মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, শান্তি আলোচনায় অগ্রগতি না হলে ইরানে আবার হামলা শুরু করা হবে। মার্কিন বাহিনী হামলার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত বলেও গতকাল মঙ্গলবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন তিনি।
এদিকে হুমকির মুখে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনায় যেতে ইরান রাজি নয় দাবি করে দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার বাঘের গালিবাফ জানান, যদি আবার যুদ্ধ শুরু হয়, তাহলে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ইরান নতুন নতুন কার্ড বা কৌশল দেখাতে প্রস্তুত। গতকাল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে এক পোস্টে তিনি এ কথা বলেন।
এই ঘটনা চলমান ১০ দিনের যুদ্ধবিরতির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য শান্তি আলোচনার খবরে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমেছে। গত সোমবার তেলের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বাড়লেও গতকাল লেনদেনের শুরুতে সেই বাড়তি দাম অনেকটা কমে এসেছে। লেনদেনে যুক্তরাষ্ট্রের বেঞ্চমার্ক ক্রুড ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট ১.২ শতাংশ কমে প্রতি ব্যারেল ৮৮.৫০ ডলারে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে ব্রেন্ট নর্থ সি ক্রুডের দাম ০.৪ শতাংশ কমে প্রতি ব্যারেল ৯৫.১২ ডলারে এসেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই তেলের বাজারে অস্থিরতা বিরাজ করছে।
মুখিয়ে আছে মার্কিন বাহিনী, চুক্তি না হলে পুরোদমে হামলা : ট্রাম্প : এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেছেন, ‘কোনো চুক্তি ছাড়া ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হলে প্রচুর বোমা ফাটতে শুরু করবে। আমরা পুরোপুরি প্রস্তুত। আমাদের কাছে প্রচুর গোলাবারুদসহ সবকিছুই পর্যাপ্ত পরিমাণে আছে…। আমরা এই সময়টাকে সরঞ্জাম মজুদের কাজে লাগিয়েছি এবং তারাও (ইরান) হয়তো কিছুটা মজুদ করেছে। আমরা অভিযানের জন্য প্রস্তুত। আমাদের সামরিক বাহিনী মুখিয়ে আছে।’ শেষ হতে যাওয়া যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আর বাড়াতে চান না বলেও জানিয়েছেন তিনি।
ওই সাক্ষাৎকারে তিনি আরো বলেন, ‘ইরানের আর কোনো উপায় নেই। তাদের যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার জন্য পাকিস্তানে প্রতিনিধি পাঠাতেই হবে। চুক্তি করার জন্য হাতে বেশি সময় নেই। ইরান যদি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিতে পৌঁছে, তাহলে তারা খুব ভালো থাকবে।’
যুদ্ধক্ষেত্রে ‘নতুন কার্ড’ দেখাতে প্রস্তুত ইরান : বাঘের গালিবাফ : ট্রাম্পের হুমকির জবাবে পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়ে তেহরান বলেছে, যুদ্ধ যদি আবারও শুরু হয় তাহলে রণক্ষেত্রে দেখানোর জন্য তাদের হাতে ‘নতুন কৌশল’ প্রস্তুত রয়েছে।
দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার বাঘের গালিবাফ জানিয়েছেন, হুমকির মুখে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনায় যেতে রাজি নয় ইরান; বরং যদি আবার যুদ্ধ শুরু হয়, তাহলে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ইরান নতুন নতুন কৌশল দেখাতে প্রস্তুত। গতকাল এক্সে এক পোস্টে গালিবাফ লেখেন, “আমরা যুদ্ধক্ষেত্রে নতুন নতুন কার্ড দেখাতে প্রস্তুত। গত দুই সপ্তাহে আমরা রণক্ষেত্রে দেখানোর জন্য ‘নতুন কৌশল’ প্রস্তুত করেছি।”
ট্রাম্প নিজের কল্পনায় আলোচনার টেবিলকে আত্মসমর্পণের টেবিল বানাতে চাইছেন বলে অভিযোগ করেন গালিবাফ। তিনি লেখেন, ‘তিনি নতুন করে যুদ্ধ উসকে দেওয়ার যৌক্তিকতা তৈরি করতে চাইছেন।’
যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের প্রতি পাকিস্তানের আহবান : যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বৃদ্ধি এবং সংঘাতের অবসানে সংলাপ ও কূটনীতিকে সুযোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতি আহবান জানিয়েছে পাকিস্তান। ইসলামাবাদে উভয় দেশের প্রতিনিধিদের শান্তি আলোচনা শুরুর আগে মঙ্গলবার পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার ওই আহবান জানান।
মার্কিন অবরোধ ভেঙে দক্ষিণের বন্দরে ইরানি জাহাজ : ইরানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, একটি ইরানি তেল বহনকারী জাহাজ মার্কিন অবরোধ ভেঙে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের একটি বন্দরে প্রবেশ করেছে। সেনাবাহিনীর বিবৃতিতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর সন্ত্রাসী সেনাদের বারবার সতর্কবার্তা ও হুমকির পরও ইরানের সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনীর সহায়তায় তেল বহনকারী জাহাজ সিলিকা সিটি আরব সাগর থেকে গতকাল রাতে ইরানের জলসীমায় প্রবেশ করেছে এবং কয়েক ঘণ্টা আগে দক্ষিণের একটি বন্দরে নোঙর করেছে। অবশ্য এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র কোনো মন্তব্য করেনি।
নিষেধাজ্ঞা থাকা একটি জাহাজে তল্লাশি চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী : পেন্টাগন জানিয়েছে, ইন্দো প্যাসিফিক অঞ্চলে ‘অবৈধ নেটওয়ার্ক’ ভেঙে দিতে অভিযানের অংশ হিসেবে মার্কিন বাহিনী নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা একটি তেলবাহী জাহাজে উঠে তল্লাশি চালিয়েছে। ‘কোনো ধরনের সংঘর্ষ ছাড়াই’ তল্লাশি কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগ জানায়, তারা ‘রাইট অব ভিজিট’, অর্থাৎ আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে কোনো দেশের অধীনে না থাকা ও নিষেধাজ্ঞাভুক্ত এমটি টিফানি নামের জাহাজকে সমুদ্রে থামিয়েছে। এরপর কোনো সংঘর্ষ ছাড়াই তাতে তল্লাশি চালিয়েছে।
৪০ দিনে নিহত ১৩ মার্কিন সেনা, চার শতাধিক আহত : গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে টানা ৪০ দিন যুদ্ধ চলার পর গত ৮ এপ্রিল অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। এই ৪০ দিনের যুদ্ধে মোট নিহত ও আহত মার্কিন সেনার সংখ্যা জানিয়ে সোমবার একটি বিবৃতি দিয়েছে মার্কিন প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদর দপ্তর পেন্টাগন। সেই বিবৃতির তথ্য অনুসারে, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৮ এপ্রিল পর্যন্ত ইরানি প্রতিরক্ষা বাহিনীর হামলায় নিহত হয়েছে ১৩ জন এবং আহত হয়েছে ৪১৫ সেনা। সূত্র : বিবিসি, রয়টার্স, সিএনএন, আল জাজিরা, মিডল ইস্ট আই