(সুরা : হজ, আয়াত : ২৭)
হজের উপকারিতা ও নিয়ামতরাজি অপরিসীম। নিচে হজের বহুমুখী কল্যাণসমূহ আলোচনা করা হলো—
১. ইসলামের স্তম্ভ পূর্ণ হওয়া ও গুরুদায়িত্ব থেকে দায়মুক্তি
হজ ইসলামের অন্যতম ভিত্তি। একজন সামর্থ্যবান মুসলিমের জন্য জীবনে একবার হজ করা ফরজ। হজের মাধ্যমে বান্দা তার ওপর অর্পিত মহান রবের একটি বড় হুকুম পালন করে এবং আখিরাতের জবাবদিহি থেকে দায়মুক্তি লাভ করে।
(সহিহ বুখারি, হাদিস : ৮; সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৬)
সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যারা হজ করে না, তাদের ব্যাপারে শরিয়তে কঠোর হুঁশিয়ারি এসেছে। তাই হজ আদায়ের মাধ্যমে মুমিন আল্লাহর পক্ষ থেকে অর্পিত গুরুদায়িত্ব পালনের প্রশান্তি লাভ করে।
২. জীবনের সব গুনাহ থেকে মুক্তি ও পবিত্রতা লাভ
হজের সবচেয়ে বড় আধ্যাত্মিক পাওয়া হলো গুনাহ থেকে মুক্তি।
অন্য এক হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কবুল হজের প্রতিদান জান্নাত ছাড়া আর কিছুই নয়।
(সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৭৭৩)
এই নিষ্পাপ হওয়ার অনুভূতি একজন মুমিনকে নতুনভাবে জীবন শুরু করার প্রেরণা দেয়।
৩. আল্লাহর প্রেমে পার্থিব মায়া ত্যাগ ও অবিচ্ছেদ্য মহব্বত সৃষ্টি
হজ হলো প্রেমের সফর।
৪. আল্লাহর হুকুমের সামনে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ
হজের প্রতিটি কাজ, তাওয়াফ করা, সাফা-মারওয়া দৌড়ানো, শয়তানকে পাথর মারা বা আরাফাতের ময়দানে দাঁড়িয়ে থাকা—এসবের পেছনে নিহিত আছে ইবরাহিম (আ.) ও তাঁর পরিবারের চরম ত্যাগের ইতিহাস। অনেক ক্ষেত্রে এসব কাজের বাহ্যিক যুক্তি মানুষের বুঝে না এলেও একজন মুমিন শুধু আল্লাহর নির্দেশ মনে করে তা পালন করে। এই নিঃশর্ত আনুগত্যই হলো হজের শিক্ষা। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘বলুন, আমার নামাজ, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও আমার মরণ কেবল বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহরই জন্য।’
(সুরা : আনআম, আয়াত : ১৬২)
হজ মুমিনের মনে এই প্রেরণা জাগ্রত করে যে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নিজের মর্জির চেয়ে আল্লাহর মর্জির গুরুত্ব অনেক বেশি।
৫. দারিদ্র্য বিমোচন ও রিজিকে বরকত লাভ
অনেকে মনে করেন হজে অনেক টাকা খরচ হয়ে যায়, যা অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু নবীজি (সা.)-এর শিক্ষায় এর উল্টো সুসংবাদ আছে। তিনি ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা হজ ও ওমরাহ পরপর আদায় করো; কেননা এ দুটি ইবাদত দারিদ্র্য ও গুনাহকে এমনভাবে দূর করে দেয়, যেমন—কামারের হাপর লোহার মরিচা দূর করে দেয়।’
(জামে তিরমিজি, হাদিস : ৮১০; সুনানে নাসাঈ, হাদিস : ২৬৩১)
হজ আদায়কারীর অন্তরে যেমন আল্লাহ সচ্ছলতা দান করেন, তেমনি তার রিজিকেও বিশেষ বরকত দান করেন। এটি আল্লাহর এক কুদরতি ব্যবস্থা যে হজ পালনকারী ব্যক্তি কখনো নিঃস্ব হয় না।
৬. বিনয় সৃষ্টি ও অহংকার মুক্তি
হজের অন্যতম বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ উপকারিতা হলো বিনয় শিক্ষা। ইহরামের সাদা পোশাকে বাদশাহ আর ফকিরের মধ্যে কোনো তফাত থাকে না। সবাই এক পোশাকে, এক রবের দরবারে হাত তুলে দাঁড়িয়ে থাকে। এই দৃশ্য মুমিনের অন্তরের রাজকীয় অহংকার, বংশীয় গৌরব ও আভিজাত্যের দম্ভ ধুয়ে-মুছে সাফ করে দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই অধিক মর্যাদাবান, যে তোমাদের মধ্যে অধিক মুত্তাকি (পরহেজগার)।’
(সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১৩)
হজের প্রতিটি কদম বান্দাকে শেখায় যে মৃত্যুর পর সাদা কাফনই হবে শেষ সম্বল, তাই দুনিয়ায় বিনয়ী হওয়াই শ্রেয়।
৭. বিশ্ব মুসলিম ভ্রাতৃত্ব ও দ্বিনি জ্ঞান অর্জন
হজ হলো বিশ্ব মুসলিমের মহাসম্মিলন। বিভিন্ন ভাষা, বর্ণ ও সংস্কৃতির মানুষ যখন এক স্থানে মিলিত হয়, তখন ইসলামের সর্বজনীন ভ্রাতৃত্বের এক অনুপম রূপ ফুটে ওঠে। আল্লাহ তাআলা হজের উপকারিতা সম্পর্কে বলেন, ‘যাতে তারা তাদের কল্যাণের স্থানগুলোতে উপস্থিত হতে পারে।’ (সুরা : হজ, আয়াত : ২৮)
মুফাসসিরদের মতে, এই ‘কল্যাণ’ যেমন আখিরাতের, তেমনি দুনিয়াবিও। হজের সফরে বড় বড় আলেম ও ফকিহদের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ হয়, যা দ্বিনের সঠিক জ্ঞান ও হজের মাসায়েল সম্পর্কে গভীর অনুধাবন সৃষ্টিতে সাহায্য করে। বিভিন্ন দেশের মুসলমানদের সঙ্গে ভাবের আদান-প্রদান মুসলিম উম্মাহর ঐক্যকে সুদৃঢ় করে।
পরিশেষে বলা যায়, হজ শুধু একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং এটি মুমিনের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো এক বিপ্লবী ইবাদত। হজের মাধ্যমে একজন মানুষ যেমন আধ্যাত্মিকভাবে বলীয়ান হয়, তেমনি সামাজিকভাবেও উদার ও বিনয়ী হয়ে ওঠে। হজের এই সাতটি উপকারিতা মুমিনের ইহকালীন শান্তি ও পরকালীন মুক্তির রক্ষাকবচ।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সব সামর্থ্যবান মুসলিমকে কবুল হজ নসিব করুন এবং হজের এই শিক্ষাগুলো সারা জীবন লালন করার তাওফিক দান করুন।