক বছর আমদানি করা হয়নি। দুঃখজনক ব্যাপার হলো, অনেকগুলো শিশুর প্রাণ ঝরে গেছে। তবে, আমরা দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছি।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, হামের ঘটনাটি খুবই দুঃখজনক। এই সমস্যা দেখা দেওয়ার পরে দ্রুততার সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এখানে ইউনিসেফ বাংলাদেশকে অনেক সহযোগিতা করেছে। তারা দ্রুত হামের টিকা পাঠিয়েছে। যার ফলে ওষুধগুলো পাওয়া গেছে। প্রায় দুই কোটি শিশুকে হামের টিকা দেওয়া হবে।
সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজের প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী জানান, পাঁচ বছরে এক হাজার জনকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ফ্রিল্যান্সার তৈরি করা হবে। এ সময়ে ২০ লাখ জনকে ফ্রিল্যান্সার কার্ড দেওয়া হবে। ইতোমধ্যে সাড়ে সাত হাজার কার্ড দেওয়া হয়েছে বলে প্রধানমন্ত্রী জানান।
সংসদ সদস্য রবিউল আওয়ালের প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পতিত জমি আবাদের আওতায় আনা এবং জমির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে ক্রপ জোনিং পদ্ধতি চালু হয়েছে। এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট অঞ্চলের মাটি, আবহাওয়া ও পরিবেশের উপযোগী ফসল নির্ধারণ করা হয়। একই সঙ্গে পতিত জমি চিহ্নিত করে তা আবাদের আওতায় আনার জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।
সংসদ সদস্য আবুল কালামের প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী জানান, চলতি অর্থ বছরেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দুই লাখ শিশুর মাঝে বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস বিতরণ করা হবে।
কৃষিপ্রণোদনা কৃষকদের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর বিষয়ে সংসদ সদস্য আতাউর রহমানের সম্পূরক প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই কাজটি করার জন্যই আমরা কৃষক কার্ড দিয়েছি। এটা হলে কৃষককে আর দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে না। সরাসরি তাঁর কাছে পৌঁছে যাবে। ওই কৃষকের জমির বিবেচনায় সার-বীজের প্রয়োজনীয় সব তথ্য সরকারের কাছে থাকবে। স্থানীয় নির্দিষ্ট দোকান থেকে তাঁর জন্য বরাদ্দের সার-বীজ-কীটনাশকসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহ করতে পারবে।
‘সবার আগে বাংলাদেশ’ পররাষ্ট্রনীতির এই মূল দর্শনকে বিবেচনায় নিয়ে জনগণের কল্যাণ সর্বাগ্রে প্রাধান্য দেওয়ার লক্ষ্যে কার্যক্রম শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন তারেক রহমান। অধিবেশনে সংসদ সদস্য মো. আবুল কালামের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা জানান।
সংসদ সদস্য মো. আব্দুল বাতেনের লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পল্লবী থানার আওতাভুক্ত বিভিন্ন ক্যাম্পে বসবাসকারী উর্দুভাষী বাংলাদেশি নাগরিকের স্থায়ী পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।